ঘুরে আসুন নয়নাভিরাম বাইক্কা বিলে

August 3, 2016,

শরীফ আহমেদ॥ বাংলাদেশ তথা সিলেট বিভাগের অন্যতম মৎস্য অভয়ারণ্য। আমরা সবাই বাইক্কা বিলের সঙ্গে পরিচিত। তখন পরিযায়ী স্থায়ী পাখিদের কলকাকলিতে মুখর ও রঙ্গীন ফড়িংয়ের বিরতিহীন উড়াউড়ি,চায়ের সবুজের নিসর্গ হাজারও শাপলা পদ্মসহ নানান জলজ উদ্ভিদ দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকরা বাইক্কা বিলে ভ্রমন করে থাকেন। কিন্তু এখনই সুযোগ চলতি বর্ষা মৌসুমে ভ্রমন করে পরিচিত নয়নাভিরাম জলাভূমি বাইক্কা বিলের অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমির সঙ্গে।

pic-1
তথ্য নিয়ে জানা যায়, প্রখ্যাত চা-সমৃদ্ধ শহর শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওড়ের পূর্বদিকের প্রায় ১০০ হেক্টর আয়তনের একটি জলাভূমির নাম বাইক্কা বিলের সুনাম দারুণভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
আর এই বাইক্কা বিলটির অবস্থান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় হাইল হাওড়ের পূর্বদিকে। বিগত ১ জুলাই ২০০৩ তারিখে সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় এই বিলটিকে মৎস্য সম্পদের একটি অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয় আইড়, কই, মেনি, ফলি, পাবদাসহ আরো অনেক প্রজাতির মাছ এখানে বংশবৃদ্ধি করে পুরো হাওড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই বিল মাছের জন্যেই শুধু নয়, পাখি এবং অন্যান্য অনেক প্রাণীর জন্যও একটি চমৎকার নিরাপদ আবাসস্থল।

pic-2এটি একটি নয়নাভিরাম জলাভূমি যেখানে হাজারো শাপলা আর পদ্মফুল ফোটে। এছাড়াও এই বিলের বুনো বাসিন্দা আর শীতে আগত স্থায়ী পরিযায়ী পাখিদের ভালোভাবে দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। তবে এ বিলে একশ হেক্টর আয়তনের এই সংরক্ষিত জলাশয়টি মৎস্য সম্পদে ভরপুর। নানা জাত প্রজাতির মাছের সঙ্গে রয়েছে সাপ-ব্যাঙ আর জলজ উদ্ভিদের নিত্য বসবাস। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ বিল এখন আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে নজর কাড়ছে পর্যটকদেরও। নয়নাভিরাম এই জলাভূমিতে রয়েছে হাজারও শাপলা পদ্মসহ নানান জলজ উদ্ভিদ।
পর্যটকরা দেখতে পারবেন, বিলের কিনারে ফোটে হাজারো পানা, শাপলা আর পদ্মফুল। বিলের পানিতে সকাল-সন্ধ্যা চলে রঙ্গীন ফড়িংয়ের বিরতিহীন উড়াউড়ি বৃষ্টিহীন উষ্ণদিনে বিলের ফুলের পাশে আসে আরো একদল পতঙ্গপ্রজাতি। প্রকৃতি প্রেমীর চোখে পাখিই এই অভয়াশ্রমের সেরা প্রাণী। শীত মৌসুমে এখানে আসে বিভিন্ন প্রজাতীর পরিযায়ী পাখি। এই বিলের উল্লেখযোগ্য পাখি-পানকৌড়ি, কানিবক, ধলাবক, গোবক, ধুপনিবক, রাঙ্গাবক, দলপিপি, নেউপিপি, পান মুরগি, বেগুনি কালেম, কালোমাথা কাস্তেচরা, শঙ্খ চিল, পালাসী কুড়া ঈগল। শীতের অতিথি হয়ে এই বিলে আসে অনেক জাতের সৈকত পাখি। এদের মধ্যে- গেওয়ালা বাটান, মেটেমাথা চিটি আর কালাপঙ্খ ঠেঙ্গী, ধলা বালিহাঁস, পাতি সরালী, রাজসরালী, মরচেরং, ভূতিহাঁস, গিরিয়াহাঁস, ল্যাঙ্গাহাঁস, গুটি ঈগল। বাইক্কা বিল ছাড়াও দেখতে পারবেন, সৌন্দর্যে লীলাভূমি চায়ের সবুজের নিসর্গে ভরা ৪৪টি চা বাগান, জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বনাঞ্চল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠি খাসিয়া, ত্রিপুরা, সাঁওতালদের বৈচিত্র্যময় জীবনচিত্র, রামনগরের প্রসিদ্ধ মণিপুরী তাঁতশিল্প ও কাপড়, বৃটিশ চা ব্যবস্থাপকদের কবরস্থান ডিনস্টন সিমেট্রি, ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়া বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশন, ৫০০ বছরের পুরনো নির্মাই শিববাড়ি, লেবু, পান ও আনারস বাগানের প্রাকৃতিক রুপ প্রভৃতি। তবে বর্ষা মৌসুমে রাস্তার দুর্ভোগ একদমই মনে রাখার মতো! সোজাসাপ্টা, বাইক্কা বিলের টলমল পানির সৌন্দর্য দেখতে ভ্রমণগ্লানিকে হিসেবে রাখতে হবে। বিলের পানিঘেরা রূপকে প্রত্যক্ষ করতে হলে পায়ে হেটে কষ্ট করে আসতে হবে। এছাড়াও বৃষ্টিময় প্রাণপূর্ণতার সৌন্দর্য বাইক্কা বিলে এসেও ধরা পড়বে দারুণভাবে। টইটম্বুর বিলের পানিতে ঢেউ ওঠে ছলাৎ ছলাৎ। দেখতে পাবেন ঝিমিয়ে পড়া হিজল-করচ গাছের পাতাগুলো সতেজ হয়ে উঠে। ঢোলকলমি চোখ তুলে তাকায় আগত অতিথির দিকে। কাছে-দূরে ব্যাঙের লাফালাফি। বিলের জলে পানকৌড়ি, ছোট সরালি আর পাতিহাঁসের ডুব।

pic-3
যেভাবে যাবেনঃ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের সঙ্গে সারা দেশের রেল ও সড়কপথে রয়েছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। ঢাকা থেকে তিনটি, চট্টগ্রাম থেকে দু’টি আন্তঃনগর ট্রেন প্রতিদিন শ্রীমঙ্গল হয়ে সিলেটে চলাচল করে। এছাড়াও ঢাকা-সিলেট বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ বা শ্যামলী পরিবহনেও শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল ঘুরে দেখে যেতে পারেন পারেন দর্শণীয় স্থানটি। তবে বর্ষা মৌসুমে রাস্তার দুর্ভোগ একদমই মনে রাখার মতো! সোজাসাপ্টা, বাইক্কা বিলের টলমল পানির সৌন্দর্য দেখতে ভ্রমণগ্লানিকে হিসেবে রাখতে হবে। বিলের পানিঘেরা রূপকে প্রত্যক্ষ করতে হলে পায়ে হেটে কষ্ট করে আসতে হবে।
পর্যটকদের রাত যাপনঃ নজরকাড়া সৌন্দর্য পর্যটকদের কাছে টানবে অনায়াসেই থাকতে পারবেন শ্রীমঙ্গল টি রিসোর্টঃ ভাড়াঃ (১৫% ভ্যাট এবং ৭% সার্ভিস চার্জ যোগ করতে হবে) বাংলোঃ ৩৫০০- টাকা থেকে ৫৫০০- টাকা পর্যন্ত স্যুইটঃ ৩৫০০- টাকা আইপি রুমঃ ২৫০০- টাকা, ঠিকানাঃ বাংলাদেশ চা বোর্ড, ভানুগাছ সড়ক, শ্রীমঙ্গল,হোটেল টি টাউনঃ ভাড়াঃ (১৫% ভ্যাট এবং ৫% সার্ভিস চার্জ যোগ করতে হবে) ডিলাক্স নন এসিঃ এক হাজার টাকা থেকে ১২৫০-টাকা দুজনের থাকার জন্য কক্ষঃ ১৩৫০- টাকা, স্যুইটঃ ১৫৫০- টাকা থেকে ১৮৫০- টাকা ঠিকানাঃ ধাকা-সিলেট মহাসড়ক, শ্রীমঙ্গল, ও পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গলফ ক্লাবঃ আরমান খান (ভারপ্রাপ্ত প্রধান ব্যবস্থাপক) মোবাইল+৮৮০১৭৩০৭৯৩৫৫২-৫৯। এছাড়াও চায়ের রজধানী হিসেবে খ্যাত ঐ এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি হোটেল, রিসোর্ট,রেস্ট হাউস ও কটেজ রয়েছে। নির্জন পরিবেশে পাহাড়ি টিলার ওপর নির্মিত টি-রিসোর্ট।এবং বিভিন্ন পাহাড়ি টিলার ওপর নির্মিত কটেজগুলোতে রাত যাপন করে পর্যটকরা প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে অবলোকনের সুযোগ পাবেন। খাবারের জন্যে এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট।পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও একটু ভালো মানের খাবারের জন্য আপনাকে অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলোতে যেতে হবে। সেখানে বাঙালি খাবারের সঙ্গে চাইনিজ খাবারও পাবেন। এছাড়া দামি খাবারের জন্যও শহরে অনেক রেস্টুরেন্ট চোখে পড়বে।রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কি করবেনঃ ১।টেলিস্কোপ এবং বাইনোকুলারের মাধ্যমে বইক্কা বিলের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে এখানে আগত অতিথি পাখিদের পাশাপাশি এখানকার অন্যান্য প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এখানকার পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠতে খরচ হবে ৫- টাকা। ২। বইক্কা বিলে নৌকা ভ্রমণও করতে পারেন। এখানে আধ ঘণ্টা এবং এক ঘণ্টার জন্য নৌকা ভ্রমন করতে খরচ হবে যথাক্রমে ২০- টাকা এবং ৩০- টাকা।
ভ্রমণের সময়ঃ খুব সকালে সূর্যোদয়ের পরের দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের পরের দুই ঘণ্টা এখানে পাখিদের দেখার জন্য সবচেয়ে ভাল সময়। বিকালে পাখি দেখার পরিকল্পনা করলে আপনাকে খুব সকালেই দিন শুরু করতে হবে এবং এতে করে দুপুর ৩ টার মধ্যেই আপনি বিলে পৌঁছে যাবেন এবং পাখিদের দেখার জন্য ও ছবি তোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন। প্রাণী ও পাখিদের ছবি তোলার অভ্যাস থাকলে সাথে করে টেলিলেন্স আনতে ভুলবেন না। আপনি নৌকা ভাড়া করেও পাখিদের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারেন।
উল্লেখ্য,দেশের অন্যতম মৎস্য অভয়ারণ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে অবস্থিত সংরক্ষিত মৎস্য অভয়াশ্রম ‘বাইক্কা বিল’।ইউএসআইডি’র অর্থায়নে ‘অ্যাকুয়াকালচার ফর ইনকাম অ্যান্ড নিউট্রেশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে মৎস্য ও পাখির অভয়াশ্রম। এ বিল এখন আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে নজর কাড়ছে পর্যটকদেরও।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •