
মোঃ আবু তাহের:
আমরা দাদী নানীর কাছ থেকে, সেকালের চোর ডাকাতের অনেক গল্প শুনেছি। বই পুস্তকেও অনেক গল্প পড়েছি। এখনকার যুগে আর চুরি হয় না। এখন ডাকাতি,রাহাজানি,লুটতরাজ,অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতি,খুন খারাপি। সিঁদ কেটে বা চুপি চুপি দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করে চুরি করার দিন শেষ। চোরকে দরজা খুলে দিতে হয় অথবা চোর সজোরে আঘাত করে, গ্রিল বা দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে। আগেকার দিনে চোর গৃহস্থকে ভয় পাইত আর এখন গৃহস্থ চোরকে ভয় পায়। অনেক সময় দেখা যায় পুলিশের কাছে যে অস্ত্র, ডাকাতের কাছেও অনুরূপ অস্ত্র। ডাকাত ধরতে গিয়ে কোন সময় ডাকাত পুলিশ গুলি বিনিময় হয়। তবে পুলিশ পুলিশই, অনেক ডাকাতকে মৃতও ধরা হয়। এ ছাড়া ডিজিটাল ডাকাতি যেমন ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যাংক একাউন্ট লুট, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ও ফেস বুক হেক করে ডাকাতি। টেলিফোন করে লটারি প্রাপ্তি বা মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়।
ডিজিটাল চোরের গল্প লেখার অবিপ্রায় আমার নাই। দাদী নানীর কাছ থেকে চোরের যে গল্প শুনেছি তাহারই গল্প লিখিতেছি। চোর কখনো একা চুরি করিতে যায় না,তাহাদেরও ৫/৭ জনের দল থাকে। চোরদের আবার প্রকার আছে,সিঁদেল ও গরু চোর। পকেট মার বা কোন সময় রাস্তায় একা পেয়ে ভয় দেখিয়ে সর্বস্ব লুঠে নেয়। কোনএলাকা বা গ্রামে চুরি করতে তাহারা দলবদ্ধ হয়ে যায়এবং সেএলাকার বা গ্রামের চোর তাহাদের দলে থাকে কারণ রাস্তাঘাট,নির্দিষ্ট জাগা ও মানুষ পরিচয় করিয়ে দিতে হয়। চুরি করার সময় তাহারা কিছু সংকেত ব্যবহার করে,কে কোথায় বা কোন বিপদে একে অন্যের অবস্থান জানার জন্য। সংকেত কোন নির্দিষ্ট আলো, শিয়াল, কুকুর বা পাখির ডাক হইতে পারে। দলবদ্ধ চোর ছাড়া অন্য কেহ এই সংকেত বুঝিতে পারে না। চোরেরা যখন চুরি করতে ঘরে ঢুকে তখন তাহাদের গায়ে কোন কাপড় থাকে না, পরণে শুধু ছোট পেন্ট,মুখে কালি অথবা মুখোশ লাগায় যাতে কেহ চিনতে না পারে এবং সারা শরীরে তেল মাখে,কেহ শক্ত করে ধরতে পারে না। তেল পিচ্ছিল শরীর, মোছকা মেরে ছুটে দৌড়ে পালাতে পারে। এছাড়া চোরদের হাতে ছোট ছুরি ছাকু থাকে। ধরা পরলে নিজের আত্বরক্ষার জন্য অন্যকে জানে মারতে পরোয়া করেনা। চোর ধরতে গেলে, সতর্ক ভাবে নিজেকে নিরাপদ রেখে ধরতে হয়। তাই নিরাপত্তার জন্য চোর না ধরে,আইনের আশ্রয় নেওয়াই ভাল।
চোরদের আবার বুদ্ধি বেশি। এক চোর অনেক দিন পর জেল থেকে বাহির হয়েছে। জেল কাটলে কি হবে চরিত্র বদলায় নাই। "চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী"। বাড়ি অনেক দুর, হাঁটতে হাঁটতে অনেক রাত হয়েছে। এক বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়,দেখল ঘরের পাশে একটি বড় লোহার শাপল পরে আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে চিন্তা করিল,এই শাপল দিয়ে যদি ঘরে সিঁদকাটা যায় তবে ছেলে মেয়েদের জন্য কিছু নিয়ে যাওয়া যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। এ ঘর ছিল এক নাম করা চোরের। সে চিন্তা করিল,আমার ঘরে সিঁদ কাটবে এমন সাহসী চোর কই থেকে এল,দেখি বেটার কত সাহস ?
