মধ্য যুগীয় মুসলিম পরিব্রাজক ভারত বন্ধু ইবনে বতুতাঃ পর্য্যটক-পর্য্যটন শিল্প প্রসঙ্গঁ কথা

February 18, 2021, এই সংবাদটি ১৬০ বার পঠিত

মুজিবুর রহমান মুজিব॥ ইসলামী আইনের বিধান মোতাবেক মানবাত্বার ক্রমবিকাশের ধারাকে রুহের জগত আলমে আরওয়া থেকে হাসরের ময়দান পর্য্যন্ত যে কয় ভাবে ভাগ করা হয়েছে তন্মধ্যে পৃথিবীর সময়টুকুই ক্ষনস্থায়ী ও অনির্ধিারিত। ইসলামী চিন্তাবিদ কবি ও দার্শনিক শেখ সাদি (র:) যথার্থই বলেন- “দুনিয়া,
এহিত হ্যায় এক মুসাফির খানা,
যানে হগাজরুর,
কোয়ি আগে-কোয়ি পিছে।”
মায়াময় এই মাটির পৃথিবীতে দু’দিনের মুসাফির হিসাবে প্রস্থানের জন্যই মানুষের আগমন। এই ক্ষনস্থায়ী অনির্ধারিত পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ শুধুমাত্র নিজের নয়, দেশ ও জাতির জন্য মানব কল্যানে এমন কিছু করে যান, যা মানব জাতি চীরকাল স্মরন করেন শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায়। কালে কালে কৃতিপূরুষদের কাজের এই পরিধি স্বদেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশ দেশান্তরে। সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব এই মানুষ তার প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য মেধা ও , মননের গুণে আশরাফুল মকলুকাত-হিসাবে খ্যাত ও স্বীকৃত। আদি কাল থেকেই দুনিয়া দেখা প্রকৃতির পাঠশালা থেকে শেখা মানুষের সহ-জাত স্বাভাবিক অভিলাশ। কবি কবিতায়-থাকব নাক বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে- বলে দুনিয়া দেখার আকাংখা প্রকাশ করেছেন। ভ্রমন বিমুখ বাঙ্গাঁলি জাতির প্রতি কিঞ্চিত ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সখেদে বলেছেন “ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুঈন-চরন তলে বিশাল মরু দিগন্তে বিলীন।” প্রসঙ্গঁত উল্লেখ্য আরবীয়রা জন্ম কর্ম ও দর্শন গত ভাবে বেদুইন-যাযাবর ভ্রমন বিলাসী না হলেও ভ্রমন পিয়াসী। স্বচ্ছল-বিত্তবান আরব বেদুইনগন বসবাসের জন্য বিলাস বহুল আরামদায়ক দৃষ্টি নন্দন বাসগৃহের চাইতে বসবাসের জন্য তাবু ব্যবহার করতেন-করেন। “টেন্ট কাল চার” আরব সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই অত্যাধুনিক যুগেও।
অভিবক্ত ভারত বর্ষ প্রাচীন কাল থেকেই সম্মৃদ্ধ ও সভ্য জনপদ। ভারত বর্ষের অফুরান ধন সম্পদ, অপরূপ প্রাকৃতিক নিসর্গ, দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ, সাগরের সুনীল জল রাশি, ভারতীয় সহজ সরল জনগনের নির্মল ভালোবাসায় আকৃষ্ট হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যুগে যুগে পর্য্যটক পরিব্রাজক, বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বনিক গণ এদেশে এসেছেন, আল্লাহ ও রাসুলের প্রেমে ফানা ফিল্লাহ হয়ে এদেশে এসেছেন পীর আওলিয়া ফকির দরবেশগণ। বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর এই প্রেক্ষিতে যথার্থই বলেছেন-
“হেথা আর্য্য হেথা অনার্য্য
হেথা দ্রাবিড় চীন,
শক হুনদল পাঠান মুঘল
এক দেহে হল লীন”।
এই প্রেক্ষিতেই বিশ্ববিখ্যাত বৃটিশ ইতিহাসবিদ ভিনসেন্ট স্মিথ প্রাচীন ভারত বর্ষকে “পৃথিবীর নৃতাত্বিক যাদু শালা” বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিশ্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে বিশ্ব পরিব্রাজক-পর্য্যটকদের গুরুত্ব ও অবদান কম নয়, অনেক। প্রাচীন কালে যাযাবর জাতি আর্য্য এশিয়া মাইনর হয়ে ভারত বর্ষে আগমন করেন। প্রাচীন ভারতে আর্য্য আগমনের পূর্বে দ্রাবিড় জাতির বসবাস এবং দ্রাবিড় সভ্যতা চালু ছিল। অশ্বচালনায় অভিজ্ঞ আর্য্যরা যুদ্ধ জয় করে বিশাল ভারত বর্ষে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করে।ভারতীয় সভ্যতায় আর্য্য জাতির অবদান ইতিহাসের অংশ।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতে আগত পর্য্যটকদের মধ্যে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং, ফাহিয়েন, ভার্থেমা, অ্যাহ্ননি শার্লে মুসলিম পর্য্যটক ইবনে বতুতার নাম সবিশেষ উল্লেখ যোগ্য। সাকুল্যে পর্য্যটকদের মধ্যে একমাত্র সুন্নী মুসলিম, পর্য্যটন অন্ত প্রাণ ভারত বন্ধু ইবনে বতুতাকে ইতিহাস যথাযথ মূল্যায়ন করে নি। অথছ প্রাচীন পর্য্যটকদের ডায়রি, গ্রহ্ণ, তথ্য, মুদ্রা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং সকল পর্য্যটকদের মধ্যে এক মাত্র ইবনে বতুতা জীবনের অর্ধেক সময়-ঘরে ঘরে মোর ঘর আছে, আমি সেই ঘর নেব খুজিয়া শ্লোগানে বলিয়ান হয়ে উন্নত পৃথিবীর প্রায় পুর্নাংশ ভ্রমন করেছেন, যখন যে দেশে গিয়েছেন সেই দেশের সরকার, সমাজ, রাজনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে একাকার হয়ে গেছেন, আত্বস্থ করেছেন, একজন পন্ডিত ও দার্শনিকের মত নোট আকারে লিখে গেছেন সেই সব মহামানবদের কথাও কাহিনী যা আধুনিক সভ্যতার এক মহামূল্যবান দলিল। সেই মধ্যযুগে সমাজ, সভ্যতা আন্তর্জাতিক আইন আদালত-জাতি সংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন-ইইউ, দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার আধুনিক-সার্ক ছিল না। বর্তমান বিশ্বমোড়ল আমেরিকা ছিল অনাবিস্কৃত। এই সে দিন-মাত্র কয়েকশ’ বছর আগে নাবিক পর্য্যটক ক্রিষ্টোপার কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করেছিলেন। তখন হাওয়াই জাহাজ আবিস্কিৃত হয় নি-আকাশ- পথ ছিল না। রাস্তা-ঘাট ও যানবাহন ছিল না। স্থলপথে দস্যু, পাহাড়িয়া এলাকায় হিংস্র বাঘ, ভল্লুক, বিষধর সরিসৃপের ভয় ছিল। নৌপথে ইঞ্জিন আবিস্কারের পূর্বে পাল তোলা নৌকাই ছিল ভরসা। তখন সাগর-নদীপথে জলদ স্যোদের উপদ্রব ছিল। নাবিক ভাস্কো-ডা-গামা নিজেই জলদস্যো ছিলেন। গামার বিরুদ্ধে জলদস্যো-তার ব্যাপক অভিযোগ ছিল।
মধ্যযুগের বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতার সঙ্গেঁ আধুনিক যুগের অত্যাধুনিক পাঠক-পাঠিকার সঙ্গেঁ কিঞ্চিত পরিচিতি প্রয়োজন। ইবনে বতুতার ভ্রমন বৃত্তান্ত সম্পাদনাকারী মোহাম্মদ ইবনে জুযাই-র মতে পর্য্যটক ইবনে বতুতার জন্ম তাজ্ঞিয়া। তার মূল নাম আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ। পূর্ব গোলার্ধে শাসস-উদ-দীন নামে পরিচিত, বতুতা শিক্ষিত-সম্ভান্ত পরিবারের সন্তান। তাঁর পারিবারিক উপাধি ইবনে বতুতা। মরক্কোয় এখন পর্য্যন্ত এই নামের অস্থিত্ব বিদ্যমান। বতুতার পরিবার মিসরিয় সীমান্তবর্তী বার্বার উপজাতির। ইতিহাসে তারা সাইরেনাইকার যাযাবর উপজাতি হিসাবে পরিচিত। ধর্ম প্রাণ, শিক্ষিত ও সম্ভান্ত বংশীয় ইবনে বতুতার এক চাচাত ভ্রাতা স্পেনের রোনদা শহরের কাজি ছিলেন। ইবনে বতুতা আরবি ও ফার্সি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। আরবি, আরবীয়দের মাতৃভাষা। দুনিয়া জোড়া আরব বনিকদের ব্যবসা বানিজ্য যাতায়াত ছিল, সর্ব্বোপরি ষষ্ট শতাব্দিতে আরবে-আখেরী নবী হিসাবে মরু ভাস্কর মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) এর ধরাধামে তশরীফ আনয়ন, ইসলাম প্রচার, নবুওত প্রাপ্তি ধর্ম গ্রহ্ণ আল কোরআন নাযিল, বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় রাজ ভাষা আরবীর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়, স্বর্ব্বোপরি পবিত্র আল কোরআনের ভাষা আরবী হওয়াতে কোরআন তেলাওয়াত ও আরবী শিক্ষা ও চর্চার গুরুত্ব অত্যধিক বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রাচীন কালে দুনিয়া জোড়া পারস্য সভ্যতা-পার্সিয়ান সিভিলাইজেশন এবং প্রাচীন পারস্যের রাজভাষা ফার্সির প্রভাব ছিল। দশম শতাব্দীতে পারসিয়ান কবি ফেরদৌসি ফার্সি ভাষায় ক্লাসিক গ্রহ্ণ মহাকাব্য-শাহনামা-রচনা করে খ্যাতি অর্জন করে, অমর হয়ে আছেন। এই অঞ্চলের প্রভাবশালী দুটি ভাষা আরবি ও ফার্সিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করে ছিলেন ইবনে বতুতা। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আত্বজীবনী মূলক জীবনী সাহিত্য সমূহ ক্ষেত্র বিশেষে কতেক ব্যতিক্রম বাদে আত্ব প্রচার দূষে দূষ্ট বলে অনেক সমালোচক ও সমাজ চিন্তক মনে করেন, কিন্তু সে কালে সেই প্রায়ন্ধকার যুগেও পরিব্রাজক ও সুবিবেচক ইবনে বতুতা তার দুনিয়া দেখার ভ্রমন বৃত্তান্তে শাসকদের জন্ম কর্ম বংশ পরিচয় দেশ সমূহের সমাজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিষদ বর্ণনা দিয়েছেন কিন্তু নিজেকে কৌশলে আড়াল করে রেখেছেন-হামছে বড়া কৌন হ্যায় ভাব প্রদর্শন করেন নি। ১৩৩৪ সালে ৮ইং জুন পর্য্যটক ইবনে বতুতা সদল বলে ভারতের দিল্লীতে প্রবেশ করেন। দিল্লীতে তখন সুলতানী শাসনামল। তুঘলক বংশীয় বিখ্যাত শাসক মোহাম্মদ বিন তুঘলক তখন দিল্লীর স্বাধীন সুলতান। বিসমিল্লাহ্ মৌলানা বদর উদ্দীন বলে দিল্লীর একজন ওমরাহ্ বতুতাকে স্বাগত জানান। ভারতে ইবনে বতুতাকে মৌলানা বদর উদ্দিন নামে ডাকা হত। দিল্লীর সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ইবনে বতুতাকে সসম্মানে স্বাগত জানিয়ে ফার্সিতে বলেন-আপনাদের এদেশে আসা আমার জন্য আর্শিবাদ হয়ে থাকবে। আমি আপনাদেরকে এত বেশি অনু গ্রহ করব যা শুনে আপনার দেশ থেকে আরো অনেক ছুটে আসবে আপনার দলে যোগ দিতে। দিল্লীর স্বাধীন সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলক ইবনের বতুতার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে রাজকীয় মর্য্যাদায় আহার বাসস্থানের ব্যবস্থা সহ বাৎসরিক বারো হাজার দিনার ভাতার ব্যবস্থা করেন, রাজস্ব প্রাপ্তির জন্য দুটি ফসলি গ্রামের জায়গীর প্রদান করেন। অল্প কিছুদিন পর দিল্লীর বিদ্যোত সাহী সুলতান মোহাম্মদ বতুতার পান্ডিতে বিমুগ্ধ হয়ে তার উজির মারফত উজির, সচিব, সেনাপতি, প্রফেসার, বিচারক কিংবা শেখ এর দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানালে ইবনে বতুতা সম্মান জনক রাজ পদ পদবী গ্রহনে অসম্মতি জানিয়ে নিজে কাজি পরিবারের সন্তান হিসাবে শুধুমাত্র কাজির পদ গ্রহনে সম্মতি জ্ঞাপন করলে দিল্লীর শক্তিশালী সুলতান বতুতাকে ডেকে পাঠান এবং দিল্লীর মালেকি সম্প্রদায়ের কাজি হিসাবে নিয়োগ দান করেন। আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব বিখ্যাত পর্য্যটক- ভারত বন্ধু ইবনে বতুতা দীঘদিন সততা ও সুনামের সাথে কাজির দায়িত্ব পালন করেন। সুলতানী ও তৎপরবর্তী কালে অখন্ড ভারত বর্ষে মুঘল শাসনামলে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজি সাহেবান গণ আধুনিক কালের বিজ্ঞ বিচার পতিদের মত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পর্য্যটক ও কাজি ইবনে বতুতার ধর্মানু রাগ, ন্যায় বিচার, প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য শিষ্টাচার ও সৌজন্য বোধের কারনে ভারত বন্ধু, মাওলানা, বদর উদ্দিন হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। এক বিংশ শতাব্দীতে এসেও এই মধ্য যুগীয় বিদেশী পর্য্যটক সমগ্র ভারতবর্ষ ব্যাপী সম্মানিত ব্যক্তি। বিশ্ব পর্য্যটকদের কাতারে শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিত্ব। ভারত ভ্রমন ও চাকরি শেষে ইসলাম ধর্মের অনুসারি ইবনে বতুতা ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সিলেট সফর করতঃ পীরানে পীর-ইয়েমেনী বীর হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনীর সঙ্গেঁ সাক্ষাত করতঃ তাঁর দোয়া নেন। প্রসঙ্গঁত উল্লেখ্য ১৩০৩ খৃষ্টাব্দে হযরত শাহ জালাল তাঁর আওলিয়া বাহিনী নিয়ে গৌড় এর সামন্ত শাসক রাজা গবিন্দকে পরাজিত করে ইসলামের বিজয় নিশান উড়িয়ে ছিলেন। পর্য্যটক ইবনে বতুতাই একমাত্র পর্য্যটক যিনি তাঁর সময়ের মুসলিম শাসিত সকল দেশ ভ্রমন করে ট্রেভেলার অফ ইসলাম হয়ে উঠেন। এক হিসাবে দেখা যায় ইবনে বতুতা বাস্পীয় ইঞ্জিন যুগের পূর্বে পঁচাত্তোর হাজার মাইল পরিভ্রমন করে বিশ্ব ভ্রমনে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। বিশ্ব পর্য্যটক ও বিশ্ব নাগরিক ইবনে বতুতা অর্থ লিপ্সু বনিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন নির্লোভ ধর্মপ্রান ইমানদার মুসলমান নিঃস্বার্থ বিশ্ব পর্য্যটক আল্লাহ রাসুল প্রেমে ফানাফিন্নাহ এক বীর মোজাহিদ ঈমানী মোসাফির। বানিজ্য ও অর্থ বিত্তের জন্য তিনি বিশ্ব ভ্রমন করেন নি, বরং ইবনে বতুতা ধর্মীয় জ্ঞানার্জন এবং দীনি খেদমত-জ্ঞানার্জনের জন্য বিশাল কাফেলা-অনুসারি সহ মোসাফির এর বেশে ভ্রমন করেছেন। পবিত্র হজ্জব্রত পালন খানে কাবা তাওয়াফ এবং মহানবীর মাজার জিয়ারত শেষে জ্ঞান তাপস ইবনে বতুতা তিন বৎসর মক্কা মিদনায় অবস্থান করে ইসলাম ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করেছেন। ইবনে বতুতা দিল্লীর তুঘলক বংশীয় সুলতানদের শাসনামল-মোহাম্মদ বিন তুঘলক এর আমলে সাত বৎসর কাজির দায়িত্ব পালন করতঃ একদশক দিল্লী অবস্থান শেসে ভারত বন্ধু বতুতা ১৩৪২ সালে দিল্লীর সুলতান বিন তুঘলকের ইচ্ছায় ভারতের রাষ্ট্র দূত হয়ে চীনে গমন করেন। চীনে তখন বিশ্বের শক্তি শালী শাসক মঙ্গঁল সম্রাট কান ক্ষমতায়। আধুনিক কালের পিকিং তখন খান বালিক নামে খ্যাত ও পরিচিত।
সফল বিশ্ব ভ্রমন শেষে সর্বকালের সেরা বিশ্ব পর্য্যটক ইবনে বতুতা মরক্কোতে ফিরে গেলে রাজর্ষিক সম্ভর্ধনা প্রদান করতঃ স্বাগত জানিয়ে তাকে মরক্কোয় কাজি কিংবা বিচারক নিযুক্ত করা হয়। সততা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন কালে ইবনে বতুতা ১৩৬৮ কিংবা ৬৯ সালে মহান মৃত্যোকে আলিঙ্গঁন করেন। সেখানেই তাঁকে স্বসম্মানে সমাহিত করা হয়। ১৩০৪ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারী থেকে ১৩৬৮ সালের ৬৮ কিংবা ৬৯ সাল খুব বেশি সময় নয়। ষাট বৎসরাধিক কালের মানব জীবনের মধ্যে শৈশর-বাল্য-কৈশোর বাদ দিলে মাত্র চারদশক তার কর্মময় মানবজীবন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেও তিনি বিশ্বের সর্ব কালের সেরা পর্য্যটক এর মর্য্যাদা পেয়েছেন-তার মূল্যবান ভ্রমন কাহিনী-মধ্য যুগীয় মানব সভ্যতার এক মহান দলিল-যার জন্য তিনি চীর কাল অমর হয়ে থাকবেন।
বিশ্ব ভ্রমন শেষে ইবনে বতুতা মরক্কোর রাজধানী-ফেজে-পৌছে সুলতান আবু ইনান এবং তাঁর সভা সদদের নিকট নিজের ভ্রমন কাহিনী তুলে ধরেন। আরবিতে লেখা নোট ও তথ্যাদি উপস্থাপন করেন। সুলতান তাঁর একান্ত সচিব ইবনে জুয়াঈকে বতুতার ভ্রমন কাহিনী লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দিলে শুরু হয় “বলা ও লেখার পর্ব” কিন্তু পরবর্তী কালে বাস্তব অবস্থা দৃষ্টে দেখা গেছে ইবনে বতুতার কথাও বর্ণনা যথাযথ ভাবে লিপিবদ্ধ হয় নি। বতুতা আরবি ও ফার্সি ছাড়া কোন ভাষা ভালো ভাবে জানতে ও লিখতে পারতেন না। হয়ত পরবর্তী কালে ভাষান্তর ও বর্ণনা বয়ানে ধুম্রজাল, বিভ্রান্তি ও অসচ্ছতার প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। ঐতিহ্য-প্রকাশিত ট্রাভেলস অব ইবনে বতুতা-আরবি থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ করেন এইচ.এ.আর. গিব। গ্রহ্ণ খানার বঙ্গাঁনুবাদ করেন ইফতেখার আমিন। অনুবাদক আমিন গ্রহ্ণে উল্লেখ করেছেন বতুতা আসামের দরবেশ শেখ জালাল উদ্দিনের সঙ্গেঁও সাক্ষাত করেন। যাহা মোটেই সত্য নয়। কারন পীরানে পীর- ইয়েমেনী বীর হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনী তার সফর সঙ্গীঁ তিনশত ষাট আউলিয়া সহ আউলিয়া বাহিনী নিয়ে ১৩০৩ সালে গৌড় গোবিন্দ-কে পরাজিত করে এতদাঞ্চলে ইসলামের বিজয় নিশান উড়ান। শিলা লিপি-বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত-শত শত পুস্তক মতে শাহ জালালের গৌড় বিজয়-গৌড় রাজ গোবিন্দের পলায়ন এর সময় কাল নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনের অধিবাসি হিসাবে তাঁকে পীর ইয়েমেনী বলা হয়। ইতিহাসে শেখ জালাল উদ্দিন তাবরিজি নামে আরেকজন পীরের কথা উল্লেখ আছে। দুই জন এক ব্যক্তি নহেন। জালাল উদ্দিন ছিলেন তাবরিজি আর শাহ জালাল ছিলেন ইয়েমেনী। ইবনে বতুতা হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনীর সঙ্গেঁ সাক্ষাত করেছিলেন তাবরিজির সঙ্গেঁ নয়। ইবনে বতুতা দিল্লী এসেছিলেন তুঘলক বংশীয় সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলক এর শাসনামলে। তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা গাজি মালিক ১৩২১ সালে খসরু খানকে পরাজিত করে গিয়াস উদ্দিন তুঘলক উপাধি ধারন করে দিল্লীর সিংহাসন আরোহন করেছিলেন। মুহাম্মদ বিন তুঘলক ১৩২৫ থেকে ৫১ সাল পর্য্যন্ত দিল্লী শাসন করেন। ক্ষেপাটে ও চঞ্চল মতি হওয়ার কারনে বিন তুঘলক ভারতের ইতিহাসে পাগল তুঘলক হিসাবেও খ্যাত। ১৮২৯ সালে ইবনে বতুতার ভ্রমন বৃত্তান্ত সংক্রান্ত গ্রহ্ণ প্রথম বাজারে আসে। লেখক ছিলেন ড. স্যামুয়েল লী। কয়েক বছর পর আলজিরিয়ায় সম্পূর্ণ দলিলটি পাওয়া যায়। একই শতাব্দীর মধ্য ভাগে এই গ্রহ্ণের ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে ইবনে জুয়াঈর স্বাক্ষর ছিল। এই গ্রহ্ণে ইবনে বতুতাকে লেখক নয়-পর্য্যটক হিসাবে দেখানো হয়েছে। ইবনে বতুতার ভ্রমন ভ্রমন বৃত্তান্তে ইবনে জুয়াই যোগ করেছেন “এখানে সফর-বর্ণনা শেষ হল। আমি তা শেখ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতার বয়ান থেকে কিছুটা সংক্ষেপিত করে লিপিবদ্ধ করেছি। তিনি যুগের পরিব্রাজক ছিলেন, সে কথা কোন বোধ সম্পন্ন মানুষ সহজেই বুঝবেন। তাঁর পর ও যদি কেউ বলেন যুগের নয়, বরং মুসলমান সম্প্রদায়ের পরিব্রাজক ছিলেন, তা হলে তিনি একটু ও না বাড়িয়ে বলার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। এই রং এর দুনিয়া দু’দিনের মুসাফির খানা এবং আস্তিক-নাস্তিক সকল জনগোষ্টী দু’দিনের মুসাফির পর্য্যটক হলেও পর্য্যটন-এর উপর তেমন বই পুস্তক নেই। বৎসরাধিক কাল যাবত ভয়াবহ বৈশ্বিক ব্যাধি করনা মানব সভ্যতা সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ভীতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। লকডাউনে পর্য্যটন ও অর্থনীতি স্থবির। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প একুশের বই মেলা কেন্দ্রীক। বাঙ্গাঁলির প্রাণে রমেলা অমর একুশের বই মেলায় হাজার চারেক বই বেরুলেও ভ্রমন সাহিত্য একশত খানা ও থাকে না। উনিশ সালের অমর একুশের বই মেলায় মোট বই বেরিয়ে ছিল মাত্র চার হাজার আটশত চৌত্রিশ খানি। তন্মধ্যে ভ্রমন বিষয়ক বই ছিল মাত্র পঁচাশি খানা কম্পিউটার ও অভিধান বিষয়ক পুস্তক ছিল যথাক্রমে মাত্র পাঁচ ও ছয় খানি, যা খুবই দূঃখ জনক বটে। এই সমস্যা ও সংকটের মাঝে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের অপরূপ লীলাভূমি পীর শাহ জালালের স্মৃতি ধন্য পূন্যভূমি সিলেট পর্য্যটকদের তীর্থ স্থান। মহান আল্লাহ অকৃপন ভাবে সাজিয়ে রেখেছেন প্রকৃতিকে। সিলেটের নয়নাভিয়াম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি মনমুগ্ধ কর। বিশ্ব পর্য্যটক-বিশ্ববিখ্যাত ইবনে বতুতার অনুসারি পর্য্যটন অন্তপ্রাণ পর্য্যটক দের সংখ্যা ও কম নয় এই জনপদে। একুশে পদক প্রাপ্ত বিশ্ব পর্য্যটক-লেখক, মঈনুস সুলতান সিলেটেরই সু-সন্তান। মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের একটি নাম ডাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ছেড়ে ডক্টর মঈনুস সুলতান বিশ্ব নাগররিক এর মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিশ্বব্যাপী। তার ভ্রমন বিষয়ক একাধিক মূল্যবান গ্রহ্ণ রয়েছে। তাঁর কর্ম ও জীবন দর্শন সংক্রান্ত রচনা-ভ্রমনের শাহেন শাহ্-মঈনুস সুলতান-আমাদেরই সন্তান-লিখে প্রশংসিত হয়েছি। লেখাটি পাঠক প্রিয়তা পেয়েছিল। সিলেটের বিশিষ্ট বৃক্ষ ও প্রকৃতি প্রেমিক বৃক্ষরোপনে জাতীয় পুরস্কার স্বর্ণপদক প্রাপ্ত সাংবাদিক কলামিষ্ট আফতাব চৌধুরী একজন পর্য্যটক ও বটেন। পৃথিবীর পঁচিশটির ও অধিক দেশ ভ্রমন কারি, বহু গ্রহ্ণ প্রণেতা আফতাব চৌধুরীর ভ্রমন বিষয়ক গ্রহ্ণের নাম দেশ-দেশান্তর। মৌলভীবাজার পৌরসভার নবনির্বাচিত কাউন্সিলার এডভোকেট-এপিপি পার্থ সারথী পাল প্রিয় বরেষুর ভ্রমন-পর্য্যটন বিষয়ক একখানি পত্রিকা-ই রয়েছে। পত্রিকাটির নাম চা কন্যা।
বাংলাদেশের পর্য্যটন শিল্পকে অধিকতর এগিয়ে নিয়ে যেতে যোগাযোগ আইন শৃংঙ্খলা পরিস্থিতির অধিকতর উন্নতির সাথে সাথে পর্য্যটন সংক্রান্ত প্রকাশনা ও পঠন-পাঠন প্রয়োজন। মুক্ত বুদ্ধির চর্চা, জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ বিনির্মানে পঠন পাঠন ও পাঠাগার আন্দোলনকে অধিকতর বেগবান করতে হবে। কারন জ্ঞান চর্চা ও জ্ঞানার্জনে পাঠাগারের বিকল্প নেই।
বিশ্ব পর্য্যটন দিবসের প্রেক্ষিত ও প্রাক্কালে সর্ব কালের সেরা পর্য্যটক বিশ্ব নাগরিক ইবনে বতুতার উজ্জল স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।
[ষাটের দশকের সাংবাদিক। মুক্তিযোদ্ধা। কবি ও কলামিষ্ট। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।]

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •