মনু নদীতে ঐতিহ্যবাহী ‘মাছ হাট উৎসব’

November 7, 2022,

মাহফুজ শাকিল॥ বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদীর একটি হলো মনু। সেই মনু নদীতে উৎসবের আমেজে শত বৎসরের ঐতিহ্যবাহী ‘মাছ হাট উৎসব’ সোমবার শুরু হয়েছে। চলবে বুধবার পর্যন্ত। টানা তিন দিনব্যাপী এ উৎসবে জেলেদের পাশাপাশি সহ¯্রাধিক বিভিন্ন পেশার সৌখিন মৎস্য শিকারীরা অংশ নেন।

মৌলভীবাজারে এ নদীতে প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে মাছ ধরা উৎসব হয়ে থাকে। এটি মূলত মাছ ধরা উৎসব হলেও এলাকাবাসীর মুখে মুখে এর নাম হয়েছে ‘হাট উৎসব’। তবে কি কারণে হাট উৎসব তার সঠিক ইতিহাস নেই। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবছরের শুষ্ক মৌসুমে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে নির্দিষ্ট তিনদিন এতদ অঞ্চলের লোকজন একত্রে মাছ ধরা উৎসবে মেতে উঠেন। বহুকাল ধরে এটি চলে আসছে তাই এটি এই এলাকার ঐতিহ্যের একটি অংশ হিসেবে রুপ নিয়েছে।

জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর। এই তিন উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা দীর্ঘ মনু নদীর কুলাউড়া উপজেলা অংশে চলছে এমন ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ওই উৎসবে অংশ নেন কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, জুড়ী ও রাজনগর উপজেলা থেকে আসা সহ¯্রাধিক পেশাদার ও সৌখিন মাছ শিকারীরা। আর তা দেখতে ভিড় করছেন দূর-দূরান্ত থেকে আগত সৌখিন মানুষরা। প্রতিবছর খর¯্রােতা মনু নদীর পানি কমে আসলে কুলাউড়া উপজেলার হাজিপুর, টিলাগাঁও, পৃথিমপাশা ও শরিফপুর ইউনিয়নের মনু নদীর দুপাড়ের প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ এক সঙ্গে মাছ ধরতে নামেন নদীতে। আর এ সময়ের জন্য গ্রামের লোকজন প্রতিবছর অপেক্ষায় থাকেন। সৌখিন মাছ শিকারীরা আগ থেকেই মাছ ধরার উপকরণ জাল নৌকা তৈরি করে রাখেন। নদীতে মাছ ধরা উৎসব কারো জালে মাছ আটকা পড়ছে আবার কারো জালে একেবারের মাছ ধরা পড়ছে না।

মাছ ধরার প্রথম দিনে বিরল প্রজাতির প্রায় ১০ কেজি ওজনের একটি আইড় মাছ ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকারীদের জালে ধরা পড়ে। সোমবার সকাল আটটায় মনু নদীর হাজিপুর ইউনিয়ন অংশে মনু-কটারকোনা রেল ও সড়ক সেতুর পূর্ব স্থান থেকে এই উৎসবের যাত্রা শুরু হয় এবং শেষ হয় দুপুর ২টায়। মনু রেল সেতু, লালবাগ, গাজীপুর, মাথাবপুর ঢহরে (নদীর গভীর অংশ) ছোট বড় বিভিন্ন জাল দিয়ে মাছ শিকার করেন লোকজন। মনু ঢহর এলাকা থেকে স্থানীয় কঠারকোনার জেলে এক প্রবাসীর জালে ধরা পড়ে বিলুপ্ত প্রায় ১০ কেজি ওজনের আইড় মাছ। এছাড়া আরো দুইজন ব্যক্তির জালে ধরা পড়ে ৫ কেজি ওজনের রুই, ৪ কেজি ওজনের বাউশ মাছ। মনু, গাজীপুর, মাথাবপুর ও লালবাগ ঢহর এলাকা পর্যন্ত সহ¯্রাধিক মাছ শিকারী অংশগ্রহণ ও উৎসুক জনতার পদচারণায় মিলনমেলায় পরিণত হয়। প্রচন্ড শীতের মাঝেও উৎসবের আমেজ তখন নদীর দুই পাড়ে। সৌখিন ও পেশাদার শিকারীরা পলো, কুচা, ঝাকি জাল, প্লেন জাল, টানা জালসহ নানা জাতের ফাঁদ নিয়ে তারা নদীতে মাছ শিকারে নামেন। কেউ নৌকায়, কেউ বা কলাগাছের ভেলায় চেপে। অনেকেই আবার নদীর চর জাগা অথবা শুকনো স্থান থেকে ঝাকি জাল দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করেন। তারা মাছ ধরা দৃশ্য দেখার পাশাপাশি মাছও ক্রয় করেন। প্রথম দিনই সৌখিন শিকারির জালে দেশীয় প্রজাতির রুই. বাউশ, আইড়, পাবদা, বাচা মাছসহ বিভিন্ন ছোট মাছ ধরা পড়ে। মনু নদীর মাছ সুস্বাদু ও সতেজ থাকায় তা কিনতে মানুষের আকর্ষণও বেশি। তবে শুধু কেনা বেচাই নয়। প্রতিবছরই পালিত হয়ে আসা এই উৎসবটি স্থানীয় ঐতিহ্যেরই অংশ।

কমলগঞ্জের ভানুগাছ থেকে আসা সৌখিন শিকারী আব্দুল মতিন জানান, তিন পেশায় একজন ব্যবসায়ী। শখের বসে বিভিন্ন স্থানে বড়শী ও জাল দিয়ে মাছ শিকার করেন তিনি। গত দেড়যুগ থেকে প্রতিবছর মনু নদের হাট বাওয়ায় মাছ শিকারে আসেন।

হাজীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইফুল আলম বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষদের সময়কাল থেকে এই নদী থেকে এভাবে উৎসবের মধ্যে দিয়ে মাছ ধরা হয়। বিশেষ করে ২০ ভাগ জেলে ও ৮০ ভাগ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সৌখিন মানুষ এই উৎসবে মাছ শিকার করতে আসেন। তিনি জানান, মনু নদের কুলাউড়া অংশের ৮ থেকে ১০ টি ঢহরে ‘হাট বাওয়া’ উৎসবের আয়োজন করা হয়।

হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়াদুদ বক্স বলেন, যারা নদীতে ‘মাছ ধরা উৎসবে’ নেমেছেন তারা কেউই পেশাদার জেলে নয়। নানা পেশার মানুষ শখের বসে তিন দিনের এই মাছ ধরা উৎসবে নদীতে নেমেছেন। প্রতি শীত মৌসুম আসলেই একই সময়ে নদীর পানি কমে যায়। তখন হাজিপুর, টিলাগাঁও, পৃথিমপাশা ও শরীফপুরে চারটি ইউনিয়ন ছাড়াও বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় হাজার খানেক মানুষ মাছ ধরা উৎসবে মেতে ওঠেন। মনু নদীতে মাছ ধরা উৎসব এই এলাকার লোকজনদের দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্য হিসাবে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •