কুলাউড়ায় দোকান ঘরে মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা! পার্শ্ববর্তী স্কুলের আপত্তি

January 23, 2021, এই সংবাদটি ৩২১ বার পঠিত

মাহফুজ শাকিল॥ কুলাউড়ায় সরকারী অনুমোদন না নিয়ে এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একটি দোকান ঘরে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় তড়িঘড়ি করে প্রতিষ্ঠা করে ছাত্র ভর্তি করায় আশপাশের উচ্চ বিদ্যালয়গুলো প্রতিবাদে মূখর হয়ে উঠেছে। এতে স্থানীয় উত্তর কুলাউড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সঙ্কটে পড়ায় অনিয়মতান্ত্রিকভাবে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টি বন্ধ করার দাবি জানিয়ে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড সিলেটের চেয়ারম্যান, জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। উত্তর কুলাউড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান এ লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে হাকালুকি হাওরের দক্ষিণপ্রান্তে উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নে উত্তর কুলাউড়া উচ্চ বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক। কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এসএসসি ভোকেশনাল শাখাও রয়েছে। বিধি বহির্ভূতভাবে বিদ্যালয়ের উত্তর পার্শ্বে স্থানীয় গৌরীশংকর গ্রামে ভৈরবগঞ্জ বাজারে আপ্তার ভিলায় একটি বিল্ডিংয়ে দোকান কোটা ভাড়া নিয়ে রসুলপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর এই প্রতিষ্টানের উদ্যোক্তা হলেন স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মালিক মিয়া, কুলাউড়া ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি বদরুজ্জামান সজল, কুলাউড়া শহরের দন্ত্য চিকিৎসক ডাঃ হেমন্ত চন্দ্র পাল, কাতার প্রবাসী আব্দুল মোহিত, প্রবাসী আপ্তার মিয়া ও খলিলুর রহমানসহ স্থানীয় এলাকার বেশ কয়েকজন ব্যক্তি। আর ওই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক প্রধান শিক্ষক মোঃ মাসুক আহমদকে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ মাসুক আহমদ তাঁর স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি সুধী সমাবেশের আয়োজন করেন। এতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও উপদেষ্ঠা কমিটি গঠন করা হয়। এবং ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা এবং পরবর্তীতে ৯ম ও ১০ম শ্রেণী চালু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরইপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম চালু হবে মর্মে প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে উত্তর কুলাউড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণীতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে। এতে ওই এলাকার শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকমহল বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের গৌরীশংকর গ্রামে ভৈরবগঞ্জ বাজারে আপ্তার ভিলায় রসুলপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় নামে একটি স্কুলের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ওই স্কুলের দেয়ালসহ বিভিন্ন স্থানে ৬ষ্ঠ- ৮ম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তুু বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও স্বীকৃতি প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা ঘেটে দেখা গেছে, প্রথমত প্রতিষ্টানের নামে ভূমি নামজারী থাকতে হবে। অবকাঠামো গঠন ও পাশ্ববর্তী প্রতিষ্টানের এনওসি থাকতে হবে। মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে অনুমতি/স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অন্য মাধ্যমিক/নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে ৩ (তিন) মাইল দূরত্ব থাকতে হবে। মফস্বল এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ১.৫০ একর ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে ১.০০ একর জায়গা প্রয়োজন। কিন্তুু এর কোনটাই ওই বিদ্যালয়ের নেই।
অভিযোগকারী উত্তর কুলাউড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন, নিয়ম না মেনে মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করায় তা বন্ধ করার দাবি জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকার গৌরিশংকর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৩ জন এবং মীরশংকর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬ জন শিক্ষার্থী ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার কথা। বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী ৭ম ও ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আটকানোর জোর চেষ্টা চলছে। দোকান ঘরে একটি ভূঁইফোড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করলে একদিকে যেমন বিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়বে ঠিক তেমনিভাবে নতুন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বিদ্যালয়ের উত্তর পশ্চিম পার্শ্বে বাড়ি ঘর না থাকায় নতুন বিদ্যালয় যেখানে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ওই এলাকা থেকে উত্তর কুলাউড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আসার একমাত্র উৎস। এমতাবস্থায় রসুলপুর নামীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের কার্যক্রমসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখার জন্য সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
রসুলপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি বদরুজ্জামান সজল ও ডাঃ হেমন্ত চন্দ্র পাল বলেন, নিয়মনীতি মেনেই মফস্বল এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য স্থানীয় এলাকার ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার সুবিধার্থে পাশ্ববর্তী দুটি স্কুলের মধ্যবর্তীস্থানে এই স্কুল প্রতিষ্টার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্কুল অনুমোদনের জন্য সংশি¬ষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে এবং অনলাইন ফিস জমা দেয়া হয়েছে। পাশ্ববর্তী উত্তর কুলাউড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে ১০ গজ কম দূরত্ব হলো আমাদের স্কুলের। একটি দোকানে কিভাবে একটি মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্টা করা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা স্কুল প্রতিষ্টার কাজ শুরু করেছি। পর্যায়ক্রমে বৃহৎ পরিসরে জায়গার ব্যবস্থা করা হবে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে রসুলপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ মাসুক আহমদ বলেন, তিনি স্কুল প্রতিষ্টার সাথে জড়িত নন। তাছাড়া স্কুল প্রতিষ্টায় তাঁর কোন স্বার্থ নেই। স্থানীয় এলাকার লোকজন উদ্বুদ্ধ হয়ে ওই স্কুল প্রতিষ্টা করেছেন। স্কুল প্রতিষ্টায় সরকারী কোন অনুমোদন আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনলাইনে আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম চালু করা হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আনোয়ার বলেন, ওই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ব্যাপারে সরকারি কোন অনুমোদন নেই। নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটি খতিয়ে দেখা হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, ওই স্কুলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •