ঈদ : বিশ্ব মুসলিম ঐক্য ও বিশ্ব শান্তির প্রতিক

August 4, 2013, এই সংবাদটি ৫৫৮ বার পঠিত

আর মাত্র ক’দিন পরেই আমাদের মাঝে ফিরে আসবে মুসলিম মিল্লাতের সর্ব বৃহৎ একটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিৎর। রমজান শেষে প্রতি বছরই মুসলমানগণ এ দিনে আনন্দ উৎসব করে থাকে । ঈদ মানেই ফিরে আসা। আনন্দ দেয়া । হাসি-খুশি করা। তবে এ ঈদটি সকলের জন্য নয় ;কেবল তাদের জন্য যারা সুদীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনায় বিভোর ছিল। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির জন্য রয়েছে একটি আনন্দ উৎসবের দিন। তারা সে দিন বিভিন্ন আনন্দ-উল্লাস, আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠে। ঠিক তেমনি মুসলমানদের জন্য রয়েছে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দু’টি আনন্দ উৎসবের দিন। একটি হচ্ছে, “পবিত্র ঈদুল ফিতর” আরেকটি হচ্ছে, “পবিত্র ঈদুল আযহা”। ঈদুল ফিতর হলো আরবী শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে এবং ঈদুল আযহা হলো জ্বিলহজ মাসের দশ তারিখে। বক্ষমান এ প্রবন্ধে ঈদুল ফিৎর নিয়ে আলোকপাত করার প্রয়াস করলাম। ঈদুল ফিতরের পরিচিতি: প্রথমে আমরা জেনে নেই ঈদ শব্দের অর্থ কী। ঈদ আরবী শব্দ, শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, আনন্দ-খুশি, প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা। আর ফিতর শব্দটি এসেছে, ‘ফিতরা’ ধাতু থেকে। ফিতর শব্দের অর্থ হচ্ছে, ভেঙ্গে ফেলা, সাদকা, ফিতরা। ঈদুল ফিতরের সমষ্টিগত অর্থ হচ্ছে, রোজা ভঙ্গের ঈদ। যেহেতু এক মাস সিয়াম সাধনা করার পর আমরা রোজা ভেঙ্গে ফেলি এবং ঈদ তথা আনন্দ করি সে জন্যই ঈদুল ফিতরকে, ঈদুল ফিতর নামে নাম করণ করা হয়েছে। আবার ঈদুল ফিতর এ জন্য বলা হয় যে, যেহেতু রোজাদাররা এক মাস রোজা রাখার পরে রোজা ভঙ্গ করে তাদের সম্পত্তি থেকে গরীব-মিসকীনদের মাঝে সম্পদ সাদকা তথা ফিতরা প্রদান করে। ঈদ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা, যেহেতু প্রতি বছর ঈদ মুমিনদের মাঝে আনন্দ-খুশির বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়, সে জন্য ঈদকে ঈদ বলা হয়। ঈদের সূচনা: হিযরতের পূর্বে ঈদ প্রথার প্রচলন ছিল না, বরং ঐ সময় মদিনার আনসারগণ বসন্ত ও পূর্ণিমার রাত্রে, “মিহিরজান” ও “নওরোজ” নামে দু’টি উৎসব পালন করতেন। হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক দিন নবী করিম (সা:) হিজরত করে মদিনায় তাশরিফ নিয়ে দেখতে ফেলেন মদিনাবাসীরা, ‘নববর্ষ ও মেহেরজানের’ দু’টি উৎসব পালন করছে, তখন মহানবী (সা:) তাদেরকে জিজ্ঞাস করলেন তোমরা এ দু’দিনে আনন্দ-উল¬াসে মেতে উঠ কেন? মদিনার আনসার এবং নওমুসলিমগণ বললেন, হে আল¬াহর রাসুল আমরা জাহেলী যুগে এ দু’দিনে আনন্দ উৎসব করতাম, যা আজ পর্যন্তও প্রচলিত। তখন রাসুল (সা:) তাদেরকে বললেন আল¬াহ তা’য়ালা তোমাদেরকে সেই দু’টি উৎসবের পরিবর্তে দু’টি উৎসব তোমাদেরকে দান করেছেন। সে দু’টি উৎসব হচ্ছে, ১. ঈদুল ফিতর, ২. ঈদুল আযহা।-আবু দাউদ শরীফ। ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য: মহান আল¬াহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে রোজাদারদের জন্য বিশেষ একটি পুরুস্কার হচ্ছে, ‘ঈদুল ফিতর’। আর ঈদের তাৎপর্য অপরিসীম। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) হাদিসের মধ্যে ইরশাদ করেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন যখন আসে তখন আল¬াহ তা’য়ালা রোজাদারদের পক্ষে গর্ব করে ফেরেশতাদেরকে বলেন, হে আমার ফেরেশতাগণ তোমরাই বল রোজাদারদেরকে রোজার বিনিময়ে আজকের এই দিন কি প্রতিদান দেওয়া যেতে পারে? সেই সমস্ত রোজাদার যারা তাদের দায়িত্ব পুরোপুরী আদায় করেছে, তখন ফেরেশতারা আল¬াহকে বলেন, হে দয়াময় আল¬াহ উপযুক্ত উত্তম প্রতিদান তাদেরকে দান করুণ। কারণ তারা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা করেছেন, প্রাপ্য পারিশ্রমিক তাদেরকে দান করুন। তখন আল¬াহ তা’য়ালা রোজাদারকে বলতে থাকেন, ‘হে আমার বান্দা তোমরা যারা যথাযথ ভাবে রোজা পালন করেছ, তারাহবীর নামায পড়েছ, তোমরা তাড়াতাড়ি ঈদগাহের মাঠে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য যাও এবং তোমরা তোমাদের প্রতিদান গ্রহণ কর। ঈদের নামাজের শেষে আল¬াহ তা’য়ালা তার বান্দাদেরকে বলতে থাকেন, হে আমার প্রিয় বান্দারা আমি আজকের এ দিনে তোমাদের সকল পাপ গুলোকে পূর্ণের দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। অতএব তোমরা নিস্পাপ হয়ে বাড়ীতে ফিরে যাও’।-বাইহাকী ও মিশকাত শরীফ। মহানবী (সা:) ইরশাদ করেন, ‘ঈদের আনন্দ শুধু তাদের জন্য যারা রমযানের রোযা, তারাবীহ সহ যাবতীয় আল¬াহর বিধি-বিধান গুরুত্ব সহকারে আদায় করেছে। আর যাহারা রমজানের রোযা ও তারাবীহ আদায় করেনি তাদের জন্য ঈদের আনন্দ নেই, বরং তাদের জন্য ঈদ তথা আনন্দ অগ্নিশিখা সমতুল্য।-বুখারী শরীফ। মহানবী (সা:) হাদিসের মধ্যে আরো ইরশাদ করেন যে, ‘যারা রমজানে রোযা রাখেনি তারা ঈদের নামাজে সু-সংবাদ প্রাপ্ত তথা মুক্তি প্রাপ্ত মানুষের কাতারে শামিল হবে না। তাদের জন্য কোন আনন্দ নেই। আর যারা রোযা পালন করেছে, গরীবদেরকে নিজের মাল থেকে ফিতরা দিয়েছে শুধুমাত্র ঈদ তাদের জন্যই। তবে যাদের রোযা রাখার বয়স হয়নি অথবা বিশেষ কোন কারণে রোযা রাখতে পারেনি তারাও ঈদের এই আনন্দে শরীক হতে পারবে। কিন্তু যারা বিনা কারণে এবং অলসতা করে রোযা রাখেনি তাদের জন্য এ ঈদে আনন্দ নেই। এ ঈদ তাদের জন্য আনন্দ স্বরূপ নয়, বরং তিরষ্কার স্বরূপ’। মহানবী (সা:) আরো ইরশাদ করেন যে, ‘যে ব্যক্তি দু’ঈদের রাত্রে পূণ্যের প্রত্যাশায় ইবাদত-বন্দেগী করে কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার, অর্থাৎ কিয়ামতের দিন অন্যান্য লোকদের অন্তর মরে যাবে, কিন্ত কেবল সেই ব্যক্তির অন্তর জীবিত থাকবে, সেদিনও মরবে না’।-আতরাগীব। রাসুলুল¬াহ (সা:) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পূণ্যময় ৫টি রাতে ইবাদত-বন্দেগী করে সেই ব্যক্তির জন্য সু-সংবাদ রয়েছে, আর সেই সুসংবাদটি হচ্ছে ‘জান্নাত’ এবং পূণ্যময় ৫টি রাত হলো: ১. ঈদুল ফিতর, ২. ঈদুল আযহা, ৩. শবে বরাত, ৪. জ্বিলহজ্জের রাত, ৫. আরাফাতের রাত।-বাইহাকী শরীফ। এছাড়াও ঈদের অনেক তাৎপর্য রয়েছে। ঈদের দিনে আমাদের করণীয় : ঈদ এলেই দেখা যায় এক শ্রেনীর লোক আনন্দ-ফুর্তী, ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে। যারা কি-না সারা বছর আল¬াহর বিধি বিধান অবজ্ঞা করে চলছে। পুরো রমজান মাস তারা গড্ডা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিয়েছে, তারাই আজ ঈদের মহা আনন্দে মেতে উঠছে। তাদের পরিবারেই চলছে ভোগ -বিলাসের নানা আইটেম। তাদেরকেই দেখা যায় রূপ-চর্চা ও সাজ-সজ্জার প্রতিযোগীতায় লিপ্ত। তারাই বেশি জাঁক-জমকভাবে পোষাক পরিধেয়ও ক্রয় করে উগ্রভাবে চলাফেরা করে। তারা নিজেরাই শুধু আনন্দ ফুর্তী করে ঈদের দিন অতিবাহিত করে। গরীব দু:খী অভাবীদের কোন খোঁজ খবর রাখে না। অথচ ঈদ আমাদেরকে শিক্ষা দেয় হিংসা বিদ্বেষ দুর করে ভ্রাতৃত্বেয় সম্পর্ক স্থাপন করে সম্মিলিতভাবে গরীব দুখী সবাই সাথে নিয়ে ঈদ আনন্দ করা। ধনীদের সম্পদের মধ্যে রয়েছে গরীবের হক। আর সে জন্যই ঈদুল ফিতরের প্রধান কাজ হচ্ছে বিত্তশালীরা প্রথমে তাদের সম্পদ থেকে গরীব দু:খীদেরকে ফিৎরা আদায় করে ঈদগাহে যাওয়া। কিন্তু বিত্তশালীরা আজ সেদিকে কোন খেয়াল না রেখে শুধু নিজেরাই যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই ঈদের আনন্দ ভোগ করছে। বাস্তব কথা হচ্ছে ঈদের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা বিধর্মীদের সংস্কৃতি পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। ঈদ আমাদের জন্য নিছক আনন্দ নয় বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে, কিন্তু আজ আমরা ঈদের আনন্দ করতে গিয়ে শরিয়াতের সীমা লঙ্গন করে এই ইবাদতের দিনে বিভিন্ন গুণাহে লিপ্ত হয়ে গিয়েছি। আমরা আমাদের বিবেক দিয়ে চিন্তা করে দেখতে হবে আজ আমরা কোথায়! গরীবরা একটি কাপড় ক্রয় করে পড়ে আনন্দ করতে পারছে না। আর আমরা একের স্থলে ডাবল কাপড় ক্রয় করে বিভিন্ন আল্টা-মর্ডাণ হয়ে গড্ডা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিচ্ছি। ঈদের দিনে দেখা যায় আমাদের শহরাঞ্চলে তরুণ-তরুণীরা পিন-পিনে ড্রেস তথা অশালীন পোষাক পড়ে বিভিন্ন পার্ক তথা দর্শনীয় স্থানে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই চলাফেরা করে ঈদের আনন্দ করছে। বিশেষ করে এক শ্রেনীর যুবকরা ঈদকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে বিভিন্ন নাযায়েজ তথা হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। অনেকেই ঈদের দিন জুয়াসহ বিভিন্ন ধরণের খেলাধুলায় মত্ত হয়ে পড়ছে। তাদের এই কর্মকান্ড দ্বারা বুঝা যায় ঈদ শুধু এসেছে এহেন কার্যক্রম করে আনন্দ খুশি করার জন্য। সুপ্রিয় সচেতন পাঠক ! ঈদ এসেছে সাম্য ও ভ্রাত্বেতের বন্ধনে একে-অপরের সঙ্গে আবদ্ধ হওয়ার জন্য। হিংসা বিদ্বেষ হানাহানি, মারামারি সবগুলো মুছে ফেলার জন্য। গরীব দু:খী সবাইকে নিয়ে মিলে-মিশে ঈদের আনন্দ ভোগ করার জন্য। ঈদে শুধু বিত্তশালীরা আনন্দ করবে এরকম নয় বরং ঈদ সবার জন্য, ধনীরা যেভাবে পোষাক পড়ে আনন্দ করে গরীবরাও সে আনন্দ করবে। শুধু ধনীরা আনন্দ করবে আর এতিম অসহায়রা আনন্দ থেকে বঞ্চিত করবে এটাই ঈদের মূল শিক্ষা নয়। ঈদের বাস্তব শিক্ষা হচ্ছে ধনী, গরীব সবাই মিলে ঈদের আনন্দ ভোগ করা। ধনীরা গরীবদেরকে ফিৎরা দিয়ে সাহায্য করে তাদের আনন্দের সাথে শরিক এটাই ঈদের মূল শিক্ষা। আল¬াহ্ যেন আমাদের সবাইকে সকল কুসংস্কার, হিংসা বিদ্বেষ সবকিছু বাদ দিয়ে গরীবদের হক আদায় করে নিজেদের আনন্দের সাথে তাদেরকেও আমাদের আনন্দের সাথে শরিক করার তাওফিক দান করুন। আমীন-সুম্মা, আমীন। লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, এহসান বিন মুজাহির, মুসলিম বাগ আ/এ, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার। ০১৭৩২-০৯৬৪১২
আর মাত্র ক’দিন পরেই আমাদের মাঝে ফিরে আসবে মুসলিম মিল্লাতের সর্ব বৃহৎ একটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিৎর। রমজান শেষে প্রতি বছরই মুসলমানগণ এ দিনে আনন্দ উৎসব করে থাকে । ঈদ মানেই ফিরে আসা। আনন্দ দেয়া । হাসি-খুশি করা। তবে এ ঈদটি সকলের জন্য নয় ;কেবল তাদের জন্য যারা সুদীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনায় বিভোর ছিল। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির জন্য রয়েছে একটি আনন্দ উৎসবের দিন। তারা সে দিন বিভিন্ন আনন্দ-উল্লাস, আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠে। ঠিক তেমনি মুসলমানদের জন্য রয়েছে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দু’টি আনন্দ উৎসবের দিন। একটি হচ্ছে, “পবিত্র ঈদুল ফিতর” আরেকটি হচ্ছে, “পবিত্র ঈদুল আযহা”। ঈদুল ফিতর হলো আরবী শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে এবং ঈদুল আযহা হলো জ্বিলহজ মাসের দশ তারিখে। বক্ষমান এ প্রবন্ধে ঈদুল ফিৎর নিয়ে আলোকপাত করার প্রয়াস করলাম। ঈদুল ফিতরের পরিচিতি: প্রথমে আমরা জেনে নেই ঈদ শব্দের অর্থ কী। ঈদ আরবী শব্দ, শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, আনন্দ-খুশি, প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা। আর ফিতর শব্দটি এসেছে, ‘ফিতরা’ ধাতু থেকে। ফিতর শব্দের অর্থ হচ্ছে, ভেঙ্গে ফেলা, সাদকা, ফিতরা। ঈদুল ফিতরের সমষ্টিগত অর্থ হচ্ছে, রোজা ভঙ্গের ঈদ। যেহেতু এক মাস সিয়াম সাধনা করার পর আমরা রোজা ভেঙ্গে ফেলি এবং ঈদ তথা আনন্দ করি সে জন্যই ঈদুল ফিতরকে, ঈদুল ফিতর নামে নাম করণ করা হয়েছে। আবার ঈদুল ফিতর এ জন্য বলা হয় যে, যেহেতু রোজাদাররা এক মাস রোজা রাখার পরে রোজা ভঙ্গ করে তাদের সম্পত্তি থেকে গরীব-মিসকীনদের মাঝে সম্পদ সাদকা তথা ফিতরা প্রদান করে। ঈদ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা, যেহেতু প্রতি বছর ঈদ মুমিনদের মাঝে আনন্দ-খুশির বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়, সে জন্য ঈদকে ঈদ বলা হয়। ঈদের সূচনা: হিযরতের পূর্বে ঈদ প্রথার প্রচলন ছিল না, বরং ঐ সময় মদিনার আনসারগণ বসন্ত ও পূর্ণিমার রাত্রে, “মিহিরজান” ও “নওরোজ” নামে দু’টি উৎসব পালন করতেন। হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক দিন নবী করিম (সা:) হিজরত করে মদিনায় তাশরিফ নিয়ে দেখতে ফেলেন মদিনাবাসীরা, ‘নববর্ষ ও মেহেরজানের’ দু’টি উৎসব পালন করছে, তখন মহানবী (সা:) তাদেরকে জিজ্ঞাস করলেন তোমরা এ দু’দিনে আনন্দ-উল¬াসে মেতে উঠ কেন? মদিনার আনসার এবং নওমুসলিমগণ বললেন, হে আল¬াহর রাসুল আমরা জাহেলী যুগে এ দু’দিনে আনন্দ উৎসব করতাম, যা আজ পর্যন্তও প্রচলিত। তখন রাসুল (সা:) তাদেরকে বললেন আল¬াহ তা’য়ালা তোমাদেরকে সেই দু’টি উৎসবের পরিবর্তে দু’টি উৎসব তোমাদেরকে দান করেছেন। সে দু’টি উৎসব হচ্ছে, ১. ঈদুল ফিতর, ২. ঈদুল আযহা।-আবু দাউদ শরীফ। ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য: মহান আল¬াহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে রোজাদারদের জন্য বিশেষ একটি পুরুস্কার হচ্ছে, ‘ঈদুল ফিতর’। আর ঈদের তাৎপর্য অপরিসীম। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) হাদিসের মধ্যে ইরশাদ করেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন যখন আসে তখন আল¬াহ তা’য়ালা রোজাদারদের পক্ষে গর্ব করে ফেরেশতাদেরকে বলেন, হে আমার ফেরেশতাগণ তোমরাই বল রোজাদারদেরকে রোজার বিনিময়ে আজকের এই দিন কি প্রতিদান দেওয়া যেতে পারে? সেই সমস্ত রোজাদার যারা তাদের দায়িত্ব পুরোপুরী আদায় করেছে, তখন ফেরেশতারা আল¬াহকে বলেন, হে দয়াময় আল¬াহ উপযুক্ত উত্তম প্রতিদান তাদেরকে দান করুণ। কারণ তারা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা করেছেন, প্রাপ্য পারিশ্রমিক তাদেরকে দান করুন। তখন আল¬াহ তা’য়ালা রোজাদারকে বলতে থাকেন, ‘হে আমার বান্দা তোমরা যারা যথাযথ ভাবে রোজা পালন করেছ, তারাহবীর নামায পড়েছ, তোমরা তাড়াতাড়ি ঈদগাহের মাঠে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য যাও এবং তোমরা তোমাদের প্রতিদান গ্রহণ কর। ঈদের নামাজের শেষে আল¬াহ তা’য়ালা তার বান্দাদেরকে বলতে থাকেন, হে আমার প্রিয় বান্দারা আমি আজকের এ দিনে তোমাদের সকল পাপ গুলোকে পূর্ণের দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। অতএব তোমরা নিস্পাপ হয়ে বাড়ীতে ফিরে যাও’।-বাইহাকী ও মিশকাত শরীফ। মহানবী (সা:) ইরশাদ করেন, ‘ঈদের আনন্দ শুধু তাদের জন্য যারা রমযানের রোযা, তারাবীহ সহ যাবতীয় আল¬াহর বিধি-বিধান গুরুত্ব সহকারে আদায় করেছে। আর যাহারা রমজানের রোযা ও তারাবীহ আদায় করেনি তাদের জন্য ঈদের আনন্দ নেই, বরং তাদের জন্য ঈদ তথা আনন্দ অগ্নিশিখা সমতুল্য।-বুখারী শরীফ। মহানবী (সা:) হাদিসের মধ্যে আরো ইরশাদ করেন যে, ‘যারা রমজানে রোযা রাখেনি তারা ঈদের নামাজে সু-সংবাদ প্রাপ্ত তথা মুক্তি প্রাপ্ত মানুষের কাতারে শামিল হবে না। তাদের জন্য কোন আনন্দ নেই। আর যারা রোযা পালন করেছে, গরীবদেরকে নিজের মাল থেকে ফিতরা দিয়েছে শুধুমাত্র ঈদ তাদের জন্যই। তবে যাদের রোযা রাখার বয়স হয়নি অথবা বিশেষ কোন কারণে রোযা রাখতে পারেনি তারাও ঈদের এই আনন্দে শরীক হতে পারবে। কিন্তু যারা বিনা কারণে এবং অলসতা করে রোযা রাখেনি তাদের জন্য এ ঈদে আনন্দ নেই। এ ঈদ তাদের জন্য আনন্দ স্বরূপ নয়, বরং তিরষ্কার স্বরূপ’। মহানবী (সা:) আরো ইরশাদ করেন যে, ‘যে ব্যক্তি দু’ঈদের রাত্রে পূণ্যের প্রত্যাশায় ইবাদত-বন্দেগী করে কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার, অর্থাৎ কিয়ামতের দিন অন্যান্য লোকদের অন্তর মরে যাবে, কিন্ত কেবল সেই ব্যক্তির অন্তর জীবিত থাকবে, সেদিনও মরবে না’।-আতরাগীব। রাসুলুল¬াহ (সা:) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পূণ্যময় ৫টি রাতে ইবাদত-বন্দেগী করে সেই ব্যক্তির জন্য সু-সংবাদ রয়েছে, আর সেই সুসংবাদটি হচ্ছে ‘জান্নাত’ এবং পূণ্যময় ৫টি রাত হলো: ১. ঈদুল ফিতর, ২. ঈদুল আযহা, ৩. শবে বরাত, ৪. জ্বিলহজ্জের রাত, ৫. আরাফাতের রাত।-বাইহাকী শরীফ। এছাড়াও ঈদের অনেক তাৎপর্য রয়েছে। ঈদের দিনে আমাদের করণীয় : ঈদ এলেই দেখা যায় এক শ্রেনীর লোক আনন্দ-ফুর্তী, ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে। যারা কি-না সারা বছর আল¬াহর বিধি বিধান অবজ্ঞা করে চলছে। পুরো রমজান মাস তারা গড্ডা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিয়েছে, তারাই আজ ঈদের মহা আনন্দে মেতে উঠছে। তাদের পরিবারেই চলছে ভোগ -বিলাসের নানা আইটেম। তাদেরকেই দেখা যায় রূপ-চর্চা ও সাজ-সজ্জার প্রতিযোগীতায় লিপ্ত। তারাই বেশি জাঁক-জমকভাবে পোষাক পরিধেয়ও ক্রয় করে উগ্রভাবে চলাফেরা করে। তারা নিজেরাই শুধু আনন্দ ফুর্তী করে ঈদের দিন অতিবাহিত করে। গরীব দু:খী অভাবীদের কোন খোঁজ খবর রাখে না। অথচ ঈদ আমাদেরকে শিক্ষা দেয় হিংসা বিদ্বেষ দুর করে ভ্রাতৃত্বেয় সম্পর্ক স্থাপন করে সম্মিলিতভাবে গরীব দুখী সবাই সাথে নিয়ে ঈদ আনন্দ করা। ধনীদের সম্পদের মধ্যে রয়েছে গরীবের হক। আর সে জন্যই ঈদুল ফিতরের প্রধান কাজ হচ্ছে বিত্তশালীরা প্রথমে তাদের সম্পদ থেকে গরীব দু:খীদেরকে ফিৎরা আদায় করে ঈদগাহে যাওয়া। কিন্তু বিত্তশালীরা আজ সেদিকে কোন খেয়াল না রেখে শুধু নিজেরাই যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই ঈদের আনন্দ ভোগ করছে। বাস্তব কথা হচ্ছে ঈদের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা বিধর্মীদের সংস্কৃতি পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। ঈদ আমাদের জন্য নিছক আনন্দ নয় বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে, কিন্তু আজ আমরা ঈদের আনন্দ করতে গিয়ে শরিয়াতের সীমা লঙ্গন করে এই ইবাদতের দিনে বিভিন্ন গুণাহে লিপ্ত হয়ে গিয়েছি। আমরা আমাদের বিবেক দিয়ে চিন্তা করে দেখতে হবে আজ আমরা কোথায়! গরীবরা একটি কাপড় ক্রয় করে পড়ে আনন্দ করতে পারছে না। আর আমরা একের স্থলে ডাবল কাপড় ক্রয় করে বিভিন্ন আল্টা-মর্ডাণ হয়ে গড্ডা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিচ্ছি। ঈদের দিনে দেখা যায় আমাদের শহরাঞ্চলে তরুণ-তরুণীরা পিন-পিনে ড্রেস তথা অশালীন পোষাক পড়ে বিভিন্ন পার্ক তথা দর্শনীয় স্থানে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই চলাফেরা করে ঈদের আনন্দ করছে। বিশেষ করে এক শ্রেনীর যুবকরা ঈদকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে বিভিন্ন নাযায়েজ তথা হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। অনেকেই ঈদের দিন জুয়াসহ বিভিন্ন ধরণের খেলাধুলায় মত্ত হয়ে পড়ছে। তাদের এই কর্মকান্ড দ্বারা বুঝা যায় ঈদ শুধু এসেছে এহেন কার্যক্রম করে আনন্দ খুশি করার জন্য। সুপ্রিয় সচেতন পাঠক ! ঈদ এসেছে সাম্য ও ভ্রাত্বেতের বন্ধনে একে-অপরের সঙ্গে আবদ্ধ হওয়ার জন্য। হিংসা বিদ্বেষ হানাহানি, মারামারি সবগুলো মুছে ফেলার জন্য। গরীব দু:খী সবাইকে নিয়ে মিলে-মিশে ঈদের আনন্দ ভোগ করার জন্য। ঈদে শুধু বিত্তশালীরা আনন্দ করবে এরকম নয় বরং ঈদ সবার জন্য, ধনীরা যেভাবে পোষাক পড়ে আনন্দ করে গরীবরাও সে আনন্দ করবে। শুধু ধনীরা আনন্দ করবে আর এতিম অসহায়রা আনন্দ থেকে বঞ্চিত করবে এটাই ঈদের মূল শিক্ষা নয়। ঈদের বাস্তব শিক্ষা হচ্ছে ধনী, গরীব সবাই মিলে ঈদের আনন্দ ভোগ করা। ধনীরা গরীবদেরকে ফিৎরা দিয়ে সাহায্য করে তাদের আনন্দের সাথে শরিক এটাই ঈদের মূল শিক্ষা। আল¬াহ্ যেন আমাদের সবাইকে সকল কুসংস্কার, হিংসা বিদ্বেষ সবকিছু বাদ দিয়ে গরীবদের হক আদায় করে নিজেদের আনন্দের সাথে তাদেরকেও আমাদের আনন্দের সাথে শরিক করার তাওফিক দান করুন। আমীন-সুম্মা, আমীন। লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, এহসান বিন মুজাহির, মুসলিম বাগ আ/এ, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার। ০১৭৩২-০৯৬৪১২ এহসান বিন মুজাহির:

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •