জাতীয় কবি কাজী নজরুল স্বপ্রতিভায় চির সমুজ্জ্বল

May 25, 2016, এই সংবাদটি ১,০২৮ বার পঠিত

এহসান বিন মুজাহির॥ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৭তম জন্মবার্ষিকী । কবি নজররুল ইসলাম ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে) ১৩০৬ বাংলা, ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার ‘চুড়ুলিয়া’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বড় দুঃখের বিষয় হলো যে, নজরুল একজন মানবতাদী কবি, যিনি সাধারণ মানুষের জন্য লিখেছেন, মানবতার গান গেয়েছেন, স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছেন। কবি নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে সত্য, কিন্তু আমরা আজ তাকে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। নজরুকে উচ্চাসনে বসিয়ে দিয়ে তাঁর থেকে মই কেড়ে নিয়েছি। নজরুল যে বিদ্রোহের গান গেয়েছিলেন সেই বিদ্রোহ আজ রহিত হয়ে গেছে! বাঙালি মুসলমান আজ নির্জীব-অসার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে নজরুলের অবস্থান দেখলে মনে হবে যে বাংলার সবচেয়ে অপ্রসিদ্ধ কবি! নজরুল নিভু নিভূ আলোয় কোনোমতে টিকে আছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যেখানে বাংলা বিভাগ রয়েছে, সেখানে নজরুল সাহিত্য থেকে স্বল্প পরিসরে কবি নজরুলকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে নজরুল চর্চার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের দেশে নজরুল অনুশীলন অত্যধিক মাত্রায় কম হচ্ছে। নজরুল ইনস্টিটিউট নজরুল চর্চায় যে অবদান রাখছে, তাও খুব সামান্য। বাংলা একাডেমিও উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান রাখছে না। জাতীয় পর্যায়ে নজরুল চর্চা আমাদের দেশে হচ্ছেই না বললে চলে। আমরা তাঁকে চেতনায় ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। কবি নজরুল ইসলামের মূল্যায়ন অন্য সব কবির চেয়ে ভিন্ন মাত্রায় বেশি হওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু হচ্ছে এর বিপরীত।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে যেভাবে বর্ণিল বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা ও নানা আয়োজন করা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের বেলায় এমনটি চোখে পড়েনি। তাইতো কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি খিলখিল কাজী দুঃখভরা কণ্ঠে বলেছেন, ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চর্চা শুধু জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতেই সীমাবদ্ধ। এই দুটি দিন ছাড়া কবিকে সেইভাবে চর্চা বা স্মরণ করা হয় না’। যা সত্যিই দুঃখজনক।
‘জাতীয় কবি’ হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছেন না, যেমনটি পেয়ে যাচ্ছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি, দেশপ্রেম, আন্দোলনসহ কোনো দিক থেকেই নজরুলের ভূমিকা ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি চিরকাল শোষিত-নির্যাতিত মানুষের পক্ষে কাজ করেছেন। বাংলা সাহিত্য ও সংগীত জগতে তিনি নিয়ে এসেছেন ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাস’। বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাহিত্যিক হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অনস্বীকার্য। জাতীয় কবিকে স্বল্প মূল্যায়ন অতি দুঃখজনক! তার প্রতি অবহেলার একমাত্র কারণ তিনি ইসলামী চেতনা ও আদর্শকে পুরোপুরিভাবে বিসর্জন দিতে পারেননি; ফলে নজরুল রয়ে গেলেন বাঙালি সমাজে অবহেলিত।
কবি নজরুলের কবিতা ও গান-গজল আমাদের সংস্কৃতির চিরসম্পদ। তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতাগুলো লাখ লাখ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং অনুপ্রাণিত করেছে বীরত্বপূর্ণ ও নিঃস্বার্থ কাজে আত্মনিয়োগ করতে। আমরা যদি নজররুলের জীবন ও সাহিত্য থেকে এই আদর্শটুকু গ্রহণ করতে পারি তাহলে তাঁর আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে এবং সমাজ অনেকখানি স্বচ্ছতার দিকে এগিয়ে যাবে। নজরুল সাহিত্যকে বর্তমান প্রজন্ম ও আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা আমাদের ওপর অপরিহার্য কর্তব্য।
বাংলা সাহিত্য জগতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। বাংলা সাহিত্যে যার আবির্ভাব ধূমকেতুর মতো, তিনি হলেন আমাদের জাতীয় কবি, নিপীড়িত মানুষের কবি, বিদ্রোহী কবি, তারুণ্যের কবি কাজী নজরুল। কাজী নজরুল ইসলামকে চেতনা ও জাগরণের কবিকে বলা হয়। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে শুধু উন্নত ও সমৃদ্ধই করেননি, বিশ্ব দরবারে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিতও করেছেন। মৌলিক কাব্য-প্রতিভার ছাপ রেখে গেছেন বলেই এখনও তিনি যুগ প্রবর্তক কবি হিসেবে স্বীকৃত। বিদ্রোহী কবি বলে সমাধিক খ্যাত কবি নজরুলের মরমী কবিতা, অসংখ্য গজল,গান, হামদ-নাত, আজও পাঠক-শ্রেুাতাকে সমভাবে আপ্লুতত করে রাখে। কাজী নজরুল যে বিশাল সাহিত্য ভা-ার রচনা করেছেন তার তুলনা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।
কবি নজরুল যে কত বড় কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন তা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি মূলত একজন কবি হলেও সাহিত্যের সব শাখাতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। নজরুল শুধু শিল্পী-সুরকার, গীতিকার, কবি, উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, সম্পাদক ও আপোসহীন সৈনিকই নন। তিনি ছিলেন সেকালের শক্তিধর এক কলমযোদ্ধা। তাঁর লিখনিতে ফুটে উঠেছে বিদ্রোহী মানুষের চাওয়া-পাওয়া। কবি তাঁর ক্ষুরধার লিখনির মাধ্যমে অন্যায়, জুলুম ও অত্যাচারে বিররুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। যা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছিল, ‘বজ্রের ন্যায় কঠিন, হীরার চেয়ে ধারালো’। এ কারণেই বাংলা সাহিত্যে কবি নজরুল স্বপ্রতিভায় চির সমুজ্জ্বল। গল্প, উপন্যাস, ছোটগল্প, গান-গজল সব শাখাতেই বিচরণ ছিল মহাপ্রতিভাবান কবি কাজী নজরুল ইসলামের। কেবল গানই সৃষ্টি করেছেন চার হাজারের কাছাকাছি। এতো গান পৃথিবীতে আর কোনো কবি-গীতিকার লিখেছেন বলে জানা নেই। গান ছাড়াও রয়েছে তার অজস্র ছড়া-কবিতা। লিখেছেন বেশ কিছু ছোট গল্প ও উপন্যাস। লেখালেখির পাশাপাশি সুর সৃষ্টি ও সংগীত পরিচালনাও করেছেন তিনি। এমন কি চলচ্চিত্র পরিচালক, সুরকার, গায়ক ও অভিনেতা হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ‘নবযুগ, অর্থ সাপ্তাহিক, ধূমকেতু, লাঙ্গল ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছেন।
তিনি ছিলেন তৎকালীন যামানার কাঁটাভরা দুর্গম পথের এক নির্ভীক সাংবাদিকও। তিনি বড়দের জন্য লিখেছেন অনেক অনেক প্রবন্ধ-গল্প ও কবিতা। তাই বলে নজরুল ছোটদের ভুলে যাননি। নজরুল ছোটদের জন্য রেখে গেছেন শিশুসাহিত্যের এক সুবিশাল ভা-ার। লিখেছেন অনেক ছড়া-কবিতা।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য জীবন মাত্র ২৩ বছর। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা মুক্তি (১৩২৬) বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় শ্রাবণ সংখ্যায়। ৩টি ছিল কবিতা। প্রথম প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ প্রকাশিত হয় ‘সওগাতে’ ১৩২৬ সনে, কার্তিক সংখ্যায়। ছাপার হরফে আত্মপ্রকাশ ১৯১৯ সালে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লেখা হয় ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের জানুয়ারিতে। প্রথম গদ্য প্রবন্ধ ‘যুগবাণী’ (১৯২২)। প্রথম কবিতা গ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২)। ২৩ বছরের শিল্প জীবনে নজরুল লিখেন ২২টি কবিতা গ্রন্থ, ৩টি কাব্যানুবাদ, ২টি কিশোর কাব্য, ৩টি উপন্যাস ৩টি গল্প গ্রন্থ ৩টি নাটক ২টি কিশোর নাটিকা ৫টি প্রবন্ধ গ্রন্থ, ১৪টি সংগীত গ্রন্থ। (আবদুল মান্নান সৈয়দ নজরুল ইসলাম কবি ও কবিতা নজরুল একাডেমি ঢাকা- প্রথম প্রকাশ ২৯ আগস্ট ১৯৭৭) নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি ছড়া-কবিতার প্রথম ক’টি লাইন উপস্থাপন করা হলো।

শিশুতোষ কবি:
‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুমবাগে উঠবো আমি ডাকি’।
‘ভোর হলো দোর খোল খুকমনি ওঠরে
ঐ ডাকে জুঁই শাখে ফুল খুকি ছোটরে’

বিদ্রোহী কবিতা:
‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হবো শন্ত’
‘চল্ চল্ চল্!/ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’
‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার’
প্রতিবাদী কবিতা:
‘কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙে ফেল কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান’
‘আমরা শক্তি আমরা বল/আমরা ছাত্রদল’
সাম্যবাদী:
‘গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান।
গাহি সাম্যের গান’
‘ইসলামে বলে, সকলের তরে মোরা সবাই
সুখ দুখ সম-ভাগ ক’রে নেব সকলে ভাই’
ইসলামী সঙ্গীত:
‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা
শির উচুঁ করি মুসলমান’
‘দাওয়াত এসেছে নয়া যামানার
ভাঙা কেল্লায় ওড়ে নিশান’
নাতে রাসূল সা.
‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ
এলোরে দুনিয়ায়
আয়রে সাগর আকাশ বাতাস
দেখবি যদি আয়’
‘তোরা দেখে যা মা আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারে সেথা চাঁদও দোলে’
হামদে তায়ালা:
‘শোন শোন ইয়া ইয়া ইয়ালাহী আমার মোনাজাত’
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’
কাব্যগ্রন্থ:
অগ্নিবীণা, দোলনচাঁপা, বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয় শিখা, সিন্ধু-হিন্দোল, সর্বহারা, জিঞ্জির ইত্যাদি।
গানের গ্রন্থ:
বুলবুল, চোখের চাতক, বনগীতি, গানের মালা, চন্দ্রবিন্দু।
শিশুতোষ:
ঝিঙেফুল, সাত ভাই, চম্পা, নতুন চা।
উপন্যাস:
বাঁধনহারা, কুহেলিকা, মৃত্যুক্ষুধা।
নাটক:
ঝিলমিলি, আলেয়া, মধুমালা।
প্রবন্ধগ্রন্থ:
যুগবাণী, রাজবন্দীর জবানবন্দী, দুর্দিনের যাত্রী ইত্যাদি।
শেষ কথা: ইসলামী জাগরণের কবি, বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, চেতনার কবি, জাতীয় কবি নজরুলকে স্বল্পমূল্যায়ন ঠিক নয়। নজরুলের জীবন ও সাহিত্য থেকে অফুরন্ত শিক্ষা গ্রহণ করে পরবর্তী জীবন সংগ্রামে কাজে লাগাতে হবে। আর এজন্য বেশি বেশি নজৎরুল সাহ্যিত্যচর্চা ও তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে সর্বস্তরে নজরুল চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে। নজরুল চর্চার মধ্যদিয়ে এ দেশের মুসলমানদের ঈমান-একতা, সম্মান-মর্যাদা, সাহস-হিম্মত, দায়িত্ব-কর্তব্য, দেশপ্রেম-ধর্মপ্রেম জাগ্রত করতে হবে। মুসলিম জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি ফিরে পেতে হলে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে হলে নজরুলকে জানতে হবে, তাঁর সাহিত্য ও আদর্শকে গ্রহণ করতে হবে। কবি নজরুল তার প্রতিভাগুণে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন এবং যুগ যুগ ধরে আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক: নির্বাহী সভাপতি,সৃজনঘর সাহিত্য ফোরাম, মৌলভীবাজার

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •