
ইমাদ উদ দীন॥ হাওর অঞ্চলের কৃষকরা অনেকটাই উদ্বেগ উৎকন্ঠায়। হাওর জুড়ে সোনালী ফসল পাকা আধপাকা বোরো ধান দুল খাচ্ছে। এর মধ্যেই তাড়া করছে বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়া। আর করোনার কারনে শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি আছে বন্যার ঘনঘটাও। বৈরী আবহাওয়ার কারনে সংগৃহীত ধান প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণও করা যাচ্ছেনা। হাওর পাড়ের প্রতিটি কৃষক পরিবারের ঘরে কিংবা উঠানে এখন কাটা কিংবা মাড়াই করা ধানের স্থুপ। পর্যাপ্ত রোদের অভাবে তা শুকিয়ে গোলায় ভরতে পারছেন না। দিগন্ত জুড়ে বোরো ফসলের মাঠে এখন শুধু কৃষকের ধান সংগ্রহের মহাব্যস্ততা। হাওর পাড়ের সর্বত্রই এখন ধুম পড়েছে বোরো ধান কাটা,মাড়াই ও ঝাড়াইয়ের। চাষীরা ধান গোলায় তুলতে রাত দিন ব্যস্ত সময় পার করছেন। কিন্তু তারপরও আবাদকৃত পুরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে তাদের উদ্বেগ উৎকন্ঠার শেষ নেই। গতকাল সরজমিনে দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকিতে গেলে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে।
বোরো চাষীরা জানান গেল কয়েক বছরের চাইতে এবছর তেমন ভালো হয়নি বোরো ধানের ফলন। নানা রোগ বালাই আর পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা না থাকা ও সময় মত বৃষ্টিপাত না হওয়াতে এবছর তাদের বোরো ধানের বাম্পার ফলনের স্বপ্ন ভঙ্গ। তারা জানালেন এবছর হাওরের বিল এলাকায় সেচ সুবিধা থাকায় ওই জমি গুলোতে ফলন ভালো হয়েছে। এমন ফলনে চাষীরা সন্তুষ্ট। তবে উল্টো চিত্র অন্য জমিগুলোতে। ধান গুলো থোড় বের হওয়ার সময় পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় প্রতিটি ধানীছড়ার অর্ধেক ধানই অপুষ্ঠ (চুচা) ও চিঠা হয়েছে। যেখানে প্রতি বিঘায় ১৪-১৮ মণ ধান হওয়ার কথা সেখানে ৪-৫ মণ ধান নিয়ে সন্তুষ্ঠ থাকতে হচ্ছে। এতে ব্যয় কুলিয়ে উঠতে না পেরে ুক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন অধিকাংশ কৃষক।
কৃষকরা জানালেন হাওর এলাকা দিয়ে প্রবাহিত গাঙ্গ,ছড়া,নদী ও বিলের তলদেশ ভরাট হওয়াতে সময় মত এই পানির উৎস গুলোতে মিলেনা পানি। তারা জানালেন দীর্ঘদিন থেকে অবহেলীত ভরাট হয়ে যাওয়া পানির এই উৎস গুলো খনন না হওয়াতে চাষাবাদ নিয়ে তাদের এই অনাকাঙ্খিত অবর্ণনীয় দূর্ভোগ। তাদের দাবি হাওরের পানির এই উৎস গুলো যদি খনন করা হত তাহলে বর্ষা মৌসুমে যেমন তাদের ক্ষেত কৃষি আর ঘর বাড়ির চরম ক্ষয়ক্ষতি হতনা। তেমনি শুষ্ক মৌসুমেও চাষাবাদও ভালো হত। চাষীরা জানালেন এবছর চাষাবাদের শুরুর দিকে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু থোড় আসার কিছু আগে থেকেই নানা রোগবালাই,অনাবৃষ্টি,খরা আর প্রতিকূলতার পর সেই স্বপ্ন ভেস্তে যায়। তারপরও এবছর যে ফলন হয়েছে এখন তাও ঘরে তোলা নিয়ে রয়েছে চরম উদ্বিগ্নতা। কারন মৌসুম শুরুতেই রৌদ্রহীনতা,বজ্রপাত,বৃষ্টি,শ্রমিক সংকট ও বন্যার মহাহুমকিতে পড়েছেন হাওর পাড়ের বোরো চাষীরা। এনিয়ে বাড়ছে দু:শ্চিন্তাও। কারন ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার দু:সহস্মৃতি তাদের এখনো তাড়ায়। ওই সময়ে বাম্পার ফলনের বোরো ধানের সাথে মাছ,হাঁস,জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদসহ সবকিছুই কেড়ে নিয়েছিল আর্কষিক বন্যা ও দীর্ঘজলাবদ্ধতা। ওই অকাল বন্যায় ঘর বাড়ি আর ক্ষেতকৃষিসহ সব হারিয়ে নি:স্ব হয়েছিলেন তারা। তাই বোরো ধানের ফলন ঘরে তোলার সময় হলেই চাষিদের মনে জাগে নানা অজানা শঙ্কা। ওই ভয়াবহ বন্যার পরও অকাল বন্যা ও দীর্ঘ জলাবদ্ধতা রোধে নেওয়া হয়নি কোন স্থায়ী উদ্যোগ। নাব্যহ্রাস হওয়া হাওর ও নদী খননেও নেওয়া হয়নি পরিকল্পিত পরিকল্পনা কিংবা প্রকল্প। ওই দূর্যোগের সময় সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন,লোক দেখানো রিলিফ আর নানা প্রতিশ্রুতিই ছিল অন্যতম প্রাপ্তি। তাই এখন বন্যা মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি বলতেই শুধুমাত্র তাদের মনবলই পূঁজি। এনিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কষ্ঠ ও ক্ষোভ অন্ত নেই।
হাওর পাড়ের চাষীরা এমন তথ্য দিলেও বোরো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে জানাচ্ছেন তাদের উদ্বেগ উৎকন্ঠার কথা। জেলার সবক’টি হাওর ও নদী তীরে এখন দোল খাচ্ছে পাকা ও আধপাকা বোরো ধান। চোখ যতদূর যায় দিগন্ত জুড়ে শুধু সোনালী ধানের মাঠ। সবুজ সোনালী ধানের দোলনীতে কৃষকের মনে আনন্দ বাড়ে। জেলার হাকালুকি,কাউয়াদিঘি,হাইলহাওরসহ সবক’টি ছোট বড় হাওরের এখন বোরো ধান ঘরে তোলতে ব্যস্ত হাওর পাড়ের কৃষক। তাদের সে স্বপ্ন প্রত্যাশা ফিকে হবে কিনা এমন দু:শ্চিন্তাও ঘুরপাক খায়। বন্যা শিলাবৃষ্টি আর বজ্রপাতে মাঠের ধান মাড়াই ঝাড়াই শেষে গোলায় তোলতে পারবেন কি না এই ভয় কাটছেনা তাদের। আকাশে বৃষ্টির আভাস দেখলেই এমনই দু:শ্চিন্তায় ভর করে।
এবছর হাওর এলাকায় বি-২৮,বি-২৯, বি-৫৮ ও গাজী ধানের আবাদ বেশি হয়েছে বলে চাষীরা জানান। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ ভাগ ধান কাটার তথ্য দিলেও চাষীদের তথ্য মতে এপর্যন্ত প্রায় ৫০-৬০ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায় এবছর জেলা বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৩ হাজার ৫ শত হেক্টর। আবাদ হয়েছে ৫৩ হাজার ৫শত ৩০ হেক্টর জমি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ হেক্টর আবাদ বেশি হয়েছে। এতে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ৪৮৫ মেট্রিক টন। মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কাজী লুৎফুল বারী মুঠোফোনে জানান এবছর বোরো ধানের আবাদ ভালো হয়েছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত সেচ সুবিদা না থাকায় ও সময় মত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফলন কিছুটা আশানুরুপ হয়নি। তিনি কৃষকদের অভয় দিয়ে বলেন দুশ্চিন্তা না করে তুলনামূলক নিন্মাঞ্চল ধান আগে কাটার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন এপর্যন্ত প্রায় ৭০ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। যতদ্রুত সম্ভব ধান ঘরে তোলা যায় আমরা মাঠে থেকে কৃষকদের এই সহযোগিতা ও পরামর্শ দিচ্ছি। যাতে আবাদকৃত পাকা ধান কোনো ভাবেই নষ্ট না হয়।
হাকালুকি হাওর তীরবর্তী ভূকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির মুঠোফোনে জানান প্রতিবছরই বোরো মৌসুমে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন কৃষক। এ থেকে স্থায়ী কোন পরিত্রাণ নেই। নাব্যহ্রাস হওয়ার কারনে হাওরের জৌলুস দিন দিন কমছে। তাই শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি আর বর্ষা মৌসুমে বন্যা। দু’মৌসুমেই কৃষকরা হাওরের এমন বেহাল অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। তিনি বলেন হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় ভরাট হওয়া বিলগুলো দ্রুত খননের প্রয়োজন। হাওর বাঁচাও, কৃষক বাঁচাও,কৃষি বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের কেদ্রীয় সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন আহমদ বাদশা বলেন দীর্ঘদিন থেকে হাওর অঞ্চলের মানুষ অবহেলীত। বোরো মৌসুম এলেই এ দৃশ্য অনেকটাই সবার চোখে পড়ে। কিন্তু এই সমস্যা বছর জুড়েই চলমান। তিনি বলেন বিভিন্ন সময়ে সরকার পক্ষ শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কখন বাস্তবায়ন হয়না। ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে থাকা হাকালুকিসহ জেলার সবক’টি হাওর ও নদী বাঁচাতে সরকারকে দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত। তাহলে প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি হাওর বাঁচবে,কৃষি বাঁচবে, কৃষকও বাঁচবে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.