চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের নারীরা অস্থায়ী দীর্ঘমেয়াদী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহনে আগ্রহী হচ্ছেন

স্টাফ রিপোর্টার॥ সুস্থ পারিবারিক জীবন গঠনে এমন একটি জীবনের কথা চিন্তা করতে হবে, যেখানে জীবন তথ্য ও জ্ঞানের অভাবে, অর্থাভাবে, স্থানাভাবে ও চিকিৎসার অভাবে ভারাক্রান্ত না হয়। জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো সুন্দর, সহজ ও স্বাভাবিকভাবে পূরণ করা যায়, যাতে টানাপোড়নের সংসারে জীবন কোনভাবে থমকে না যায়। তাই পরিকল্পিত পরিবার গঠনের মূলকথা হলো জীবনব্যাপী পরিকল্পনা, যা প্রতিটি নর-নারীর জানা অত্যাবশ্যক।
ধরে নেয়া যাক নব বিবাহিত দম্পতিগণ বিয়ের পরপরই সন্তানের বোঝা নিতে চাননা, তাই নতুন জীবনের সুমধুর আস্বাদন নিতে নিশ্চিন্তে ও নির্ভাবনায় দিন অতিবাহিত করতে থাকেন এবং সমূহ বিপদের সম্মূখীন হন। এধরনের অনাকাঙ্খিত বিপদ মোকাবেলায় প্রতিটি নব দম্পতিকে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সর্ম্পকে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও ধারণা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ন । বর্তমান সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণের অনেক আধুনিক পদ্ধতি স্থানীয় সরকারী ও বেসরকারী ক্লিনিকগুলোতে বিদ্যমান, তম্মধ্যে থেকে আপনাকে বেছে নিতে হবে আপনার পছন্দের পদ্ধতিটি যেটি আপনার শরীরের জন্য উপযোগি ।
মৌলভীবাজার সদর উজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের মাতারকাপন গ্রামের রহিমা বেগম পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারনা আছে কি না জানতে চাইলে বলেন পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে শুনছি তবে কোন পদ্ধতি গ্রহন করিনি। পূর্ব মাতার কাপন গ্রামের রিমা বেগম বলেন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সর্ম্পকে কিছুটা জানি, আমার একটা বাচ্ছা আছে, তাই এমুহুর্তে সন্তান নিতে চাইনা বলে মা ও শিশু কল্যান কেন্দ্রে (মাতৃমঙ্গল) যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি । মাতার কাপন গ্রামের সেলিনা বলেন বেগম পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে মোটামুটি জানি, আমার তিন মেয়ে ,আমি মা ও শিশু কল্যান কেন্দ্রে (মাতৃমঙ্গল) গিয়ে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাঠি (ইমপ্লানন) পরেছি পাঁচ বছরের জন্য, পদ্ধতিটি ব্যবহারে আমার কোন সমস্যা হচ্ছেনা।
এবিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মৌলভীবাজার সদর উজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরির্দশক পাপ্পু রাজ কর জানান দেশে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে, তাই পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে জোরদার করতে সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার । উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন চাঁদনীঘাট এলাকার বেশীর ভাগ সক্ষম দম্পতি কোন না পদ্ধতির আওতায় এসেছেন, তাদের পছন্দের তালিকায় আছে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি যেমন কনডম, খাবার বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্ট ইত্যাদি । সচেতনতার অভাবে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহনের হার কম হলেও ইদানিং এসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, এতে মা ও শিশু মৃত্যুহার কমে আসছে । এসকল সেবাসমূহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি কিøনিক ও বেসরকারি সংস্থার ক্লিনিক সমূহে পাওয়া যাচ্ছে ।
তিনি আরো বলেন বাংলাদেশে পুরুষদের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় স্বল্পমেয়াদী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হলো কনডম এবং নারীদের জন্য মিশ্র খাবার বড়ি, কিন্তু এর বিড়ম্বনা হলো অনেক পুরুষ এটি ব্যবহারে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেননা । অন্যদিকে খাবার বড়ির বিড়ম্বনা হলো এটি প্রতিদিন নির্দ্দিষ্ট সময়ে খেতে হয়, কোন কারণে খেতে ভুলে গেলে এর কার্যকারিতা আর থাকেনা। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যবহারের (ইস্টোজেন ও প্রজোস্টরেন হরমোন) ফলে অনেক নারী স্থুলকাল ও মাসিক অনিয়মিত হয়ে পড়ছেন বলে আমাদেরকে জানান। এসব বিড়ম্বনা তথা অনাকাংখিত গর্ভ ঝুঁকি এড়ানোর জন্য অস্থায়ী দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে । প্রথমেই আলোকপাত করা যাক ইমপ্ল্যান্ট/ইমল্পানন নিয়ে, এটি যেকোন সক্ষম দম্পতির বাহুতে চামড়ার নিচে স্থাপন করা হয়, যা ৩-৫ বছর মেয়াদ পর্যন্ত কার্যকর, তবে এর কার্যকারিতার সময় নির্ভর করে রডের সংখ্যা এবং হরমোনের ধরনের উপর । ইমপ্ল্যান্ট পদ্ধতি কারা নিতে পারেন যেমন নব দম্পতি বা যারা দীর্ঘদিনের জন্য জন্মবিরতি চান এমন নারীগণ। অন্যদিকে নারীদের জন্য হরমোনবিহীন অতি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো কপারটি বা আইইউডি যা নারীদের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয় । যেসকল দম্পতির দুটি জীবিত সন্তান আছে এবং দ্বিতীয় সন্তানের বয়স এক বছর সেসকল দম্পতি এটি গ্রহন করতে পারেন। উল্লেখিত দুটি পদ্ধতির সুবিধা হলো প্রয়োজনে গ্রহিতাগণ যেকোন সময় কোন প্রশিক্ষিত নার্স বা ডাক্তারের সহযোগিতায় এটি খুলে আবার সন্তান ধারন বা নিতে পারবেন। এসকল পদ্ধতি গ্রহনে উৎসাহিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তর সকল সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে সেবা গ্রহিতাদেরকে ভাতা প্রদান করছেন।
বিষয়টি অতীব জনগুরুত্বপৃর্ন হওয়ায়, রেডিও পল্লীকন্ঠ এফএম ৯৯.২, মৌলভীবাজার জেলায় মার্চ ২০১৮ সাল থেকে “সুরক্ষা” নামে একটি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে । এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রজনন স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী পদ্ধতি তথা মাসিক নিয়মিকতরণ ও গর্ভপাত পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা সেবা সর্ম্পকে জনগনকে সচেতন করা এবং উক্ত কার্যক্রমে মহিলা ও নব দম্পতিগণের প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধি করা । সুরক্ষা কর্মসূচিতে উঠান বৈঠক আয়োজনের পাশাপাশি রেডিও টকস, ম্যাগাজিন, সোসাল ডায়ালগসহ নানাবিধ অনুষ্ঠান সমম্প্রচার করে আসছে। রেডিও টকস্ এর মাধ্যমে শ্রোতাগণ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তরের আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর মাধ্যমে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, মাসিক নিয়মিতকরণ সর্ম্পকে সরাসরি জেনে নিতে পারছেন। ফলশ্রুতিতে, একদিকে যেমন সাধারন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে পরিবার পরিকল্পনা সর্ম্পকে যেসকল লোকাচার ও সামাজিক কুসংস্কার আছে তা ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে বলে জানান রেডিও পল্লীকন্ঠের স্টেশন ম্যানেজার। উক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নে আর্থিক সহযেগিতায় দিচ্ছে ইউকেএইড-ডিএফআইডি এবং কারিগরী সহযোগীতা দিচ্ছে আইপাস বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) ।



মন্তব্য করুন