
স্টাফ রিপোর্টার॥ সারা দেশের ন্যায় মৌলভীবাজারে শুরু হচ্ছে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ। এ উপলক্ষে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন ও জেলা মৎস্য অফিসের আয়োজনে সপ্তাহ ব্যাপী ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। এবারের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের শ্লোগান “মাছ চাষে গড়বো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ” “মৎস্য সেক্টরের সমৃদ্ধি, সুনীল অর্থনীতির অগ্রগতি”।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমদাদুল হক জানান, ১৭ জুলাই গণমাধ্যম কর্মীদের নিয়ে শমসের নগর সড়কস্থ মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, মতবিনিময় ও মাইকিং এর মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা করা হচ্ছে।
১৮ জুলাই সকাল ১০ ঘটিকায় ব্যানার-ফেস্টুন সহযোগে জেলা প্রশাসকের কার্যলয় থেকে র্যালি হবে। পরে পৌরসভার পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে। পরে জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে মৌলভীবাজার ৩ আসনের সংসদ সদস্য নেছার আহমদ, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিুজুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহ্জালাল, পৌর মেয়র মোঃ ফজলুর রহমান, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আলম খান।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরো জানান, প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ১৭-২৩ জুলাই জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১৯ উদযাপিত হচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ৪ঠা জুলাই কুমিল্লায় এক জনসভায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান “মাছ হবে দ্বিতীয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ” এ মর্মে ঘোষণা দেন। আজ বাংলাদেশ তৈরী পোশাক শিল্পের পরই মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। শুধু তাই নয় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাণীজ আমিষের ৬০ শতাংশ যোগান দেয় মৎস্য সম্পদ।
বাংলাদেশ এখন মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ন। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মাছ উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ছিল ৪১.৩৪ লাখ মেট্রিক টন। মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪২.৭৭ লাখ মেট্রিক টন।
১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ৭.৫৪ লাখ মেট্রিক টন। ৩৪ বছরের ব্যবধানে ২০১৭-১৮ সালে এ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪২.৭৭ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এ সময়ের ব্যবধানে মোট মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুন। সরকারের বাস্তব মূখী কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশ এখন মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জন করেছে। মৎস্যজাত উৎস থেকে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, দারিদ্র বিমোচন ও রপ্তানী আয় বৃদ্ধির লক্ষে বর্তমান সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। মৎস খাতের এ অনন্য সফলতা ধরে রাখার লক্ষে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এগুলো হলো জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন, অভ্যন্তরীন জলাশয়ের আবাসস্থল উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, পরিবেশ বান্ধন চিংড়ী চাষ সম্প্রসারণ, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের সহনশীল আহরণ, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ মাছ সরবরাহ এবং মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানী। প্রাকৃতিক উৎসের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে ৩য় অবস্থানে উন্নিত হয়েছে।
গত ৯ জুলাই ২০১৮ খ্রী. প্রকাশিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। বর্তমানে চীন, ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এতে আরো বলা হয়েছে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশে^ ৫ম এছাড়া প্রাকৃতিক এবং চাষের মাছ মিলিয়ে বিশে^ ৪র্থ। সারা বিশে^র প্রাকৃতিক উৎস থেকে মোট ৯০ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়। যেখানে বাংলাদেশের উৎপাদন হয় ১০ লাখ টন। এ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে দেশি প্রজাতির মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মাছ উৎপাদন বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নদীতে জাটকা নিধন বন্ধে ও মা ইলিশ রক্ষার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে অন্যতম ভ’মিকা ইলিশ মাছের। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের ৪ লাখ ৯৬ হাজার মে.টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.১৭ লাখ মে.টন। অধিদপ্তরের হিসাবে গত অর্থ বছরে দেশে উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশই ছিল ইলিশ।
ইলিশের উৎপাদন বাড়ার প্রধান কারণ, কয়েক বছর ধরে ইলিশ রক্ষায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য অধিদপ্তর, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও নৌবাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং সবার সহায়তায় বিশেষ অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে জাটকা সংরক্ষণ ও মা ইলিশ রক্ষা পায়। এ কারণেই ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারোর তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের মানুষের মাছ খাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। আগে জনপ্রতি প্রতিদিন গড়ে ৬০ গ্রাম মাছ খেত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম।
বিপন্নপ্রায় মাছের প্রজাতির সংরক্ষণ, অবাধ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে সার্বিক মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের ৫৩৪টি মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। অভয়াশ্রম-সংশ্লিষ্ট জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ফলে বিলুপ্তপ্রায় এবং বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির মাছ, যথা একঠোঁট, টেরিপুঁটি, মেনি, রাণী, গোড়া গুতুম, চিতল, ফলি, বামোস, কালিবাউশ, আইড়, টেংরা, সরপুঁটি, মধু পাবদা, রিঠা, কাজলি, চাকা, গজার, বাইম ইত্যাদির তাৎপর্যপূর্ণ পুনরাবির্ভাব ও প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অভয়াশ্রমে দেশি কই, শিং, মাগুর, পাবদা, ইত্যাদি মাছের পোনা ছাড়ার ফলে এসব মাছের প্রাচুর্যতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
কয়েক দশকে দেশে চাষ করা মাছের সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে, শিং, মাগুর, পাবদার মতো আরও বিভিন্ন প্রজাতির। দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ হারিয়ে যেতে বসেছিল। গবেষণার মাধ্যমে এ সকল দেশীয় প্রজাতির মাছের কৃত্তিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে এখন চাষ করা হচ্ছে। দেশের মাছের মোট উৎপাদনের শতকরা ৬০ ভাগ চাষ করা মাছ থেকে উৎপাদিত হয়। সাগরে মাছ ধরার নতুন নতুন আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন হলে মাছ উৎপাদন বেড়ে যাবে। ওই সব যন্ত্রের মাধ্যমে কোন এলাকায় বেশি মাছ আছে তা নিশ্চিত হওয়া গেলে সাগর থেকে মৎস্য আহরণ আরও বেড়ে যাবে। তাতে সার্বিকভাবে মৎস্য উৎপাদন আরও বাড়বে।
দেশে বিপুল পরিমাণ পাঙাশ, তেলাপিয়া ও রুইজাতীয় মাছের উৎপাদন বেড়েছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীনের উদ্ভাবিদ মাছের জাত এখন বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন শিক্ষিত তরুণেরা চাকরির দিকে না ঝুঁকে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো মৎস্য ও কৃষিকাজে সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে। এতে মানুষ মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। বাজারে মাছের ব্যাপক চাহিদাও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য। ২০১৭-১৮ সালে ৬৮৩০৫ দশমিক ৬৮ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৪ হাজার ৩১০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮ অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩.৫৭% মাছের অবদান রয়েছে। দেশের মোট কৃষি আয়ের ২৩.৮৪% আসে মৎস্য থেকে। অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা ও ইলিশ প্রজনন সূরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার মে. টন, যা ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার মে. টন। এটি বর্তমান সরকারের একটি অভূতপূর্ব সাফল্য। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে মৎস্যখাত ব্যাপক সফলতা অর্জন করছে। বাংলাদেশ থেকে গুণগত মানসম্পন্ন হিমায়িত চিংড়ি, মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী করা হচ্ছে।
এ বছর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মৎস্য সেক্টরে বর্তমান সরকারের অগ্রগতি বিষয়ে আলোচনা সভা ও প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন, মৎস্য বিষয়ক আইন বাস্তবায়নে মোবাইল মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, বিভিন্ন স্কুল কলেজে মৎস্য চাষ বিষয়ক আলোচনা ও প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, জেলা পর্যায়ে মৎস্য মেলা, হাট বাজার বা জনবহুল স্থানে মৎস্য চাষ বিষয়ক উদ্বুদ্ধকরণ সভা ও ভিডিও/প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন এবং সর্বশেষ দিন মৎস্য সপ্তাহ-২০১৯ এর মূল্যায়ন, সমাপনী অনুষ্ঠান ও পুরষ্কার বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে।
১৭ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১৯ উপলক্ষে সপ্তাহ ব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় অংশগ্রহণ করে মৎস্য সপ্তাহকে সুন্দর ও স্বার্থক করার জন্য সকলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.