সবজি চাষ করে ৮ বছরে রাজনগরের দিন মজুর আজমল আলী এখন কোটিপতি

January 28, 2021, এই সংবাদটি ৪০৫ বার পঠিত

শংকর দুলাল দেব॥ মৌসূমী ও বারোমাসী সবজি চাষ করে ভাগ্য বদলে দিয়েছেন রাজনগরের আজমল আলী (৪০)। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ গ্রামের শাহ মনফর আলীর ৩ ছেলের মধ্যে বড় আজমল আলী এক সময় দিন মজুরের কাজ করতেন। সংসার চালাতে গিয়ে প্রচুর ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েন। সহায়-সম্বলহীন আজমল কোন উপায় না পেয়ে সিদ্ভান্ত নেন সবজি চাষ করে দিন বদলাবেন। যেমন সিদ্বান্ত তেমনি কাজ। বিগত ২০১২ সালে মাত্র ১ হাজার ৯শ টাকা দিয়ে শুরু করেন ঢেড়শ চাষ। মাত্র ৮ বছরের ব্যবধানে তিনি আজ কোটিপতি।
সরেজমিনে গিয়ে জানাযায় মৌলভীবাজার জেলার রাজনগরের এক সময়ের দিন মজুর আজমল আলীর জীবন যুদ্ধের কাহিনী। উপজেলার উত্তরভাগ গ্রামের শাহ মনফর আলীর(৬৫) ছেলে আজমল আলী। সহায় সম্বলহীন অসহায় পিতার ৩ ছেলের মধ্যে বড় আজমল এক সময় সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন। কোন উপায় না পেয়ে সুদখোর মহাজনের দ্বারস্থ হন। একদিকে সংসার পরিচালনা অন্যদিকে ঋনের বোঝা পর্যায়ক্রমে তাকে নিদারুন হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। পাওনাদারের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে এক পর্যায়ে পাশ্ববর্তী ইন্দেশ্বর চাবাগানে অত্মগোপন করেন। কিছুদিন ওখানে লুকিয়ে দিন মজুরের কাজ করে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কোন কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। হঠাৎ তার মাথায় আসে সবজি চাষ করার। নিজের যথাযথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিগত ২০১২ সালে ইন্দেশ্বও এলাকার এক ব্যক্তির ১ বিঘা জমিতে মাত্র ৪০০ টাকার বীজ ও মজুরী সহ সাকুল্যে ১ হাজার ৯শ টাকা খরচ করে শুরু করেন ঢেড়শ চাষ। ছোট ২ ভাইকে নিয়ে কঠোর পরিশ্রমে শুরুতেই সফলতা পেয়ে যান। ওই বছর মোট ১ হাজার ৯শ টাকা খরচ করে লাভ করেন ৭ হাজার টাকা। আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। পরের বছর অরো কিছু জমি বন্ধক নিয়ে শুরু করেন বেগুন, টমেটো ও সিমের চাষ। পর্যায়ক্রমে নিরলস প্রচেষ্টা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে ৮বছর পর রারো মাস বিভিন্ন মৌসুমের সবজি চাষ করে এক সময়ের ঋণগ্রস্থ দিন মজুর আজমল আলী আজ কোটিপতি। বর্তমান রবি মৌসূমে তিনি মোট ৩০ বিঘা জমি বন্ধক নিয়েছেন। প্রতি বিঘা জমির জন্য জমির মালিককে ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী জমি বন্ধকের মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত। তবে ২০২৫ সালের পরে জমির মালিক বন্ধকী টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে কৃষক আজমল চাষাবাদ করতে পারবেন। এ বছর ৩০ বিঘা জমিতে তার মোট খরচ হয়েছে সর্বসাকুল্যে ৩ লক্ষ টাকা এবং তার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২০ লক্ষ টাকা। আজমল জানান, ফলন ভাল হওয়ায় লক্ষমাত্রার চেয়ে বেশী পেতে পারি। বর্তমানে তার খামারে শিম, বেগুন, অলকপি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, পানিলাউ, মিষ্ঠি লাউ, আলু, ধনেপাতা সহ বিভিন্ন ধরণের সবজি রয়েছে। এছাড়াও তার সবজি খামারের সাথে প্রচুর আখ ক্ষেত করেছেন। তার খামারে তারা ৩ ভাই ছাড়াও আরো ৫ জন শ্রমিক কাজ করছে। যাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে মোট ৫০ হাজার টাকা মজুরী দিচ্ছেন। তার খামারের সবজি মৌলভীবাজার ও সিলেটের বিভিন্ন বাজারে দ্রুত সরবরাহ করার জন্য ২টি টমটম গাড়ী ও ২টি মোটরবাইক ক্রয় করেছেন। আজমলের সবজি চাষে সফলতা দেখে তার অনেক প্রতিবেশীও বানিজ্যিক চাষ শুরু করেছেন। আজমল তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছেন বলে জানান। জানাযায়, আজমলের খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লক্ষ টাকার সবজি বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে তার গড়ে একলক্ষ টাকা লাভ হচ্ছে। সারা বছর তার খামারে বিভিন্ন ধরণের সবজি উৎপাদন হচ্ছে। মাঠের পর মাঠ সবজির সমাহার দেখে মনে হয় প্রকৃতি এখানে নিজ হাতে বিছিয়ে দিয়েছেন সবুজ বাগিচা। শাক সবজির উৎপাদন রাজনগরকে করেছে সমৃদ্ধ। কিছুটা পরিশ্রমে কৃষি কাজও শৈল্পিক সুষমা পেতে পারে, তার প্রমান পাওয়া যায় রাজনগরের আজমল আলীর সবজির মাঠ ঘুরলে ।
কৃষক আজমল আলী জানান, সবজি চাষে তার সফলতা দেখে এখন রাজনগরের অনেকেই সবজি চাষে মনযোগি হচ্ছেন। উপজেলার কয়েকটি গ্রামের অনেক কৃষক মৌসূমী ও বারোমাসী সবজি চাষ করে বিপুল মুনাফা অর্জন করছেন। রাজনগর থেকে প্রতিদিন শত শত মন রকমারি সবজি জেলার বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাচ্ছে। তিনি আরো জানান, বর্তমানে এই সবজি চাষ করে তার কোটি টাকার মত আর্থিক সামর্থ হয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদুল ইসলাম জানান, কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতায় সবজি চাষ করে এক সময়ের দরিদ্র আজমল আলী প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছেন। সবজি চাষে তার সফলতা দেখে এখন রাজনগরের অনেকেই সবজি চাষে মনযোগি হয়েছেন। তিনি এখন উপজেলার নয়, এ দেশের সফল চাষিদের উদাহরণ হতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •