
এম. মছব্বির আলী॥ এই প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ, সরকারী কর্মচারীরা তার সেবক মাত্র। এটা শুধু সংবিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বাস্তবে প্রমান করে গেলেন জুড়ীর সেই আলোচিত ইউএনও অসীম চন্দ্র বণিক।
চাকুরীতে যোগদানের পর থেকে নিজের দক্ষতা ও দূরদর্শিতা দিয়ে একের পর এক ভালো কাজ করেছেন তিনি। যার জন্য বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়ে তিনি ব্যাপক প্রশংসা কুঁড়িয়েছেন। প্রায় তিন বছর সময় ধরে মৌলভীবাজারের জুড়ীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন অসীম চন্দ্র বণিক। সম্প্রতি পদোন্নেতি পেয়ে চাঁদপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছেন। আগামী সপ্তাহে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। জুড়ীতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে অসংখ্য ভাল কাজের অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি। বিদায় বেলায়ও মানবিক কাজ করে যেতে ভূলে যাননি সরকারের মাঠ প্রশাসনের এই চৌকুস কর্মকর্তা। তাঁর চলে যাওয়ার মুহুর্তেও তিনি বেশ কয়েকজন অস্বচ্ছল ব্যক্তিকে কর্মসংস্থানের জন্য আর্থিক অনুদান দিয়ে আরো একটি ভালো কাজের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেলেন। বিদায়ী ইউএনও অসীম চন্দ্র বনিকের পদোন্নতি পাওয়ার পর বিদায় বেলায় জুড়ীতে পেয়েছেন অনেক বিদায়ী সংবর্ধনা। এদিকে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি জেলা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যক্তিগত পক্ষ থেকেও দেয়া হয়েছে সংবর্ধনা। জুড়ী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও উপজেলার সকল জনপ্রতিনিধি, জুড়ী তৈয়বুনন্নেছা সরকারি কলেজ, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা ও উপজেলা স্কাউট্স, জুড়ী শিল্পকলা একাডেমী, জুড়ী উপজেলা প্রেসক্লাব, জুড়ী টাইম্স ও জুড়ী সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ তাঁকে করোনা কালীন সময়ে সামাজিক দূরত্ব রেখে সংবর্ধনা দিয়ে সম্মান দেখিয়েছে।
২৯ জুন সোমবার বিকেলে জুড়ী থেকে ঢাকায় ফেরার পথে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক টাইমলাইনে বিদায় জুড়ী বলে একটি আবেগগণ স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি উলে¬খ করেন, জুড়ীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে কাজ করেছি দুই বছর আট মাস সাতাশ দিন। জুড়ীতে কাজ করে এই উপলব্ধি হয়েছে যে, জীবন অনেক সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। সাধারণ মানুষের শক্তি অসাধারণ। কখনই অন্যের কথায় অন্যায় কাজে জড়িত হওয়া যাবে না। অন্যায় যেই করুক সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা স্পষ্ট অবস্থান তৈরি করতে হবে। এটাই জীবনের সৌন্দর্য। আমি তারুণ্যের শক্তির পক্ষে। ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। ভালো থাকুক আমাদের সকলের ভালোবাসার জুড়ী। ভালো থাকুক জুড়ীর জনগণ।
জানা যায়, জুড়ীর বিদায়ী ইউএনও অসীম চন্দ্র বণিক বিদায় বেলায়ও মানবিক কাজ দেখিয়ে উদারতা সৃষ্টি করে গেলেন। সোমবার অসহায় তিনজন মানুষের মাঝে জনপ্রতি ৯ হাজার ৮০৭ টাকা করে ব্যবসা করার জন্য নগদ টাকা প্রদান করেছেন।
মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ শাহাব উদ্দিন সাহেবের ব্যক্তিগত তহবিল হতে ৫০ পঞ্চাশ হাজার টাকা অসহায় মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা ব্যবসার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে ইউএনও অসীম এ টাকা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের কামিনীগঞ্জবাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিবন্ধী রাজন মিয়া, মনতৈল গ্রামের প্যারালাইসেস রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী শামীম মিয়া, কালিনগর গ্রামের বৃদ্ধ অসহায় আব্দুর রহমান কে টাকাগুলো প্রদান করা হয়। এর আগে সাগরনাল ইউনিয়নের অসহায় জুনাব আলীকে নগদ ১০ হাজার টাকা, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পের আওতায় ভিক্ষুকদের মাসিক সঞ্চয় বাবত ১০ হাজার ৫৭৭ টাকাসহ মোট ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন। বিদায়ী ইউএনও অসীম চন্দ্র বণিকের উদ্যোগে তারা প্রত্যেকেই পেয়েছেন নতুনভাবে কর্মসংস্থান করে বেঁচে থাকার আনন্দ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী, ২৯তম বিসিএস ক্যাডারের এ চৌকুস কর্মকর্তা ২০১১ সালের ১ আগস্ট কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখান থেকে ২০১৪ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দেন। ২০১৬ সালে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যোগ দেন। এরপর ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে জুড়ী উপজেলায় যোগদান করেন। জুড়ীতে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাহসিকতার মধ্যে দিয়ে শত বাঁধা পেরিয়ে সৃষ্টিশীল ও ব্যতিক্রমী কর্মযজ্ঞ করে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন এবং সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হন।
জুড়ীতে তাঁর কর্মকালীন সময়ে প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বালু মহাল লিজ, শতবর্ষী বাজার উদ্ধার, জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসন, পাহাড়-টিলা কাটার বিরুদ্ধে অভিযান, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও নিজের বেতনের টাকায় হাকালুকি হাওরে বোরো ধান কাটায় নিয়োজিত ৫০০ শ্রমিককে খাবার খাওয়ানোসহ বেশ কয়েকটি রিপোর্ট বিভিন্ন গণমাধ্যমে পর পর প্রকাশিত হলে দেশব্যাপী আলোচিত হয়ে যান তিনি।
তাঁর কর্মকালীন সময়ে বিশেষ করে জলাবদ্ধতা নিরসনে জুড়ী চৌমুহনী থেকে জুড়ী নদী পর্যন্ত অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে দেড় কিলোমিটার খাল খনন ছিল আলোচিত। রেলপথের অবৈধ জায়গা উচ্ছেদ করে প্রায় ২৫ হাজার লোকের দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর করেন। জুড়ী হাসপাতালের ভেতরে একটি ঘর নিয়ে এক ব্যক্তির করা মামলা উচ্চ আদালতে মোকাবেলা করে হাসপাতালটি চালু করেন এবং ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে উপজেলাকে রাখেন শতভাগ নকলমুক্ত। শহরের দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। জুড়ী শহরের প্রধান সমস্যা জুড়ী শিশু পার্ক ও পোস্ট অফিস সংলগ্ন অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী কামিনীগঞ্জ বাজারে স্থানান্তর করে শতবর্ষী মৃত বাজারকে জীবিত করে ব্যাপক প্রশংসিত হন। এই বাজার বর্তমানে ৭০ লক্ষ টাকা সরকারিভাবে ইজারা প্রদান করা হয়। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত ছিল। সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে জিরো ট্রলারেন্স ছিল। এছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবাধে পাহাড় ও টিলা কাটার বিরুদ্ধে অভিযান করে করেছেন লক্ষ লক্ষ টাকার জরিমানা। সরকারি ধান ক্রয়ে সিন্ডিকেট চক্র ভঙ্গ ও হাট-বাজার সিন্ডিকেট চক্র ভঙ্গ করা হয়। এছাড়া জুড়ী নদীর বালুমহালে রাজস্ব ছাড়া বালু উত্তোলনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র ভঙ্গ করেন হাইকোর্টের প্রভাবশালী আইনজীবী মঞ্জিল মোর্শেদের মাধ্যমে। ফিরিয়ে আনেন সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব। এখন প্রতিবছর সরকার এই বালু মহাল থেকে ৭০- ৮০ লক্ষ টাকা ইজারা প্রতি বছর পাচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে দেড় কোটি টাকার প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমোদন করিয়েছেন। উপজেলার ভেতরে ও উপজেলা সদরের স্টেশন রোডে জরাজীর্ণ রাস্তাঘাট, ড্রেনসহ বিভিন্ন কাজে ৫ কোটি টাকার বরাদ্দ এনেছেন। যা উপজেলা পরিষদের বহির্ভূত বরাদ্দ। জেলা পরিষদের অর্থায়নে উপজেলার পুকুরপাড়ের সৌন্দর্য্য বর্ধনে ঘাটলা তৈরিসহ আধুনিক রেস্টহাউস নির্মাণ করা হয়। উপজেলার জরাজীর্ণ অফিস দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিকায়ন করা হয়। সরকারের প্রতিটি নির্দেশনা বাস্তবায়নে সকল জনপ্রতিনিধিদের সাথে স্বমন্বয় করে কাজ করেছেন। এছাড়া উপজেলার তিনটি চা-বাগান থেকে ভূমি উন্নয়ন কর হিসেবে সরকারের ৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছেন। এছাড়া বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে উপজেলার মানুষকে নিরাপদ রাখতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত মাঠে থেকে বিরামহীনভাবে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। সরকারের ত্রাণ কর্মহীন অসহায় মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে গেছেন মানুষের বাড়ি বাড়ি। সুষ্টু ও সুন্দরভাবে করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা তালিকা। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে হাকালুকি হাওরে বোরো ধান কাটতে ৫০০ শ্রমিককে নিজের বেতনের টাকায় দুপুরের খাবার খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হন। অনেকেই, তাঁর এতসব মানবিক ও সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডে তাকে গরীব-দুঃখী মানুষের বন্ধু, জনদরদী ইউএনও ও মানবিক ইউএনও বলে অ্যাখায়িত করেছেন। তাঁরা বলছেন, ইউএনও অসীম জুড়ী বাসীর মন জয় করেছেন ভালোবাসা দিয়ে, শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন কর্তব্যপরায়ন দিয়ে। সাহসী ভূমিকা নিয়েছেন অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে। উপজেলার প্রতিটি মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সংকট-সম্ভাবনা সবকিছুই যেন তাঁর নিজের করে নিয়ে প্রতিটি নাগরিককে সেবা দিয়ে গেছেন আপন মহিমায়।
এক প্রতিক্রিয়ায় জুড়ীর বিদায়ী ইউএনও অসীম চন্দ্র বণিক বলেন, পদোন্নতি কাজ করার বড় সুযোগ। বড় বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখার দারুন একটা প¬াটফর্ম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদটি। সরকার এই পদে কাজ করার সুযোগ দানের জন্য চিরকৃতজ্ঞ। তিনি আরো বলেন, আমার দায়িত্বকালীন সময়ে জুড়ীবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। দায়িত্ববোধ থেকে সার্বিক বিষয়ে নিজের সেরাটা নিংড়ে দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। চাকুরীর সুবাধে যেখানেই দায়িত্বপালন করি না কেন জুড়ীবাসীর কথা মনে থাকবে আমার চিরকাল। বিদায় জুড়ী; ভালো থাকুক আমাদের সকলের ভালোবাসার জুড়ী। ভালো থাকুক জুড়ীর জনগণ।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.