সিঁদ কাটা শেষ হলে, গৃহস্বামী কিছু ছাগলের বরি এনে সিঁদের মধ্যে ছেড়ে দিল। একটু দুরে ছিল ছাগল থাকার জায়গা,ছাগলের শব্দ ও শুনা যাচ্ছিল। তার পর শাপলের মাথায় একটি কাল পাতিল বেঁধে ভিতরে ঢুকিয়ে নারাচারা করিল,গৃহস্বামী কিছু মাকড়সার জাল ও ঘানু পাতিলে পেচিয়ে দিল। চোর ভাবল,এখানে মেরি বা তাক আছে,ভাল জাগাতে সিঁদকেটেছে। বেচারা চুপকরে বসে আছে,চোর বুঝল নিশ্চয় গৃহস্বামী নিদ্রিত আছে। এবার শেষ পরীক্ষা,কচি পাতাসহ কাঁঠালের ছোট একটি ডাল সিঁদের ভিতর দিয়ে ঢুকাইল, গৃস্বামী নিজে মুখ দিয়ে চিবিয়ে কয়েকটি পাতা ছিরে ছিরে রেখে দিল। চোর ডাল ফিরত নিয়ে,নাকে শুকতে থাকে। এ যে ছাগলের লালা নয়,মানুষের লালার গন্ধ। নিশ্চয় গৃহস্বামী জাগ্রত এবং আমার চেয়ে বড় বুদ্ধিমান।
যে গল্প লিখব বলে কলম ধরেছিলাম, সেই গল্পেই আসি। কোন এক প্রত্যন্ত গ্রামে একটি হাটিবান্দা লম্বা বাড়ি ছিল। সে বাড়ীর মধ্যের এক ঘরে-মা, ছেলে আর ছেলের বউ তিন জনের বাস। সরকারি চাকুরীর সুবাদে, ছেলে দুর শহরে থাকেন। মাস শেষে বেতন নিয়ে সপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়িতে আসেন। ছুটি শেষে আবার চলে যান। ছেলে বাড়িতে না থাকলে,রাতের বেলা ভয়ভীতির কারণে,বউ ও শাশুরী এক রুমেই থাকেন।
তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলনা। মশার কয়েল বা স্প্রে সে সময় বাহির হয় নাই। বিভিন্ন ভাবে ধুপ ধুমা দিয়ে গ্রামের মানুষ মশা তাড়াইত। গরমের সময় হাত পাখা ছিল একমাত্র সম্বল। তারপরেও টিনের ঘরের চাইতে ছনবাঁশের ঘর ছিল আরাম দায়ক। বর্তমান যুগের এয়ারকন্ডিশন। এখন ধনী বড় লোকেরা,দুরে গাছ গাছরার আড়ালে ,ছনবাঁশ দিয়ে সুন্দর আরামদায়ক বাগান বাড়ি তৈরী করে,আর গরমের সময় সেখানে পিকনিক (বনভোজন) করতে যায়। রাতের বেলা কেরসিনের কুপিবাতি বা অনেকে হারিকেন জ্বলাইতেন। গরমের সময় বাড়ির আঙ্গিনায় দলবেধে বসে গল্প,কেচ্ছা কাহিনী ও গান বাজনা করে অর্ধ রাত্রি শেষ করিতেন।
সেদিন গরমের সময় ,আকাশ মেঘলা এবং সামান্য ঠান্ডা বাতাস ছিল। বউ ও শাশুরী ঘেন-ঘেন হাত পাখা ঘুরাইতে ঘুরাইতে একটু আগেই ঘুমিয়ে ছিলেন। মধ্য রাতে শাশুরী বালিশের নিচ হইতে দিয়াশলই বাহির করে কাটি জ্বালিয়ে কুপি বাতি জ্বালাইলেন এবং পিছনের দরজা খুলে প্রকৃতির ডাকে সারা দিবার জন্য বাহিরে গেলেন। ঝুপের আড়াল থেকে দেখতে পান,মাথা এবং মুখ বাঁধা,ছোটপেন্ট পরনে উদলা (খালি) গায় ভূতের মত কাল এক লোক চট্ করে খোলা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে। তিনি প্রকৃতির কাজ শেষ করে ঘরে প্রবেশ করেই দরজায় ভাল করে খিল দিলেন। চৌকির ( বিছানার) উপর বসে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে, পানের বাটা বাহির করে পান চিবাইতে আরম্ভ করিলেন। আর অনুমান করিলেন চোর তাহার চৌকির নিচে আশ্রয় নিয়েছে,মাঝে মধ্যে চৌকির নিচে হাল্কা শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনা যাইতেছিল।
বউ গভীর নিদ্রায়, তিনি কান্না ভিজা এবং নম্র স্বুরে বউকে ডাকিতে লাগিলেন।
শাশুরী:-বউ মা-বউ মা হজাগনি গো
বউ মা:-কেন গো আম্মা,এত রাতে এভাবে ডাকিতেছেন ?
শাশুরী:-না কিচ্ছু নায়-একটা খবর তোমারে কইতাম আছিল কিন্তু এখন কইতাম নি- না কইতাম না চিন্তা করিতেছি--
বউ মা:-নাগো আম্মা,কিতা খবর এখনই কইলাইন।
শাশুরী:-কইলেত তুমি কান্নাকাটি আরম্ভ করি দিবায়। যদি না কান্দ তবে কইতাম পারি।
বউ মা:-আমি কানতাম নায় কইলাইন
শাশুরী:-এশার নামাজের সময় খবর আইছিল,হঠাৎ বেদনায় ধরে তোমার বাপ মারা গেছইন !আমি তোমারে কইছিনা,তুমি কানবায় করি। রাইত পোয়াইলে দয়োজন জাইমুগি। এখন নিজেরই মন বানতাম পারলাম না তাই তোমারে কইলাম।
বউ মা:-হাউ মাউ করে কান্না আরম্ভ করিলেন, সাথে শাশুরী ও বড় গলায় কান্না আরম্ভ করিলেন
মাঝ রাতে বউ ও শাশুরী দুইজনের কান্না ও চিৎকার শুনে হাটিবাড়ি এবং আশপাশ বাড়ির মানুষ বাড়ির আঙ্গিনায় এসে একত্রিত হইলেন।
প্রতিবেশী:-কি হয়েছে তোমাদের,দরজা খুলেন--
শাশুরী:-দরজা খুলিলেন,সবাই ভিতরে প্রবেশ করার পর আবার দরজা বন্ধ করিলেন।
প্রতিবেশী:-কখন বউর বাপ মারা গেছেন, কি হয়েছিল ?
শাশুরী:-না বউ মার বাপ মারা যান নাই।
প্রতিবেশ:-তাহলে কি হয়েছে-
শাশুরী:- কিছু হয় নাই-
প্রতিবেশী:-কিছু হয় নাই ! মাঝ রাতে এত কান্না কাটি কেন ?
শাশুরী:-একজনের হাত থেকে টর্চ লাইট নিয়ে। এই দেখেন--আমার বিয়াই ,চৌকির নিচে লুকাইছেন।
প্রতিবেশী:-তাই নাকি ? সবাই মিলে চোরকে চৌকির নিচ হইতে বাহির করে এনে কিছু উত্তম মধ্যম দিয়ে, পিঠমোরা করে হাত বেঁধে থানায় নিয়ে গেলেন।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.