
এম. মছব্বির আলী॥ জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় নদীর দু’পাড়ের মানুষের দুঃখের অবসান হচ্ছে অবশেষে। মৌলভীবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হওয়ায় এতদ অঞ্চলের মানুষের মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে মনু নদী ভরাট হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙ্গে আশপাশের এলাকা প¬াবিত হয়ে ব্যাপক ফসলহানি ঘটায়, দীর্ঘদিন থেকে মনু নদী খনন না করায় পলি জমে নদীর নাব্যতা হ্রৃাস পাওয়ায় অতি বৃষ্টিতে নদীর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙ্গে হাজার হাজার একর জমির ফসলের যে ব্যাপক ক্ষতি হতো তা চিরতরে বন্ধ করতে ২১ জুন রবিবার সকালে মনু নদী ভাঙ্গন রক্ষা প্রকল্পের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ৯৯৬ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা ব্যয় ধরে “মনু নদীর ভাঙন থেকে মৌলভীবাজার জেলার সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলা রক্ষা প্রকল্প” নামের প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। এই প্রকল্পটি অনুমোদন হওয়ায় নদী প্রবাহিত কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় মানুষের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ নেছার আহমদ এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তীকে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সরকার দলের রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা মিষ্টি বিতরণও করেছেন। এছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের খবরে মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মোঃ ফজলুর রহমান তাঁর কার্যালয়ে গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিকসহ পৌরসভার কর্মকর্তাদের মাঝে মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন। 
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালের পর এই প্রথম মনু নদীতে মৌলভীবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হয়েছিলো- সেগুলো ছোট ছোট প্রকল্প ছিলো। এটাই মৌলভীবাজারের ইতিহাসে পানি উন্নয়ন বোর্ড তথা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। প্রকল্পে রয়েছে- ৩০ দশমিক ২৪ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ। প্রকল্পের আওতায় ৩টি উপজেলায় ভাঙ্গণপ্রবণ ৬৭টি স্থানে ৩০ দশমিক ২৪ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ৮৫ দশমিক ৯১ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পূণর্বাসন কাজ। শহর রক্ষার জন্য আছে শহরের কুসুমবাগ এলাকার এসআর প¬াজা থেকে শাহবন্দর পর্যন্ত ২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ আরসিসি ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ এবং ৭৬৬ মিটার বিদ্যমান ফ্লাড ওয়াল পূণর্বাসন। এতে ৭৬৬ মিটার বিদ্যমান ফ্লাড ওয়ালের উচ্চতা বাড়ানো হবে এবং নীচে হেভি শিট দিয়ে মজবুত করা হবে। প্রকল্পে ১২ দশমিক ১১ কিলোমিটার চর অপসারণ করা হবে।
জেলার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত মনু নদ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপত্তি হয়েছে। ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মনু নদের ৯৩ কিলোমিটার পড়েছে ভারত অংশে। বাংলাদেশে ৭৩ কিলোমিটার। জেলার কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের তেলিবিল এলাকা দিয়ে মনু নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে মিশেছে। মনু নদীর বাংলাদেশ অংশের উভয় তীরে ১৪০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। মনু নদীর বন্যা জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার জন্য একটি স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিবছরই এই তিনটি উপজেলার কোথাও না কোথাও মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে কমবেশি বন্যা নিয়ম হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসল, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িসহ মূল্যবান নানা স্থাপনা। বারবার বন্যার ছোবলে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে নদীর দুই পাশের অনেক পরিবার। অনেক সময় বাংলাদেশ অংশে ভারী বর্ষণ না হলেও উজানে ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাত হলে নদীটি দ্রুত ফুলে ফেঁপে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে নদী ভরাট হওয়ার কারণে উজান থেকে দ্রুত নেমে আসা পানি ধারণ করতে পারে না। তখন নদীর দুই পারের কোথাও না কোথাও বাঁধ উপচে বা বাঁধ ভেঙে বন্যা হচ্ছে। এতে মানুষের ফসলের পাশাপাশি ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও নানা রকম স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রতিবছর রাস্তাঘাট নির্মাণে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
মনু নদীর ভাঙ্গন কবলিত এলাকা হাজিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত বাচ্চু ও পৃথিমপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নবাব আলী বাকর খান জানান, দীর্ঘদিন পর মনু নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একনেকে এই প্রকল্প পাশ হওয়ায় সরকার প্রধান ও সংশি¬ষ্ট সকলকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অচিরেই কাজ শুরু হয়ে মনু পাড়ের সাধারণ মানুষের দুঃখ লাঘব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
এক প্রতিক্রিয়ায় কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি এ কে এম সফি আহমদ সলমান বলেন, মনু নদীর বৃহদাংশ কুলাউড়া উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত রয়েছে। প্রতি বছরের বন্যায় নদী পাড়ের মানুষের ঘরবাড়িসহ ফসলাদি বিনষ্ট হয়। এই প্রকল্পটি অনুমোদন হওয়ায় উপজেলাবাসীর পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশি¬ষ্ট সকলকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী মঙ্গলবার বিকেলে জানান, আগামী শুষ্ক মৌসুমে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। মনু নদীর দুই তীরের ৬৭ টি স্থানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানে জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে অনেক ধরনের কাজ হবে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর প্রকল্পটি অনুমোদন হয়েছে। আরো অনেক প্রক্রিয়া শেষে আগামী শুষ্ক মৌসুমে কাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.