গেইটঃ অবশেষে আমাদের জেলা পরিষদ এর গেইটও সু-সমাপ্ত হলঃ কি চমৎকার দেখা গেল

February 24, 2022,

মুজিবুর রহমান মুজিব॥ মানব সভ্যতার ইতিহাস ক্রম বিকাশ ও ক্রম বিবর্তনের ইতিহাস। বিকাশ ও বিবর্তনের মাধ্যমে আদি গুহা মানব থেকে অত্যাধুনিক সুশিক্ষিত সু-সভ্য মানবজাতির উত্থান ও অবস্থান। মহান স্রষ্টার শ্রেষ্ট জীব মানুষ আশরাফুল মখলুকাত-সনাতনি শাস্ত্রানুসারে নর রুপী নারায়ন। মানুষ তাঁর প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য, মেধা ও মনন, শিক্ষা ও জ্ঞানের গুনে এই মাটির পৃথিবীকে মায়াময়, সৌন্দর্য্য ও ঐর্শ্বয্য মন্ডিত-ঐতিহ্যবাহী করে তুলেছেন- তাঁদের শৈল্পিক কর্মকান্ড মারফত। আদি গুহা মানব থেকে আধুনিক মানব সভ্যতার স্থাপনা সমূহের মধ্যে গেইট-আধুনিক জমানায় ঐহিত্য ও দৃষ্টি নন্দন স্থাপনা হিসাবে স্বীকৃত ও খ্যাত। জাতীয়, আন্তর্জাতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্য্যায়ে ও গেইটের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। লন্ডন গেইট, ইন্ডিয়া গেইট, ঢাকা গেইট, আন্তর্জাতিক পর্য্যায়ে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসাবে খ্যাত। দিল্লীর ইন্ডিয়া গেইটে ফটো সেশন না করলে ভারত ভ্রমন অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ঐতিহ্যবাহী সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন তিন নেতার মাজার এর পাশে ঢাকা গেইট মুঘল স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন। ঢাকাস্থ মুঘল সুবাদার মীর জুমলার আমলে নির্মিত ঢাকা গেইট চার শতাধিক বৎসর যাবত অনাদরে অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে। বাংলার আধ্যাত্বিক রাজধানী ইয়েমেনী বীর, পিরানে পীর হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনির স্মৃতি বিজড়িত পূন্যভূমি সিলেট-এ-মাজার গেইট সহ একাধিক গেইট বিদ্যমান। লোক কবি মরমিয়া হাছন রাজার স্মৃতি বিজড়িত সুনামবাহী সুনামগঞ্জে প্রবেশ মুখে লোক সঙ্গীঁতের যন্ত্র দোতারার আদলে নির্মিত গেইটটি শৈল্পিক ও দৃষ্টি নন্দন।
শত বর্ষের গৌরবময় অতীত ঐতিহ্যে লালিত আমাদের মৌলভীবাজার ত্রয়োদশ শতাব্দির খ্যাতিমান সাধক হযরত সৈয়দ শাহ্ মোস্তফা শেরে সওয়ার চাবুক মার বোগদাদি (রঃ)’র স্মৃতি ধন্য পূন্য ভূমিতে একাধিক আকষনীয় গেইট বিদ্যমান। রেওয়াজ ও রীতি অনুযায়ী গেইট-এ-স্থান-প্রতিষ্ঠানের নাম ও নির্মান সন উল্লেখ থাকে। ফলতঃ ফলক যুক্ত আধুনিক গেইট সমূহ বিগত দিনের তাম্র ফলকের মত আগামী দিনে ও ইতিহাসের উপাদান ও উপকরন হিসাবে আগামী দিনের লেখক গবেষকদের কাজে লাগবে।
সৈয়দ শাহ মোস্তফা সড়কের পশ্চিমাংশে ১৯৮২ সালে এই মহকুমার শত বর্ষ পূর্ণ হলে শত বর্ষীয় স্মারক গেইট-টি-সাদা মাঠা হলেও ইতিহাস ঐতিহ্যের স্বাক্ষী হয়ে আছে। প্রসঙ্গঁত উল্লেখ্য ১৮৮২ সালে তৎকালীন বৃটিশ সরকার প্রশাসনিক প্রয়োজনে সিলেটের দক্ষিনাঞ্চল নিয়ে-সাউথ সিলেট সাবডিভিশন- নামে একটি মহকুমা স্থাপন করেন যা পরবর্ত্তী কালে ‘মৌলভীবাজার’ নাম ধারন করে। পৌর এলাকাধীন সৈয়দ শাহ মোস্তফা সড়কে মাজার গেইট এবং ঈদগাহ্ গেইট এর নির্মান শৈলী, শৈল্পিক কাজ দৃষ্টি নন্দন ও আকর্ষনীয়। এ ক্ষেত্রে বর্ত্তমান পৌর মেয়র আলহাজ্ব মোঃ ফজলুর রহমান তাঁর আন্তরিকতা, সততা ও সার্বিক কার্য্যক্রমের জন্য ধন্যবাদ পাবার হকদার। ইতিম্যেই তিনি পৌরবাসির প্রশংসা প্রাপ্ত হয়েছেন। সরকারি অফিস সমূহের মধ্যে জেলা ও দায়রা জজ সাহেব, জেলা প্রশাসক সাহেব, গণ পূর্ত বিভাগ, জন স্বাস্থ্য প্রকৌশলী, এল.জি.ই.ডি.অফিস সমূহে সরকারি গেইট থাকলেও শ্রীমঙ্গল রেডস্থ পুলিশ লাইনস গেইট-টি- সব চাইতে সুবিশাল, দৃষ্টি নন্দন ও কারু কার্য্য মন্ডিত।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে মৌলভীবাজার সরকারি অনার্স কলেজ, মৌলভীবাজার সরকারি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, মৌলভীবাজার সরকারি মহিলা কলেজ, গেইট গুলি দর্শনীয়। কাশিনাথ আলা উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজেও নূতন ভাবে বৃহদাকারে দর্শনীয় গেইট নির্মান করা হচ্ছে।
পৌর এলাকাধীন কোর্ট রোড এর মধ্যাংশে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ এর অবস্থান। মৌলভীবাজার পাবলিক লাইব্রেরী এবং জেলার একমাত্র গুল পুকুর ও এখানেই অবস্থিত। নানান জাতের গাছ গাছালি সবুজ এর সমাহার এর অপরূপ প্রাকৃতিক নিসর্গ দৃষ্টি নন্দন ও মনলোভা। বাল্য-কৈশোর কাল থেকেই এলাকাটি আমার খুবই প্রিয়। পরিষদ এর পূর্বাংশে কোর্ট রোড পেরিয়েই বন্ধুবর আজিজুল হক ইকবাল এর পৈত্রিক বসত বাড়ি হক ভিলা-র অবস্থান। হক ভিলার বৈঠক খানা তরজার বেড়া বিশিষ্ট চৌ’চালা টিনের ঘর ছিল আমি, বন্ধুবর ইকবাল এবং প্রিয় বন্ধু দেওয়ান গোলাম ছরোওয়ার হাদি গাজির আড্ডাখানা অস্থায়ী ঠিকানা। ষাটের দশকে এ শহরে কমিউনিটি সেন্টার-ডেকোরেটার্স ব্যবস্থা ছিল না। পাবলিক লাইব্রেরী কেন্দ্রীক একটি পাঠচক্র সাহিত্য চর্চা মুক্ত বুদ্ধির আন্দোলন ছিল। পাবলিক লাইব্রেরীর দক্ষিনাংশে একটি ভবনে মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব এবং উত্তরাংশে-ফোর্থ ক্লাস এম্পয়িজ রিক্রিয়েশন ক্লাব-ছিল। ঐ দশকে জেলার বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ আইনজীবী, এ জেলার উচ্চ শিক্ষিত ও সম্ভান্ত পরিবারের সন্তান আব্দুল জালাল চৌধুরী তাঁর কতেক সহযোগি সমেত প্রতিষ্ঠা করেন মৌলভীবাজার পাবলিক লাইব্রেরী। আমরা তখন একটি মহকুমা হিসাবে সিলেট, জেলাধীন। জেলা পরিষদ এর প্রধান কার্য্যালয় সিলেটে ছিল। জেলা পরিষদ সর্বোচ্চ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হলেও সে সময় নির্ব্বাচিত জেলা পরিষদ ছিল না, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক ভাবেই তখন জেলা পরিষদ পরিচালিত হত। তাছাড়া তখন দেশে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র কিংবা গণতান্ত্রীক ব্যবস্থা চালু ছিল না, দেশে-মৌলিক গণতান্ত্রীক পদ্ধতি চালু ছিল। ফলতঃ এই এলাকায় সিলেট থেকে এসে কোন প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কিংবা নেতৃত্ব প্রদর্শন করা হয় নি। পাবলিক লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন আমাদের প্রজন্মের পিতৃতুল্য গুরুজন আব্দুল জালাল চৌধুরী এডভোকেট। সাংবাদিক ও গ্রহ্ণ সুহৃদ সিলেটের বুরহান উদ্দিন খাঁন সাহেব ছিলেন গ্রহ্ণাগারিক। উভয়ই আমাদের সঙ্গেঁ সু-সম্পর্ক যুক্ত থাকায় পাবলিক লাইব্রেরী ও জেলা পরিষদ এর সমগ্র এলাকাটি আমরা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ব্যবহার করতাম। স্বাধীনতা উত্তর কালে মৌলবীবাজার পাবলিক লাইব্রেরীর সম্পাদক হন সর্ব্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ-সু-সাহিত্যিক সৈয়দ সামশুল ইসলাম, সহ সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছিলাম আমি নিজে। অতঃপর আমি সেক্রেটারি ও তৎপর সহ সভাপতি হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করি। আমার মেয়াদান্তে জেলা সদরের বর্ত্তমান মাননীয় সাংসদ গ্রহ্ণ সুহৃদ নেছার আহমদ দুই মেয়াদে আন্তরিকতা ও কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। জেলা পরিষদ এর উত্তরাংশে মৌলভীবাজার ক্লাব, টেনিস গ্রাউন্ড এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমী সমগ্র এলাকার প্রতি মমতা ও দুর্বলতা ছিল-আছেও। এলাকায় অবকাঠামোগত পরিবর্তন উন্নয়ন হয়েছে। রিক্রিয়েশন ক্লাব এলাকায় নির্মিত হয়েছে জেলা পরিষদের মধ্যমাকৃতির বহুতল ভবন বিশিষ্ট রেস্ট হাউস। পাঠাগারের দক্ষিনাংশের প্রেসক্লাব ভবনকে, প্রেসক্লাবের কাজে ব্যবহার না করে আবাসিক গৃহ হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগে জেলা পরিষদ এর পক্ষ থেকে উচ্ছেদ করা হয়। তখন মিডিয়া এখনকার মত শক্তিশালী ও কোন কমিটি ছিল না বলে আইনের আম্রয় ও নেয়া যায় নি। সমগ্র এলাকায় এখন জেলা পরিষদ এর দপ্তর, পূর্বাংশে দ্বিতল বিশিষ্ট জেলা পরিষদের আকর্ষনীয় মসজিদ। এলাকায় “নুর জাহান ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্র” নামে একটি ক্বারিয়ানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। অমি ক-বছর এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন করে ও ছাত্রের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি। খুঁজ নিয়ে জানা যায় ক্বারি, কোন ডিগ্রী নয়, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকায় শুধুমাত্র ‘ক্বারি সাহেব হওয়ার জন্য এখন আর কেউ ক্বারিযানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে রাজি নয়। মৌলভীবাজার মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হলে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক সাংসদ অগ্রজ প্রতিম এম.আজিজুর রহমান প্রথমে প্রশাসক অতঃপর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর কার্য্য কালে পাঠাগার প্রাঙ্গঁনে বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবের ম্যুরাল সহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্থাপনা নির্মিত হয়, এলাকার সৌন্দর্য্য ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। চেয়ারম্যান থাকা কালে করনায় আক্রান্ত হয়ে এই কর্ম্মবীর এর মহাপ্রয়ান ঘটে। তাঁর মৃত্যোর পর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদক আলহাজ্ব মিছবাহুর রহমান জেলা পরিষদ, মৌলভীবাজার এর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা নির্ভীক মুজিব সৈনিক আলহাজ্ব মিছবাহুর রহমান একজন কর্ম চঞ্চল এবং কর্ম্ম তৎপর রাজনীতিবিদ। জেলা পরিষদ এর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেও নিরলস ভাবে চেয়ারম্যান জেলা পরিষদ এর গুরু দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
অপরূপ প্রাকৃতিক-নিসর্গ ও বহুবিধ ভবনের মাঝে বিশাল এলাকার জেলা পরিষদের কোন মানান সই গেইট নেই। দায়িত্ব বান মিছবাহুর রহমান আন্তরিক উদ্যোগ নিয়ে নির্ম্মান করেন জেলা পরিষদ এর গেইট। পাশেই একটি ডিজিটাল সেন্টার। জেলা পরিষদ এর সদ্য নির্মিত আকর্ষনীয় গেইট এর রং রুচী সম্পন্ন। নির্ম্মান শৈলী আধুনিক। এলাকার গুরুত্ব ও সৌন্দর্য্য বাঁড়িয়ে দিয়েছে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ এর নবনির্মিত গেইট। স্বল্প সময়ে এমন দর্শনীয় স্থাপনা উপহার প্রদানের জন্য কথার মানুষ কাজের মানুষ আলহাজ্ব মিছবাহুর রহমানকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমরা আমাদের প্রতিবেদনের শিরোনামে সুর মিলিয়ে বলতে পারি কি চমৎকার দেখা গেল।
লেখকঃ পরিচিতি ঃ ষাটের দশকের সাংবাদিক। মুক্তিযোদ্ধা। কলামিষ্ট। সাবেক সভাপতি জেলা আইনজীবী সমিতি ও মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •