অবশেষে চালু হচ্ছে কমলগঞ্জের শমসেরনগর বিমানবন্দর

June 30, 2016,

প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ॥ দীর্ঘদিন থেকে অযত্ম-অবহেলায় অব্যবহৃতভাবে পড়ে থাকা সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর বিমানবন্দরটি পুণরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে সিলেটের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। শমসেরনগর বিমানবন্দরটি ফের চালুর উদ্যোগের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, সরকার ইতিমধ্যে শমশেরনগর বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জানা যায়, দেশে তিনটি আন্তর্জাতিক ও ১২টি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর রয়েছে। এই অভ্যন্তরীন বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে চলমান রয়েছে মাত্র পাঁচটি। বাকিগুলো রয়েছে বন্ধ। জরুরি অবতরণের জন্য থাকা দেশের তিনটি বিমানবন্দরের মধ্যে কেবলমাত্র চালু রয়েছে তেজগাঁও বিমানবন্দর। অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর ও বগুড়া বিমানবন্দরটি।

biman
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় অভিযান চালানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর চা বাগানের ৬২২ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে একটি বিমানবন্দর গড়ে তোলে। ব্রিটিশ আমলে ওই বিমানবন্দরটি ‘দিলজান্দ বন্দর’ নামেই পরিচিত ছিল। বিমানবন্দরটিতে ৬ হাজার ফুট দীর্ঘ ও ৭৫ ফুট প্রশস্ত রানওয়ে রয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর বিমানবন্দরটির নতুন নামকরণ করা হয় ‘শমসেরনগর বিমানবন্দর’। প্রশস্ত রানওয়ে, বিশাল পরিসর, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা ও সব ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা থাকা এ বিমানবন্দরে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত বিমান ওঠানামা করতো। পরবর্তীতে বিমানবন্দরটিতে যাত্রীবাহী বিমান ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৭০ সালে পিআইএ’র অভ্যন্তরীণ একটি ফ্লাইট সিলেট বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শমশেরনগর বিমানবন্দরে জরুরী অবতরণকালে রানওয়ের কাছে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। সেসময় বিমানবন্দরের ভেতরে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এর বেশকিছু অবকাঠামো পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়।

airport-pic
১৯৭৫ সালে শমসেরনগর বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ ইউনিট খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে এখানে বিমান বাহিনীর একটি পরীক্ষণ স্কুল স্থাপন করে চালু করা হয় বার্ষিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তখন থেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টার ওঠানামা করছে।
বর্তমানে বিমানবন্দরের অবহেলিত ও পতিত ভূমি ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল কৃষি খামার। এখানে বিমানবাহিনীর রিক্রুটমেন্ট অফিসও খোলা হয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে রানওয়ের অল্প কিছু অংশ। ২০১২ সালে বিএএফ শাহীন কলেজের কার্যক্রম শুরু করা হয়।
বিমানবন্দরটিতে প্রতিবছর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জাতীয় ক্যাডেট কোর বিমান শাখার সদস্যদের অগ্নিনির্বাপণ, প্রাথমিক চিকিৎসা, রাডার নিরাপত্তা, ফায়ারিংসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
সংশি¬ষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে শমসেরনগর বিমানবন্দর থেকে এ্যারোবেঙ্গল এয়ার সার্ভিসের ফ্লাইট চালু করা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাবে এ ফ্লাইট সার্ভিসটি যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। পরে এ প্রক্রিয়াও একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে যায়।
শমসেরনগর বিমানবন্দর ফের চালু প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এর সাথে কয়েকদফা যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে বৃহষ্পতিবার বিকেলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর পাবলিক রিলেশন অফিসার (পিআরও) মাহবুবুর রহমান জানান, সরকার ইতিমধ্যে শমসেরনগর বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এটা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, বিশাল পরিসর, প্রশস্ত রানওয়ে, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা ও অবকাঠামোর সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দীর্ঘ ৪৮ বছরেও চালু হয়নি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বিমান বন্দরটি। স্বাধীনতাত্তোর কালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগে এ বিমান বন্দর চালুর জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও ক্ষমতায় গিয়ে কেউই কথা রাখেনি।
আলাপকালে মৌলভীবাজার জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক কমরেড আব্দুল আহাদ মিনার, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাইফুর রহমান, প্রবাসী জহিরুল ইসলাম, যুক্তরাজ্য প্রবাসী কমিউনিটি নেতা মনসুর আহমদ মকিস, নাজমুল ইসলাম ইমন জানান, প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলার উল্লে¬খযোগ্য সংখ্যাক লোক ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। প্রতিদিই এ জেলার শতশত যাত্রী পরিবার পরিজন নিয়ে রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহঃ) আন্তজার্তিক বিমানবন্দর ও সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর হয়ে দেশ-বিদেশে যাতায়াত করে থাকেন। সর্বোপরি শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে মৌলভীবাজার জেলার প্রবাসীদের দুর্ভোগ লাঘব হবে। যাত্রীসেবার পাশাপাশি ভৌগোলিক কারণে এই বিমানবন্দরের সামরিক গুরুত্বও রয়েছে। বিমান বন্দরটি চালু হলে এটিকে কেন্দ্র করে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠবে ও এ এলাকার যাত্রীদের যাতায়াত সুবিধা বাড়বে বলে সচেতন মহল মনে করছেন। এ ব্যাপারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের আশু দৃষ্টি কামনা করছেন মৌলভীবাজার জেলাবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com