দল-অন্ধে সিদ্ব সাংবাদিকতা ও শফিক রেহমান

April 21, 2016, এই সংবাদটি ৫৯৬ বার পঠিত

মুনজের আহমদ চৌধুরী॥ ক্ষমতার দল-অন্ধ, প্রভুভক্ত ভৃত্যে বহুলাংশে পরিনতি পেয়েছে আমাদের মিডিয়া। মিডিয়া বলছি এ কারনে, কেননা গনমাধ্যম নামের গনমানুষের কথা বলবার মহান মাধ্যমটি নানা বাস্তবতায় নিজস্বতা হারিয়েছে। বিশ্বায়নের প্রভাবে মিডিয়ার বানিজ্যময়তা আজ নিরেট বাস্তবতা। ২১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডাসের প্রকাশিত বার্ষিক রির্পোটে পুথিবীজুড়েই গনমাধ্যমের স্বাধীনতায় ক্ষমতার বাধাঁর বিষয়টি উঠে এসেছে।
কিন্তু এখনকার আমাদের গনমাধ্যমের মতো ক্ষমতার অনুগত দলদাসত্বের নগ্নতা বা স্থাবকতা আসলে পাঠক বা দর্শকের চোখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেখিয়ে দেবার মতোন।
শফিক রেহমানের বিষয়টি নিয়ে লিখতে ইতিমধ্যেই কয়েকদফায় অনুরোধ করেছেন শ্রদ্বেয় বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়য়ের সাবেক কৃতি শিক্ষার্থী ফয়সল রহমান। লন্ডনে বসবাসরত শফিক রেহমানের একমাত্র পুত্র সুমিত রহমানের স্ত্রী মিসেস আরজু রহমান ও নাতনি প্রিয়াংকা রহমান কথা বলতে চান। ফয়সল ভাই তাঁেদর পারিবারিক বন্ধু। ফয়সল ভাইকে বলেছি, কথা বলার দরকার নেই,আমি লিখব। কিন্তু বিবেকের দুয়ারে দাড়ালে লেখার জায়গাটুকু সহানুভুতির অংশটুকু ছাড়া বড্ড সংকুচিত।
নির্বাচন নামক তামাশাটি শেষ অবধি সরকারের বিকৃতির বিকারেই পরিনত হয়েছে। সরকার অনির্বাচিত হলেও সময়ে-সময়ে তাদের ইস্যু নির্বাচনের সুনিপুন কর্ম-কৌশল অত্যান্ত সু-নির্বাচিত। আজকে গনজাগরন মঞ্চের ইমরান এইচ সরকারের আয়ের উৎস নিয়ে সরব সিক্সটি নাইন, ফোরর্টি নাইন নামের বে-লাইন অনলাইনগুলো। অথচ এই ইমরান সরকারকে মিডিয়াই রীতিমত তারকা নয়, পুন্য গ্রহ বানিয়েছিল। বাস্তবতা হলো যে উদ্দেশ্য বা খেলার দাবার চালে ক্ষমতার তখন গনজাগরনের দরকার ছিল,সেই ইস্যু এখন অতীত। যেমনি অতীত হয়ে গেছে আমার বোন সোহাগী জাহান তনু। ইস্যু দিয়ে ইস্যু কাটাকাটির খেলায় এখনকার বাজারের চলতি ইস্যু ডা: ইমরান আর শফিক রেহমান।
সজীব ওয়াজেদ জয়কে হত্যার ষড়যন্ত্রের দেশে এখনকার চলতি ইস্যুতে এখন পর্যন্ত তিনটি নথি আলোচনায় এসেছে। এখন পর্যন্ত আমেরিকার আদালতের ট্রান্সক্রিপ্ট কপিটি উন্মুক্ত হয়নি।
শফিক রেহমানের শেষবেলার দলকানা সাংবাদিকতা,দলান্ধতাকে আমি অপছন্দ করি। বছর দুয়েক আগে তিনি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কৌশলী বিরোধীতা করে লন্ডনে এলেন নিজের লেখা বইয়ের প্রকাশনা উৎসব করতে। তারঁ স্থাবকত্যের নন্দনতত্ব আমার অপছন্দের হলেও তাঁর পান্ডিত্যকে আমি শ্রদ্ধা করি। যেমনটি সত্য আবদুল গাফফার চৌধুরী বা অধ্যাপক আবুল মকসুদের ক্ষেত্রেও।
পাচঁ, পাচঁ ফুট তিন চার…গড় উচ্চতার দেশে সন্মানিত মানুষদের সুযোগে পেলে সন্মান নয়,অপমান করতেই সিদ্বহস্ত। গুনীজন,বড় মানুষদের আমরা আমাদের আপন ক্ষুদ্রতায় টেনে-হিচড়ে আমাদের ক্ষুদ্রত্বের কাতারে নামিয়ে আনতে ভালবাসি। যোগ্যতার বিচারে সন্মান-সন্মাননা, পুরস্কার-প্রনোদনার সংস্কৃতি দেশ থেকে বহুকাল আগেই বিগত। রাজ-আনুগত্যের সার্টিফিকেট বা সীলমোহর থাকা গুনান্বিত প্রধান কবিদেরও দেশে রাজকবি হতে পদক ভিক্ষে চাইতে হয়। এমন বাস্তবতার বিপরীতে দাড়িয়ে ন্যাপের মোজাফরর আহমেদের মতো পদককে ‘না‘ বলবার মতোন মহত্বের, সৎ দেশপ্রেমিকের বড়ো অভাব বাংলাদেশে। আমরা কেউ দোষ-ত্র”টির উর্দ্ধে নই। অবশ্যই শফিক রেহমানও নন। আমাদের বামনত্বের এই সময়ে শফিক রেহমানের মতো বর্নময় ক্যারিয়ারের মানুষকেও জীবনের শেষার্ধে দল-অন্ধ হতে হয় ! আবার আমাদের সাংবাদিকতায় তারঁ প্রথমার্ধের ৪০ বছরের পেশাগত জীবনের বিচারে আমাদের মিডিয়ায় আর একজন শফিক রেহমানের কী জন্ম হবে আগামী ৫০ বছরে ? তিনি সম্পাদক হয়ে তো সাংবাদিকতায় আসেননি। বিলেতে কেবল বিবিসি নয়, স্প্রেকটাম রেডিও মত শফিক রেহমানের সাংবাদিকতার বহু সৃষ্টি আজো সুনামে টিকে আছে।
এখন পর্যন্ত যে অভিযোগে তাকে কারাগারে নেয়া হয়েছে সে অভিযোগ প্রমানিত বা তিনি দন্ডিত নন। তিনি সন্দেহভাজন। ৮১ বছরের এই বয়োবৃদ্ধ ব্যাক্তি ন্যায় বিচার যাতে পান সে প্রত্যাশা একজন মানুষ হিসেবে আমাদের করাই উচিত। কিন্তু অন্যায় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় থাকা সরকারের কাছে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করাও বোধকরি অন্যায়!
বাংলাদেশে এখন সাংবাদিকতা আর দলীয় কর্মীর মধ্যকার যে চিরায়ত নৈতিকতার আবরনের শেষ বস্ত্রটুকু ছিল, সেটিও নির্লজ্জভাবে বিবস্ত্র করা হয়েছে। আওয়ামী সাংবাদিক লীগ অথবা জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক দল নয়তো জামায়াতী জার্নালিষ্ট পার্টি; এমনভাবে শুধু দলগুলোর সাংবাদিকদের অঙ্গ সংগঠনের আনুষ্টানিক ঘোষনাটুকু বাকি। জাতির দলকানা পন্ডিতদের লেখনীর নগ্ন দলদাসত্বে, সুবিধাদাসত্বে কলম আর কলামের নগ্নতায় খোদ যারা সরাসরি
দলীয় রাজনীতি করেন,তারাও বোধকরি মাঝে-মধ্যে লজ্জিত হন। কিছু ব্যাতিক্রম বাদে আমাদের পথ দেখাবার কথা যাদেঁর- সেইসব বরেন্য সাংবাদিক,লেখক বুদ্ধিজীবিরা এখন ব্যাস্ত আপন আপন সুবিধাদাতার পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্য সন্ত্রাসে। কী পত্রিকায়,নয়তো টকশো পর্দায়। তারা যতখানি সাংবাদিক তার চেয়েও বড় দলবাজ।
বড়ো বেদনাহত হৃদয়ে দেখি শফিক রেহমান, শওকত মাহমুদ নামগুলো শুনলেই পাঠক যেমন বুঝতে পারেন তারা কোন শিবিরের , তেমনি আবদুল গাফফার চৌধুরী, ইকবাল সোবহান চৌধুরী মানেই আরেকটা শিবির। হায়, সাংবাদিকতা নামের জনতার কথা বলবার সৎ সাহসী কলমের গায়েঁও দলীয় ষ্ট্রাইকারের হলদে জার্সি।
স্বার্থের হাটে-সুবিধার দামে আমরা সাংবাদিক বা গনমাধ্যম কর্মীরাই বিবেক বন্ধক দিয়ে রেখেছি নেতা-নেত্রীদের পবিত্র পদতলে! সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে এমত নিলর্জ্জতায় বলাৎকার আর ধর্ষনের দায় আমাদের সুবিধালিপ্সু সাংবাদিকদের যতটা- ততটাই আমাদের রাজনীতিবিদদেরও। রাষ্ট্রের আর সকল পেশাজীবিদের মতো, প্রতিষ্টান বা স্তম্ভগুলোর মতো- গনমাধ্যমে তারা নগ্ন বিভাজন সৃষ্টি করতে পেরেছেন আমাদের রাজনীতিজীবিরা। ৯০ পরবর্তী ক্ষমতার পা-চাঁটা মিডিয়ার রেডিশ আর আন-ইথিক্যাল জার্নালিজমের শেষ শিকার শেষবধি কে? এই বিকৃতির প্রকৃত স্রষ্টারাই যে শিকারের ফাদেঁ পা মাড়াবেন না: সে নিশ্চয়তা কতখানি থাকে আর শেষ-অবধি থাকবার !
মুনজের আহমদ চৌধুরী-লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক,লেখক।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •