জনবল সংকটে: শ্রীমঙ্গল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা

June 30, 2016,

সাইফুল ইসলাম॥ জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবা থেকে ব্যাহত হচ্ছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
অন্যদিকে ৩১ শয্যার বরাদ্ধকৃত রোগীদের খাবার ভাগ করে দেয়া হচ্ছে ৫০ শয্যার রোগীদের মধ্যে। নেই কোনো সুপেয় পানির ব্যবস্থা। অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে দুই যুগ আগের পুরাতন এক্সরে মেশিনটি। ব্লাড ব্যাংক না থাকার অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই প্রসূতি মায়েদের অস্ত্রোপচার চালাতে হচ্ছে।

hospital-pic--sreemangal
জানা গেছে, ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে নতুন ভবনের উদ্ভোধন করেন। কিন্তু উদ্ভোধনের প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যাপ্ত ৫০ শয্যায় জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। যেখানে ৫০ শয্যা হাসপাতালের বরাদ্ধ থাকার কথা ২৯ জন ডাক্তার সেখানে হাসপাতালটি চালানো হচ্ছে মাত্র ১৩ জন ডাক্তার দিয়ে। ফলে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে ৫০ শয্যা চালাতে গিয়ে উপজেলার উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ডাক্তারদের নিয়ে আসা হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। টেকনিশিয়ানের অভাবে পড়ে আছে অত্যাধুনিক ইসিজি ও আলট্রাসনোগ্রাফী মেশিনগুলোও। সার্জারীর ডাক্তার না থাকায় শুধু মাত্র প্রসুতি মায়েদের ছাড়া অন্য কোন অপারেশন করা যাচ্ছে না এখানে।

pic--sreemangal-3
৩১ শয্যার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পদগুলো (জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনী), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া), (ডেন্টাল সার্জন) পদ পূরণ করে রাখা হয়েছে মেডিকেল আফিসার ও সহকারী মেডিকেল অফিসার দিয়ে। সেকারণে কাক্ষিত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেনা জটিল রোগীরা।
২৯ জুন বুধবার হাসপাতাল ঘুরে রোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মোহাম্মদ মহসীন রোগী সুস্থ হোক আর না হোক যত তাড়াতাড়ি পারেন হয় রের্ফাড করেন জেলা সদর হাসপাতালে না হয় সিট কেটে পাঠিয়ে দেন তাদের বাড়ীতে। হাসপিটালের গাইনি ডাক্তার রোকশানা পারভীন ও সিস্টার রীতা দে হাসপাতালে কোন প্রসূতি আসলে নানা ভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আবার তারা ওই ক্লিনিকে তারাই গিয়ে সিজার করেন। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল শহরের পলি ক্লিনিক, মেডিকেয়ার হাসপাতালে প্রসূতি রেফার্ড করা হয়।
৮ জুন শ্রীমঙ্গল শহরতলীর শাহীবাগ এলাকার রাসেল মিয়ার স্ত্রী প্রসূতি আমিনা বেগম গাইনী ডাক্তার রোকশানা পারভীনের অবহেলার কারণে শ্রীমঙ্গল হাসপাতাল থেকে মৌলভীবাজার হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায়।
হাসপাতালে সিস্টার রীতা দে বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এ ধরণের কাজে আমি জড়িত নই।
তবে হাসপাতালে গাইনী বিভাগের ডাক্তার রোকশানা পারভীনের সাথে যোগাযোগ করে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালের বারান্দায় কাতরাচ্ছেন সুবিতা কুসুম (৫০) বলেন, দুই দিন ধরে হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে আছেন। তিনি প্রচন্ড জ্বর নিয়ে হসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু এখনোও পর্যন্ত কোন ডাক্তার তার খোঁজ নেয়নি।
শ্রীমঙ্গল শহরতলীর মতিগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা জোসনা বেগম দুপুর সাড়ে ১২টায় জানান, তার ছেলে খুব জ্বরে আক্রান্ত, তিনি টিকেট কাউন্টারে লোক নাই। পরে তাদের কাছ কাকুতিমিনতি করে জ্বরের ট্যাবলেট নিছি।

hospital-pic
জানাউড়া গ্রামের মিনারা বেগম সকাল ১১টায় হসপিটাল থেকে টিকেট নিয়েছেন। দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপতালে বারান্দায় দেড়মাস বয়সী শিশুকণ্যা শিমুকে নিয়ে বসে আছেন। তিনি বলেন, আমি গাইনি ডাক্তার রোকশানা ম্যাডামের চেম্বার গেছি সেখানে একজন সহকারী আমাকে জানায় আর রোগী দেখবে না। তাকে প্রাইভেট চেম্বার যাওয়ার পরামর্শ দেন। তৎক্ষনিক রোকশানা পারভীনের চেম্বারের সহকারী পারভীন আক্তার বিষয়টি অস্বাকীর করে বলেন, আমি তো বলি নাই প্রাইভেট চেম্বারে দেখানোর জন্য। বলছি কালকে আসতে আজকে সিজার চলছে। ম্যাডাম অপারেশন থিয়েটারে আছেন।
হাসপিটালের ক্লিনার শামসুন নাহার বলেন,যতক্ষণ টিকেট থাকে তথক্ষণ ডাক্তার রোগী দেখেন। মোটামুটি ভালই সেবা হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল আবাসিক মেডিকেল অফিসার মোহাম্মদ মহসীন, সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, লিখিত দেন – মৌখিক অভিযোগের কোন ভিত্তি নাই। রোগীদের সেবা না দিয়ে খারাপ আচারণের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজন ডাক্তারকে কর্মচারীর মতো ব্যবহার করতে পারবেন না। চেয়ারম্যান -মেম্বার বিভিন্ন নেতাকর্মীরা ফোন করে নানা ভয়ভীতি হুমকী দেন। তিনি বলেন, পুলিশের সাথে কেউ খারাপ আচরণ করতে পারে না কারণ তাদের লাঠি গরম আছে। ডাক্তারকে যদি ম্যাজিষ্টেট ক্ষমতা ও লাঠি দেয় সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।তিনি আরও বলেন, একজন ডাক্তার প্রতিদিন ৬০জন করে রোগী দেখে। তখন তার মাথা কি ঠিক থাকে ?। মানুষের খারাপ ব্যবহার ডাক্তারা মেনে নিতে পারে না। জোর করে ডাক্তারকে দিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে পারবেন না। যদি ডাক্তার আন্তরিক না হয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্তকর্তা ডা. জয়নাল আবেদীন টিটোর বলেন, ৩১ শয্যার জনবলে চলছে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৫০ শয্যার হাসপাতাল।
ফলে হাসপাতালটিতে জনবল সংকট দীর্ঘদিন ধরে। তবুও যে টুকু আছে তা নিয়েই আমরা আন্তরিকতার সহিত টিম ওর্য়াক এর মাধ্যেমে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে জরুরী ভিত্তিতে ৫০ শয্যার জনবল নিয়োগ দেয়া হলে রোগীদের আরো উন্নত সেবা দেয়া যেতো।
তিনি বলেন, ৩১ শয্যা থেকে উন্নতি করে ৫০ শয্যা হাসপাতাল করা হলেও অর্থ মন্ত্রনালয় এখনও এটিকে অনুমোদন দেয়নি। তাই ৩১ শয্যার বরাদ্ধ দিয়েই হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ৫০ শয্যা হাসপাতালে যেখানে ২৯ জন ডাক্তার থাকার কথা সেখানে মাত্র ১৩ জন ডাক্তার দিয়ে আমরা হাসপাতালটি চালাচ্ছি। এতে জনবল সংকটের কারনে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক ব্যহৃত হচ্ছে।
হাসপাতালের রোগিদের খাবার প্রসঙ্গে বলেন, বরাদ্ধ না থাকায় ৩১ জনের খাবার দিয়ে আমরা কোন ভাবে ম্যানেজ করে ৫৫/৬০ জনকে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতাল ক্লিনিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, একজন ছাড়া বাকী সকলেরই বয়স ৫৫ বছর হয়ে গেছে। তাই এদেরকে দিয়ে সব কাজ করানো সম্ভব হয় না। এখানে নতুন লোকও নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। তবে এখানে ক্লিনিং ও নার্সিং এর লোক খুব প্রয়োজন।
একজন ডাক্তার নাইট ডিউটি করার পর সকাল বেলা ঘুমানোর প্রয়োজন। কিন্তু লোকবল কম থাকায় সে তুলনায় বিশ্রাম নেয়া হয় না। সেজন্য অনেক সময় রোগীদের ভীড় সামলাতে অনিচ্ছাকৃত ভাবে ডাক্তার-রোগীর মধ্যে কিছুটা ভুল বুঝাবুঝির ঘটনা ঘটে থাকে।
তিনি বলেন, যেহেতু শ্রীমঙ্গল একটি চা বাগান পরিবেষ্ঠিত এলাকা সে হিসেবে বাগান এলাকাতে একটু বেশি মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি আছে। তাই আমরা কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে তাদেরকে সচেতন করে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। এতো কিছুর পরও আমরা গত ছয় মাসে ৭৬ হাজার রোগীর চিকিৎসা দিয়েছি। এ হিসেবে গড়ে প্রতিদিন ৩০০ জন করে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু এ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে বহন করতে আরো এম্বুলেন্স দরকার। এছাড়া রক্ত নেওয়ার জন্যও ভাল টেকনিশিয়ানের খুব প্রয়োজন। আল্ট্রাসনোলজিষ্ট ডাক্তার, ইসিজি মেশিন চালানোর টেকনিশিয়ান এবং টেকনিশিয়ান থাকলে এক্সরে মেশিন মেরামত করে এসব সেবা দেওয়া যেত। তবে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল এক্সরে মেশিন এখানে খুব দরকার। হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার আছে কিন্তু অপারেশন করতে হলে ৫ জন লোকের প্রয়োজন। লোকবলের কারনে আমরা সে কাজটিও করতে পারছিনা। সর্বশেষ ৮ জুন প্রসুতির মত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন,আমি অভিযোগ পেয়েছি। খোঁজ নিয়ে জানলাম যে অপারেশন থিয়েটার নেয়ার শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে তিনি মারা গেছেন,তিনি এ বিষয়ে আমি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ, পরে আমি জেলা সিভিল সার্জনকে বিষয়টি অবগত করেছি। তদন্ত চলছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com