
শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি॥ শ্রীমঙ্গল উপজেলায় যন্ত্রদানব ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিনব ‘রাতচোরা’ কৌশলে হাইলহাওরের ফসলি জমি,বসত ভিটের আশপাশের ক্ষেতের জমির ও বাড়ীর পুকুর খননের নামে মূল্যবান সিলিকা বালু উত্তোলন করছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র। তারা দিনের পর দিন অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করার ফলে এসব এলাকার ফসলি জমির আকৃতির শ্রেণী পরিবর্তন ঘটে ভূমি ধ্বসের আশঙ্কাসহ ভূমিকম্পনের হুমকিতে রয়েছে তিন ইউনিয়নের ১৪/ ১৫টি গ্রামের কয়েকশত পরিবার ও এলাকাবাসী। বোমা মেশিনে রাতভর শত শত টন বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞগণ ওই এলাকার কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ভ’কম্পনের মাধ্যমে ভূমিধ্বস ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরসহ ক্ষমতাসীন মহলকে মোটা অংকের মাসোহারা লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় একযুগ বছরধরে ওই চক্রটি বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে অনেকটা নির্বিঘ্নে বোমা মেশিন দিয়ে কোটি কোটি টাকা দামের সিলিকা বালু প্রকাশ্যে ট্রাক,কভার্ডভ্যান গাড়ীতে বিক্রি করে সরকারের মোটা অংকের রাজস্ব ফাঁকি দেয়াসহ গ্রামীন রাস্তাঘাট ও ব্রীজ কালভার্ট ও এলাকার ফসলি জমির ভূপ্রকৃতির অবস্থান বিনষ্ট করেছে। বিশেষ করে উপজেলার ভূনবীর,মির্জাপুর ও সিন্দুরখান এই তিনটি ইউনিয়নের ১৪/১৫ টি গ্রামের ভূস্তরের পানির তীব্র সংকটসহ ব্যাপক ভূমি ধ্বসের ঝুঁ^কিতে পড়েছে।
অন্যদিকে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে তোলা হাজার হাজার ঘনফুট এসব সিলিকা বালু ভুনবীর ও স্টেশন চৌমুহনায় ডিপো করে ড্রামট্রাক দিয়ে বড় বড় ট্রাক কভার্ডভ্যান ভর্তি করে প্রতিঘন ফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে ট্রাক যোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দিনে রাত শত শত ট্রাকে সিলিকাবালু বিক্রি করে একেকজন বালু ব্যবসায়ি অল্পদিনে রাতারাতি গাড়ী বাড়ীর মালিক হয়ে কোটিপতি সেজে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।
ওই সংঘবদ্ধ চক্র আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে উপজেলার ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে সাতগাঁও লছনা নামক স্থান থেকে সাতগাঁও স্টেশন চৌমুহনা ও ভুনবীর চৌমুহনা থেকে মির্জাপুর ইউনিয়নের বৌলাশীর পর্যন্ত ও সিন্দুরখান এবং আশিদ্রোন ইউনিয়নের উদনাছড়া ও বিলাসছড়ার মতিগঞ্জ এলাকায় আঞ্চলিক সড়কের দুপাশে অসংখ্য বালুর স্তুপ করে ডিপো করে কোটি কোটি ঘনফুট বালু বিক্রি করছে। অথচ এদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর কোনও অভিযান পরিচালনা করছে না। মাঝে মধ্যে ফেসবুকে বা এলাকাবাসীর পক্ষে কেউ এসবের প্রতিবাদ জানালে প্রশাসন কিছুটা নড়ে চড়ে বসে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষজন চলাফেরায় চরম ভোগান্তিতে পড়লেও হয়রানীর ভয়ে কেউ তাদেও বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারছেন না।
অবৈধ এ বালু ব্যবসাটি এলাকায় এমন পরিস্থিতি ধারণ করেছে এ অবৈধ ব্যবসায় বেশী লাভজনক হওয়াতে গ্রামের ভেতর দিয়ে ছোট ছোট ছড়া ও গ্রামের পুকুর থেকে বোমা মেশিন বসিয়ে বালু তোলার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগীতা চলছে। কার স্থান কে দখলে নিয়ে বালু সংগ্রহ করে বিক্রি করবে এমন অবস্থা।
সম্প্রতি অব্যাহতভাবে বোমা মেশিনে বালু তোলার কারণে বিভিন্ন এলাকায় ভূস্তরের পানির তীব্র সংকটসহ ১৪ থেকে ১৫টি গ্রাম ভূমি ধ্বসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় একটি সাধারণ বালু ও ২৮টি সিলিকা বালুসহ মোট ২৯টি বালুর মহাল রয়েছে। এসব মহালের বালু নিলাম ডাক হয়নি। পরিবেশের ছাড়পত্রের জন্য নিলাম ডাকা আটকে আছে। অথচ উপজেলাজুড়ে পাহাড়ি ছোট বড় ছড়া ও ফসলি জমি থেকে বোমামেশিন দিয়ে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের তীব্র প্রতিযোগীতা।
২০০৯ সাল থেকে উচ্চ আদালত ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু ওই নিষেধাজ্ঞা অমান্য কওে উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ২৫/৩০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাইপ বসিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাওয়ার পাম্প ব্যবহার করে মাটির ১০০ থেকে ২০০ ফুট তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করছে ওই প্রভাবশালী চক্রটি।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে দিনের বেলায় ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে বালু উত্তোলন করা হতো। কিন্তু এখন কৌশল পাল্টিয়েছে বোমা মেশিন-এর প্রভাবশালী চক্র। তাঁরা এখন ‘রাতচোরা’ কৌশল নিয়েছেন।
তাঁরা রাতে ভূনবীর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ ফসলি জমি ও পুকুর খননের নামে মেশিন দিয়ে প্রতি রাতে লাখ লাখ টাকার বালু তুলছেন।
সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়,ভূনবীর ইউনিয়নের শাসন গ্রামে মুকাইদ ও বাবুল চারটি মেশিন লাগিয়ে ফসলের ক্ষেতে বালু তুলে বিশাল আকারের বালির স্তুপ করে রাখা। আশপাশের লোকজন অভিযোগ করেছেন বাড়ির পাশ^বর্তী কৃষি জমিতে প্রতিদিন রাতে মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে সেখান থেকে রাতের বেলায় বড় বড় ট্রাকযোগে ঢাকায় বালু পাচার করা হচ্ছে।
একই ইউনিয়নের ভুনবীর উচাপুলের শ^শানঘাটের এলাকায়, ভিমসী জীবনগঞ্জ এলাকার ফসলি জমি থেকে রাতেরবেলা মেশিন বসিয়ে কয়েক লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করছে চিহৃত বালুব্যবসায়ীরা। ভুনবীর জৈতাছড়া এলাকার পূর্বে হাওরের কৃষি জমিতে দুইটি বোমা মেশিন লাগিয়ে বালু তুলেছে ওই এলাকার এক জনপ্রতিনিধি ও তার সহোদররা।
একইভাবে ইসলামপাড়া ইছামতি কাজী ফার্মের পার্শ^বর্তী এলাকা থেকে একই পন্থায় বালু উত্তোলন করেছে একটি চক্র।
ভূনবীরের বাজারের পশ্চিমে গাংগের পাড়ের জমি থেকে কয়েক লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে সেখান থেকে গত ১৫/২০ দিন ধরে রাতের বেলা ট্রাকযোগে বালু পাচার অব্যাহত রেখেছে।
একই ইউনিয়নের নতুন বাগান এলাকার আউয়াল মিস্ত্রীর বাড়ির পাশ থেকে বোমা মেশিনে বালু তোলা হচ্ছে। একই পন্থায় মির্জাপুর ইউনিয়নের যাত্রা পাশা ও ববানপুর চা বাগানের ফ্যাক্টরী এলাকা থেকে এক বালু ব্যবসায়ি ক্ষেতের জমি থেকে মেশিনদিয়ে বালু তোলছেন।
সিন্দুরখান ইউনিয়নের গোলগাঁও গ্রামের ফারুক মিয়া হামিদপুরের চা ব্যবসায়ী আলতা মিয়ার বাড়ির সামন থেকে বালু উত্তোলন করছে। ফলে উদনাছড়ার পাড়ের কয়েক গ্রামে ভূমি ধ্বসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সে সিন্দুরখান ও আশিদ্রোণ ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত উদনা ও বিলাশ ছড়ায় কমপক্ষে ১৫/২০টি পয়েন্টে প্রতিদিন শত শত ট্রাকদিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে এলাকার রাস্তাাঘাটও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই ভাবে কালাপুর ইউনিয়নের কালাপুর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে একই পন্থায় বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। এভাবে উপজেলার ভুনবীর, মির্জাপুর, সিন্দুরখান ও কালাপুর ইউনিয়নের কম পক্ষে ৩০/৪০টি স্থানে মেশিন দিয়ে এবং নিলামডাকবিহীন সরকারি ছড়া থেকে অবৈধ ভাবে লাখ লাখ ঘনফুট বালু তুলে রাতা রাতি কোটি পতি হচ্ছে একটি সিন্ডিকেট চক্র।
কথা হয় ভুনবীর এলাকার এক শ্রমিকের সাথে। তিনি জানালেন,দিনের চেয়ে রাতে নিরাপদ বেশি, তাই রাতে চলে বেশির ভাগ মেশিন।
প্রশাসনের নতুন অভিযান এড়াতেই বোমা মেশিন চালাতে ‘রাতচোরা’ কৌশল নিয়েছেন তাঁরা। প্রতিদিন একেকটি মেশিনে বিশ গাড়ী বালু তুলে। আর সেটা বিক্রি হয় প্রায় ১৮শত থেকে ২হাজার টাকায়।
আর আমাদের লোড আনলোড খরচসহ গাড়ি প্রতি ছয়শত টাকা করে দেয়া হয়। তার মতে, বোমা মেশিন দুটি কৌশলে চলে। অভিযানের খবর পেলে ওই মেশিন পানিতে ফেলে রাখা হয়। আরেকটি লতাপাতা দিয়ে ঢেকে (চোরা) মেশিন লুকিয়ে রাখার কৌশল।
পরে লোকবল সরিয়ে ফেলা হয়। মেশিনের সাইলেন্সার (শব্দ) পাইপ পানিতে ফেলে রাখা হয়। ফলে অভিযানের সময় মেশিনটি হাতের নাগালে না পাওয়ায় প্রশাসন তা ধ্বংস করতে পারে না।
স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ,অব্যাহত বালু উত্তোলনের ফলে রাস্তাঘাটের ক্ষয়ক্ষতি ও কৃষি জমি ধ্বংস হচ্ছে। এসব বিষয়ে বার বার অভিযোগ করা হলেও যথাসময়ে প্রশাসন থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে দু একটি অভিযান হলেও জব্দকৃত বালু আবার নিলাম ডাকে ওই সিন্ডিকেটচক্রই কম দামে কিনে নেন। নিলামডাকের কেনা বালুকে পুঁজি করে তারা নতুন করে বীরদর্পে অবৈধবালু বিক্রি শুরু করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,বোমা মেশিন ব্যবহার ও অবৈধ ছড়াগুলো থেকে বালু উত্তোলনের জন্য এই বালু সিন্ডিকেট চক্রটি বিভিন্ন মহলের নামে নিজেরা মোটা অংকের টাকা সংগ্রহ করে প্রতিমাসে ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকা আদায় করে নিরাপদে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বন্টন করছে। যা সর্বমহলে ওপেন সিক্রেট।
গ্রামীন এলাকায় ফসলি জমি ও পুকুর থেকে বোমা মেশিনের মাধ্যমে অবৈধপন্থায় বালু উত্তোলনের দীর্ঘমেয়াদী বিরুপ প্রভাব সম্পর্কে কলেজ অফ এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস এর সহকারী অধ্যাপক পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. মো রেহান দস্তগীর বলেন,‘মাটির তলের জলাধারের পানির যে সরবরাহ প্রক্রিয়া সেখানে মূল ভুমিকা পালন করে বালু। যদি মাটির তলে বালু না থাকে তাহলে মাটির নীচের অনুজ পাথর দিয়ে পানিটা প্রবাহিত হয় না। বালু না থাকলে পানির প্রবাহটা কমে যাবে। ৪/৫ বছর পর দেখা যাবে এই এলাকার পানির জলাধারটা আরো নীচে নেমে যাবে। ঐ এলাকায় পানি উত্তোলনে সমস্যা হবে। একটা সময় হয়তো সেখানে পানিই থাকবে না’।
তিনি বলেন,ঐসব এলাকায় তো হাজার হাজার টন বালু তোলা হচ্ছে, ফলে অবশ্যই সেখানে ভুমিধ্বস হবে এবং ভূমিকম্পনের সম্ভাবনা অনেক বেশী। একসময় ঐ এলাকার মাটি দেবে যাবে। ভূমিধ্বস হওয়ার মাত্রাটা শতকরা ৫০ ভাগের উপরে রয়েছে’।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.