অদম্য মেধাবী: কমলগঞ্জে দারিদ্রতাকে জয় করে এসএসসিতে জিপিএ-৫, অর্থাভাবে রেশমির চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন কি পূরণ হবে?

August 18, 2026,

প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ : দারিদ্র্য কিংবা মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ হেঁটে যাওয়ার কোনো প্রতিকূলতাই দমাতে পারেনি। চরম অভাব অনটন ও সীমাহীন কষ্টকে পেছনে ফেলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অদম্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছে রেশমি আক্তার সুমাইয়া।

নিত্যদিনের অভাব-অনটন আর চরম দারিদ্রতাকে জয় করে চমৎকার সাফল্য অর্জন করেছে এই মেধাবী শিক্ষার্থী। তবে অভাবের কারণে মেধার এমন স্বীকৃতিতে মা-বাবার মুখে সাময়িক হাসি ফুটলেও, সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক কঠিন অনিশ্চয়তা। ভালো কোনো কলেজে ভর্তি হওয়ার সামর্থ্য না থাকায় থমকে যেতে বসেছে এই অদম্য মেধাবীর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।

রেশমি আক্তার সুমাইয়া মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের জালালিয়া গ্রামের দিনমজুর কাওসার আহমেদ ও রুশনা আক্তার দম্পতির সন্তান। চলতি বছর কমলগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। উল্লেখ্য পুরো বিদ্যালয় থেকে যে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, রেশমি তাদের অন্যতম।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিন বোনের মধ্যে রেশমি কনিষ্ঠ। অর্থাভাবে বড় বোন উর্মি আক্তার পিনকি (ডিগ্রী শিক্ষার্থী) ও মেজো বোন প্রমি আক্তারের (একাদশ শ্রেণী) পড়াশোনা বছর খানেক আগে বন্ধ হয়ে যায়। তবে রেশমির মেধা ও পড়ার প্রবল আগ্রহ দেখে বাবা দিনমজুরি করে, এমনকি অনেক সময় না-খেয়ে থেকেও তার স্কুলের বেতন ও পড়ার খরচ জুগিয়ে গেছেন। মা রোশনা আক্তার সংসারের কোনো কাজ না দিয়ে তাকে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।

সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রেশমি আক্তার সুমাইয়া বলেন, “আমি প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছি। বাবা-মার ত্যাগের পাশাপাশি কমলগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক কৃষ্ণ পদ শীল ও শ্যামল কুমার সিংহ স্যারের অবদান আমি কোনোদিন ভুলব না। তাঁরা আমাকে বিনামূল্যে কোচিং করিয়েছেন এবং সহায়কের বই কিনে দিয়েছেন। বাবার কষ্ট দেখে ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবা করার ইচ্ছা জেগেছে, তাই আমি ডাক্তার হতে চাই। কিন্তু এই মুহুর্তে ভালো কোনো কলেজে ভর্তি হওয়ার মতো টাকা আমার পরিবারের নেই।”

বাকরুদ্ধ কণ্ঠে রেশমির বাবা কাওসার আহমেদ বলেন, “পাঁচ সদস্যের পরিবারে আমি একাই উপার্জনক্ষম। দিন আনি দিন খাই, সামান্য ভিটামাটি ছাড়া আর কিছুই নেই। অভাবের কারণে বড় দুই মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ করতে হয়েছে। রেশমির ফলাফলে আমরা খুব খুশি, কিন্তু এখন কলেজে ভর্তি আর বই-খাতা কেনার টাকা কীভাবে জোগাড় করব বুঝতে পারছি না। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি একটু সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেন, তবে মেয়েটার স্বপ্নটা বেঁচে যেত।”

কমলগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আব্দুল মোমিন রেশমির প্রশংসা করে বলেন, “রেশমি অত্যন্ত মেধাবী, নম্র ও অধ্যবসায়ী একটি মেয়ে। চরম দারিদ্রের মধ্যেও সে যে একাগ্রতা দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই সাফল্য আমাদের পুরো বিদ্যালয়ের গৌরব। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা পেলে রেশমি ভবিষ্যতে তার স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছাতে পারবে।”

মেধাবী রেশমির চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ এবং ভবিষ্যৎ লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য সমাজের বিত্তবান ও মানবিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তার পরিবার ও শিক্ষকমণ্ডলী।

তবে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও ভালো কলেজে ভর্তি হতে না পারা একটি বড় দুশ্চিন্তা। আসন সংকট ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যার পার্থক্যের কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের নামী প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ পায় না। তবে ভালো ফল অর্জনের জন্য শুধু নামী কলেজ নয়, নিজের নিয়মিত পড়ালেখাটাও জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com