মৌলভীবাজারে উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে উন্মুক্তজলাশয়ের দেশীয় প্রজাতির মাছ

June 22, 2019,

ইমাদ উদ দীন॥ এজেলায় দেশীয় প্রজাতির মাছ উৎপাদনের জৌলুস কমে যাচ্ছে। এখন দিন দিন ব্যহত হচ্ছে মাছের উৎপাদন ক্ষমতাও। বড় সড়কের দু’পাশে থাকা ডোবা,খালা ও নালা যেমন কমছে। তেমনি কমে যাচ্ছে অনান্য স্থানের এরকম দেশীয় প্রজাতির মাছের আবাস স্থল। এখন নানা কারনে মাছের অবাদ বিচরনের পরিসরও ছোট হয়ে আসছে। তাই উন্মুক্ত জলাশয়ের ছোট বড় দেশীয় প্রজাতির মাছের চাহিদা ব্যাপক হলেও নেই কাঙ্খিত উৎপাদন। এর অন্যতম কারন মাছের আবাসস্থল দখলে নিচ্ছে মানুষ। কমছে জলাশয় বা জলাধার। বাড়ছে মানুষ। এরই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের আবাসন ও খাদ্য চাহিদা। অপরিকল্পিত ঘর বাড়ি আর দালান হওয়াতে আয়তন কমছে জলাশয়ের। মাছে ভাতে বাঙালির মাছ উৎপাদনের স্থানগুলোও দ্রুত কমে যাচ্ছে। আর যে গুলো এখন কোন রকম ঠিকে আছে তাও ভরাট হয়ে পড়ে আছে অযতœ আর অবহেলায়। এক সময়ের মাছের এই নিরাপদ অভয়াশ্রমগুলো এখন কেবলই স্মৃতি। সংশ্লিষ্ট বিষেজ্ঞরা বলছেন প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মানব সৃষ্ট দানবীয় আচরণই এর জন্য দায়ী। চিরচেনা এই ভূ-মানচিত্র পরিবর্তনে চরম সংকটে দেশীয় প্রজাতির মৎস্যকূল। সাথে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। কারনে অকারনে ভরাট হচ্ছে উন্মুক্ত জলাশয়। খাল,ডোবা আর নালার পাশাপাশি ভরাট হয়ে অস্থিত সংকটে এজেলার হাওর ও নদী। আর সেই সাথে বিলীণ হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির ছোট বড় মাছ। গতিপথ রোধ,বাসস্থান ও খাদ্য সংকটে হারিয়ে যাচ্ছে এসকল মিঠা পানির মাছ।

চলমান এ সংকটে চিরচেনা এই মাছগুলো এখন আর সচরাচর দেখা যায়না স্থানীয় হাট বাজারগুলোতে। নির্দিষ্ট প্রজাতির (ফিসারী ও পুকুরে) চাষকৃত মাছেই সয়লাব বাজার। বাজারে ওঠা এমন মাছগুলো ক্রেতাদের পচন্দ না হলেও চিরচেনা ওই সকল মাছ না থাকায় তা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। একসময় মৎস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিলো মৌলভীবাজার জেলা। কারণ এজেলায় যেমন রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি। তেমনি রয়েছে অসংখ্য হাওর,নদী,গাঙ,ছড়া,ডোবাও খাল। হাওরের বিল,নদীসহ মাছ উৎপাদনের এই উৎসগুলোতে ধরা পড়তো স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠা দেশীয় প্রজাতির নানা জাতের প্রচুর পরিমাণের মাছ। বাজারও সয়লাব ছিল দেশীয় প্রজাতির ছোট বড় মাছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত উজান থেকে ঢলের সাথে নেমে আসা পলিমাটিতে ভরাট হচ্ছে জলাশয়। এতে করে ইতিমধ্যেই ভরাট হয়েগেছে অনেক নদী,ডোবা গাঙ,ছড়া ও খাল। এরই সাথে কমছে স্থানীয় হাওরগুলোর জলধারণ ক্ষমতা ও মাছের উৎপাদন। এর প্রভাবে মাছের সাথে উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে ক্ষেতকৃষি,জলজ প্রাণি ও উদ্ভিদেরও। এসকল পানির উৎসস্থলগুলোর পানি ধারন ক্ষমতা কমে যাওয়াতে বর্ষায় অল্প বৃষ্টিতে বন্যা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা। আর শুষ্ক মৌসুমে খরা। এই কারনে এসকল খাত থেকে সরকার হারাচ্ছে বড় ধরনের রাজস্ব আয়। জানা যায় মৌলভীবাজারের হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওর নানা প্রতিকূলতায় এখন অস্থিত্ব জিয়ে রাখা এই ৩টি হাওরের অন্যতম দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকি। এ হাওরের অবস্থান মৌলভীবাজারের ৩টি এবং সিলেটের ২টি উপজেলা নিয়ে। এ হাওরে মোট আয়তন ৩৯ হাজার ৩শত ২৩ হেক্টর। রয়েছে ছোট বড় ২৩৮টি বিল। হাকালুকি হাওর ছাড়াও এ জেলায় রয়েছে আরো ৬টি হাওর। প্রতি বছর উজান থেকে নেমে আসা ঢলের সাথে পলিমাটি এসে হাওর ও বিল ভরাট হওয়ার কারণে মাছের উৎপাদন ক্রমশ কমছে। এ ছাড়াও মাছের প্রজনন সময়ে অবাদে হাওরে চলে মা ও পোনা মাছ শিকার। এতে করে বিলের লীজ গ্রহীতা ও স্থানীয় মৎস্যজীবীরা চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

জেলা মৎস্য অফিস সুত্রে জানা যায় গেল বছর পর্যন্ত হাকালুকি হাওরে মাছের উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার মেট্রিকটন। হাইল হাওরের উৎপাদন ৫ হাজার মেট্রিকটন ও কাউয়াদিঘির উৎপাদন ৪ হাজার মেট্রিকটন। জেলার উম্মুক্ত জলাশয় বা হাওর থেকে বছরে ২৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। জেলায় (ফিশারী,পুকুর ও হাওর)বছরে মাছের উৎপাদন ৪৭ হাজার মেট্রিকটন। হাওর এলাকায় মাছ উৎপাদন ৪০ শতাংশ আর ক্ষেতকৃষি ও অনান্য হল ৬০ শতাংশ। তবে হাওর এলাকাসহ জেলার ভরাট হয়ে যাওয়া এই জলাশয় বা জলাধারগুলো নাব্যতা ফিরে পেলে মাছের উৎপাদন হবে দ্বীগুণ। আর অনান্য আনুষাঙ্গিক বিষয় পরিকল্পিত হলে তখন মাছের উৎপাদন তিনগুণ বাড়ার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায় ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ২০ একরের অধিক জলাশয় ইজারা থেকে রাজস্ব আদায় হয় ৩ কোটি ২৮ লাখ ২১ হাজার ২ শত ৬৪ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ২ কোটি ৩৪ লাখ ৬৩ হাজার ৯ শত  টাকা এবং সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে খাস কালেকশন সহ রাজস্ব আদায় হয় ২ কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার ৬ শত ৫৮ টাকা। এছাড়াও উপজেলা পর্যায় থেকে ইজারা দেয়া ২০ একরের নীচের জলাশয় থেকেও রাজস্ব আদায় কমে আসছে। স্থানীয় বাসিন্দাসহ নদী ও হাওর পাড়ের মানুষের জোর দাবি নাব্যহ্রাস হয়ে যাওয়া এসকল জলাশয় বা জলাধার গুলো খনন ও সংস্কারের। আর মাছের উৎপাদন সহ রাজস্ব বৃদ্ধি পেতে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন সময় বৈশাখ মাস থেকে ৩ মাস হাওরে মা ও পোনা মাছ ধরা বন্ধ রাখা। মৎস্য বিভাগের উদ্যোগে বর্ষার শুরুতেই পোনা মাছ হাওরে অবমুক্তকরা এবং বিলের চার পাশে উঁচু বাঁধ নির্মাণ করে পলিমাটি আসা বন্ধ সহ ভরাট বিল গুলো দ্রুত খননের। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে পলিমাটি এসে ভরাটের কারণে হাওর, নদী ও জলাশয়ের পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এতে করে মাছের উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। মাছের উৎপাদন বাড়াতে হাওরপাড়ের জেলেদের পূর্ণবাসনসহ মাছের প্রজনন সময়ে মাছ না ধরার পরামর্শ তার।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com