শ্রীমঙ্গলের গোপেন্দ্র দাশ সিলেটি তারুণ্য শক্তির প্রেরণা

May 12, 2021, এই সংবাদটি ৮৩৪ বার পঠিত

বিকুল চক্রবর্তী॥ সিলেটি মানুষদের মধ্যে হাতের কাজ শিখার আগ্রহ কম। অথচ যে কোন একটি হাতের কাজ জানা থাকলে তাদের জীবন সংগ্রামে গতিতে ছন্দময়তা থাকে। তাঁদের জীবনে সাফল্য সুনিশ্চিত। আমাদের সমাজে এমন কিছু উদাহরণও বিদ্যমান আছে। সিলেট বিভাগে স্থাপিত বিভিন্ন টেকনিক্যাল কলেজে দেখা যায় সিলেটি শিক্ষার্থী কম। বিভিন্ন টেকনিক্যাল এবং কারিগরি প্রতিষ্ঠানে সিলেটি হাতের কাজ শিখা শিক্ষার্থী কিংবা শ্রমিকের সংখ্যা কম হলেও মৌলভীবাজারের একজন সফল হাতের কাজ শিখা মানুষ গোপেন্দ্র কুমার দাশ। যে গল্প সিলেট বিভাগের বর্তমান তারুণ্য শক্তির প্রেরণা। শুধু মাত্র একটি হাতের কাজ জানা থাকায় জীবনের সকল দূর্যোগকে জয় করা এই ব্যক্তি শূন্য হাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে আজ শত কোটি টাকার মালিক। নিজের পরিশ্রমে শুধু নিজের জীবনের ছন্দ ও গতি ফিরিয়ে আনেননি তিনি আমাদের সমাজের জন্য রেখেছেন বিশেষ ভূমিকা।
এই জীবন সংগ্রামে সফল মানুষটির দীর্ঘ জীবন পর্যালোচনায় হাতের কাজ শেখার পাশাপাশি তার কাছ থেকে অধ্যাবসায়ী হওয়ারও শিক্ষা পাওয়া যায়। গল্পটি শ্রীমঙ্গল শহরের ধানসিঁড়ি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা শ্রী গোপেন্দ্র কুমার দাশের।
এ গল্পের নায়ক গোপেন্দ্র দাশ ১৯৩৯ সালে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পিছিয়ে পড়া একটি গ্রাম কাউয়াদিঘি হাওর পাড়ের অন্তেহরিতে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এই গ্রামটি জলের গ্রাম হিসেবে খ্যাত। তার বাবার নাম গজেন্দ্র কুমার দাশ ও মায়ের নাম মাতঙ্গনী বালা দাশ। জন্মের সময় তাদের তেমন কোন সম্পদ ছিলো না। বাবা ছিলেন খাদি কাপড়ের ব্যবসায়ী। কাকা মোদির দোকানী। গ্রামে লেখাপড়ার তেমন সুযোগ না থাকায় কাকার পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলেটের বালাগঞ্জে চলে যান সেখানে লেখাপড়া করেন। গোপেন্দ্র দাশ জানান, এসএসসি ফেল করার পর আর পড়া হয়নি। লেগে পড়েন দোকানদারীতে। একসময় কাকা মারা গেলে সে দোকান লোক দিয়ে অল্প বয়সেই পরিচালনা করেন তিনি। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান হয়। পরে বালাগঞ্জের ভিটা বিক্রি করে দেন তার বাবা। তিনি চলে যান বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সুনামগঞ্জে। তার বাবা সুনামগঞ্জ শহরে খাদি কাপড়ের ব্যবসা করতেন এবং তৎকালীন সময়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকার এজেন্ট ছিলেন। নতুন পাড়ায় তাদের বাসা ছিলো। সেখানে তিনি হাতের কাজ শিখেন প্রথমে কারেন্টর কাজ পরে সিনেমা হলের অপারেটিং। ১৩০ টাকা বেতনে সুনামগঞ্জ নুরজাহান সিনেমা হলের অপারেটর হিসেবে চাকুরী পান। সেখানে থেকেই বিয়ে করেন। সুনামগঞ্জে ভালো একটি বিস্তার ঘটেছিলো তার এবং তার পিতার। কিন্তু ৬৪ সালে দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবে তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে ছন্দপতন ঘটে। তার পিতা তাদের খাদি কাপড়ের দোকান সাইফুর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দেন এবং পত্রিকার এজেন্ট গুরুদাশ চক্রবর্তী নামে জনৈক ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দিয়ে গ্রামের বাড়ি অন্তেহরিতে চলে আসেন। গ্রামে এসে তার বেকার ভালো লাগে না। তিনি কাজের খোঁজে প্রায়ই আসেন মৌলভীবাজার। তখন ওয়াটার এন্ড পাওয়ার ডেভেলাপমেন্ট অথরেটি (ওয়াপদা)র মৌলভীবাজারে বিভিন্ন দিকে বৈদ্যুতিক খুঁটি সম্প্রসারণ করে অনেকে বাড়িঘরে বিদ্যুৎ নিতে থাকেন। তিনি সে সকল বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ করেন। ওই সময় সরকারি বিভিন্ন বিল্ডিং-এ ওয়ারিং এর জন্য টেন্ডার দেয়া হয় কিন্তু কাজ করার মতো কোন লোক পাওয়া যায়নি।
১৯৬৪ সালের শেষ দিকে গোপেন্দ্র দাশ মৌলভীবাজার কল্পনা সিনেমা হলের পাশে ইনাম উল্লার ভাগিনার ইলেকট্রিকের দোকানে বসে গল্প করছিলেন। সে সময় সরকারি ঠিকাদার রব্বার মিয়া তাকে প্রস্তাব দেন সরকারি বিল্ডিংগুলোর ইলেকট্রিকের কাজের টেন্ডার দিতে। তিনি সাহস করে সে সময় টেন্ডারে অংশ নিয়ে কাজ পান। নিষ্ঠার সাথে তিনি মৌলভীবাজারের কোট কাচারী ও সিএমবি অফিসের বিল্ডিংগুলো সুন্দরভাবে ওয়ারিং করে দেন। স¦ল্প সময়ে ভালোমানের একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে তার পরিচিতি লাভ হয়। ওই সময় মৌলভীবাজারের আহমদুর রহমান খাঁ নামে এক ব্যবসায়ী শ্রীমঙ্গলে একটি তেলের মিল খোলতে দক্ষ লোক পাচ্ছিলেন না। সে সময় আহমদুর রহমান খাঁ মৌলভীবাজারে বিভিন্ন জায়গার গোপেন্দ্র দাশের কাজ দেখে একদিন তাকে প্রস্তাব দেন শ্রীমঙ্গলে তার মিলটি চালু করে দিতে। বিনিময়ে তিনি তার নায্য পাওনা দিবেন। উনার জীবনের বড় একটি গুণ হলো তিনি মানুষকে সহজে না করতে পারতেন না। আহমদুর রহমান খাঁ এর প্রস্তাবে তিনি রাজী হয়ে যান। চলে আসেন শ্রীমঙ্গলে। শ্রীমঙ্গল ভানুগাছ রোড ১০নং এলাকায় স্থাপন করেন তেলের মিল। এখানে কাজ করে করে এক সময় তার চাকুরী হয় শ্রীমঙ্গল চিত্রালী সিনেমা হলের অপারেটিং সিস্টেম এর প্রধান পর্যবেক্ষক হিসেবে। তখন তিনি পরিবার নিয়ে আসেন শ্রীমঙ্গলে। সময়টা ১৯৬৯ ইংরেজী। শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামীলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শহীদ হোসেন ইকবালের পিতা হোসেন মিয়ার বাসা ভাড়া নেন। ওই সময় শ্রীমঙ্গল ফিনলে চা বাগানের একটি মেশিন নষ্ট হয়ে যায়। ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার ছিলো বাগানে। তিনি বহু চেষ্টা করেও তা ঠিক করতে পারছিলেন না। এক সময় শহরের ভালো ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কেউ একজন চা বাগানে কয়েছ চৌধুরীর কাছে তার নাম প্রস্তাব করে। কয়েছ চৌধুরী আসেন তার খোঁেজ। মেশিন নষ্ট হওয়ার বিষয়টি তাকে খোলে বলেন। তিনি ঠিক করে দেয়ার জন্য বরাবরই রাজী হয়ে যান। বাগানে গিয়ে তিনি সমস্যা খোঁজে পান মোটরে। বিশাল বড় মোটর খোলে দেখেন এর ভিতরে কন্টোলার জ্বলে গেছে। আর এ রাতে কন্টোলার পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এদিকে এটি চালু না হলে চা বাগানের হাজার হাজার কেজি চা নষ্ট হয়ে যাবে। চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন বাগান কৃর্তপক্ষ। এ সময় গোপেন্দ্র দাশকে কিছু একটা করার জন্য কয়েছ চৌধুরী অনুরোধ করেন। গোপেন্দ্র দাশ কন্টোলার ছাড়া ডায়রেক্ট করে তিনি এটা চালু করে দেন এবং রক্ষা পায় লক্ষ লক্ষ টাকার চা। এ কাজে বেড়ে যায় তার সুনাম। এর পর থেকে প্রয়োজন হলেই ডাক পড়তো তার। তখন চা বাগানের বালিশিরা ক্লাবে ছিলো নিজস্ব সিনেমা হল। প্রতি রবিবার ইংলিশ ম্যানেজাররা ঢাকা থেকে ফ্লিম এনে তা দেখতেন। এক সময় ওখানে দেখা দেয় লোক সংকট। ফিনলে কর্তৃপক্ষ গোপেন্দ্র দাশকে প্রস্তাব দেন একদিন বালিশিরা ক্লাবে হল পরিচালনার জন্য। বরাবরই তিনি রাজী। বাড়তে থাকে তার আয় রোজগার। ইংরেজরা ঢাকা থেকে সিনেমা এনে তাকে দিতো আর তিনি তা দেখাতেন।
পরবর্তীতে ঢাকা থেকে সিনেমা আনা ও বালিশিরা হল চালানোর সমস্ত দায়িত্ব তারা তাকে দিয়ে দেয়। এর বিনিময়ে সপ্তাহে ৭/৮ হাজার টাকা পেতেন। আর খরচ হতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।
গোপেন্দ্র দাশ এতেই থেমে থাকেননি। তিনি আরো কিছু করার চিন্তায় বিভোর থাকতেন। একসময় তার চোখে পড়ে শ্রীমঙ্গল শহরে পরিত্যক্ত পৌর অডিটরিয়ামটি। বর্তমান মহসীন অডিটরিয়াম কাম কমিউনিটি সেন্টার।
গোপেন্দ্র দাশ জানান, ওই জায়গাটি একজন ইংরেজের গরুর ফার্ম ছিলো। ওই ইংরেজ ইংলেন্ডে ফিরে যাওয়ার সময় ঘর সহ জায়গাটি শ্রীমঙ্গল পৌরসভাকে দিয়ে যায়। পরবর্তীতে পৌরসভার কাছ থেকে সন্তোষ বাবু নামে এক লোক এটি ভাড়া নিয়ে রানী ভিক্টোরিয়ার নাম সিনেমা হলের নাম করণ করে এটি পরিচালনা করতেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা থেকে ফিল্ম নিয়ে আসার সময় ভৈরবে ট্রেনে তাকে কেটে টুকরা টুকরা করে ভৈরব নদীতে ফেলে দেয়। এর পর সন্তোষ বাবুর অল্প বয়সী স্ত্রী সিনেমা হলটি পরিচালনার না করতে পেরে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এক সময় স্থানীয়দের পরামর্শে সন্তোষ বাবুর বিধবা স্ত্রী তাদের সিনেমা হলের অপারেটর হারাধন বোসকে বিয়ে করেন। কিছু দিন পর হারাধন বোস সিনেমা হল বন্ধ করে ভারতে চলে যান। এর পর থেকে বন্ধ হয়ে যায় ভিক্টোরিয়া সিনেমা হল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই সিনেমা হলটি চালু করার জন্য মনে মনে অভিপ্রায় জাগে গোপেন্দ দাশের। তিনি এ জন্য সহায়তা নেন তৎকালীন শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার মছব্বির মিয়ার। মছব্বির মিয়া তাকে নিয়ে যান পৌরসভার চেয়ারম্যান মছব্বির মিয়ার এর কাছে। পৌর চেয়ারম্যান মছব্বির তা লিজ দিতে রাজী হন তবে তাকে ওই দিনই ৫০ হাজার টাকা দিতে বলেন। তিনি ওই দিনই তার মায়ের হাত দিয়ে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি একটি চুক্তিনামা করেন। এ সময় সাহায্যকারী মছব্বির কমিশনার বলেন, তার বিনিময়ে তিনি এটি পেয়েছেন তাকে ৫০ হাজার টাকা দিতে তিনি তাকেও ৫০ হাজার টাকা দেন। চারজন কমিশনারের সাক্ষীতে হলটি তাকে লিজ দেন পৌর চেয়ারম্যান মছব্বির। তিনি বুঝে নিয়ে বেশ কিছু টাকা খরচ করে সিনেমা হল ঠিকঠাক করেন। সিনেমা হল উদ্বোধনের জন্য মৌলভীবাজার এসডিওকে নিমন্ত্রণ করেন। কিন্তু যেদিন এটি উদ্বোধন করবেন ঠিক পূর্ব মুহুর্তে সাক্ষী না দেয়া পৌরসভার বাকী কমিশনাররা এসডিও এর কাছে অভিযোগ করেন তা অবৈধভাবে উনি নিয়েছেন। এ সময় এসডিও উদ্বোধন না করে ফিরে আসেন। ওই দিন তিনি তাদের অভিযোগের মিথ্যা মর্মে তিনি লিজ পাওয়া কাগজপত্র এসডিওকে দেখান পরে এসডিও এটি চালু করার অনুমতি দেন তবে তিনি উদ্বোধনে আর আসেননি। সে সময় বেশ কাঠখড় উপেক্ষা করে তিনি চালু করেন শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া সিনেমা হল। বাগানের ইলেকট্রিকের কাজ, প্রতি রবিবার বালিশিরায় সিনেমা হল পরিচালনা আর নিজের সিনেমা হল সব মিলিয়ে বেশ ভালোই চলে তার ব্যবসা। তবে তার পিছনে পড়া ওই শ্রেণী বেশ জোকের মতো লেগেছিলো। এটি মামলায় গড়ায় কিন্তু তাঁর কাগজপত্র ঠিক থাকায় মামলাটি সিলেট বটেশ্বর কোর্ট পর্যন্ত তাকে যেতে হয়। সব কোটেই রায় আসে তার পক্ষে। কিন্তু এরা পুনরায় বিরোধিতা করায় তিনি এক সময় দারস্ত হন খালেদা রব্বানী এমপির। তিনি স্থানীয়ভাবে বলে দেন তাকে কেউ ডিস্টাব না করার জন্য। পরে তিনি খালেদা রব্বানীর মাধ্যমে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানেরও দারস্ত হন। সাইফুর রহমানও তাকে সাহায্য করেন। এক সময় সাইফুর রহমান তাকে ডেকে বলেন, এদের উৎপাত ভবিষতেও হতে পারে এর চেয়ে আপনি দেখেন অন্য কোথাও জায়গা পাওয়া যায় কিনা দেখতে। তখন সাইফুর রহমানের কাছে তিনি ৬ মাস সময় চান। সাইফুর রহমান ৬ মাসের পরিবর্তে ১ বছর সময় দেন। এরপর সাইফুর রহমান সবাইকে ডেকে বলে দিলেন এক বছর তাকে ডিস্টাব না দিতে উনি অন্যত্র চলে যাবেন। এ সময় তিনি শ্রীমঙ্গল সেন্টাল রোডে জায়গা কিনে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন নিউ ভিক্টোরিয়া সিনেমা হল। তিনি সিনেমা হল ছেড়ে দেয়ার পর এটি হয় পৌর টাউন হল যার নাম দেয়া হয় শহীদ সমীর জনমিলন কেন্দ্র।
এর কিছুদিন আগে তিনি আখাউড়ায় আরেকটি সিনেমা হল চালু করেন। গোপেন্দ্র দাশ জানান, আখড়াউড়া মায়াবি সিনেমা হলটি মেশিনের ডিস্টাবে বন্ধ করে দেন মালিক। তিনি দক্ষ অপারেটর এবং ভালো কাজ জানেন তাই আখাউড়া থেকে জনৈক ব্যক্তি তাকে অনুরোধ করেন বন্ধ থাকা আখাউড়া মায়াবী সিনেমা হলটি ভাড়া নিয়ে চালাতে। তাঁর কথা মতো তিনি মায়াবী সিনেমা হলটি ভাড়া নেন। কিন্তু মেশিন ঠিকটাক করে যখন সিনেমা হল চালু করেন তখন দেখা দেয় বিপত্তি। চালু মেশিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিনই দর্শকদের সাথে ঝগড়া হতো। মেশিন বন্ধ করে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়তো মধ্য রাতে আপনা আপনি মেশিন চালু হয়ে যেতো। এ সময় আগের মালিক আদর আলী সরদারের সাথে যোগাযোগ করলে ওই মালিক জানান, ওই কারণেই তিনি সিনেমা হল বন্ধ করে দিয়েছিলেন। গোপেন্দ্র দাশ দুশ্চিন্তায় পড়েন। ইতিমধ্যে ওখানে অনেক টাকা ইনভেস্ট হয়ে গেছে। এ সময় তিনি নিজের গ্রাম অন্তহরীতে আসা ইনানগরের এক সাধুর স্মরণাপন্ন হন। ওই সাধু বলেন এটি শ্মশান ও কবরের উপরে পড়েছে। তিনি তাকে সেখানে শ্মশানকালীর পূজা করার পরামর্শ দেন এবং ৪টি তাবিজ দেন। তার কথা মতো গোপেন্দ্র দাশ ওই জায়গার চার কোনায় ৪টি তাবিজ ও পাঠা বলি দিয়ে কালী পূজা করেন এবং ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন যেন তিনি এ বিপদ থেকে রক্ষা পান। কালী পূজার পর দিন থেকে হল চালু হয়। এর পর আর কোন দিনই ওই সমস্যা দেখা দেয়নি। ওই সিনেমা হল থেকে তার প্রচুর আয় আসে। কয়েক বছর পর তিনি আখাউড়াতে অন্যত্র জমি ক্রয় করে নিজস্ব জমিতে সিনেমা হল স্থানান্তরিত করেন এবং নাম দেন অনুরাহ সিনেমা হল।
আখাউড়ায় যখন তিনি ভালোমানের সিনেমা হল করেন তখন কুটি থেকে অনেকে আখাউড়া এসে সিনেমা দেখতেন। এ সময় কুটিতে একটি সিনেমা হল করার জন্য তার পাশের বাসার জনৈক ব্যক্তি প্রস্তাব দেন। তিনিও আশ্বস্ত করেন চেষ্টা করবেন। পরে তাকে নিয়ে তিনি কুটিতে কয়েক দিন ঘুরে একটি পাটের গোদাম ১০ বছরের জন্য লিজ নেন। ৪/৫ লাখ টাকা খরচ করে তিনি সিনেমা হল তৈরি করেন। কিন্তু অনুমোদন নিয়ে দেখাদেয় জটিলতা। তখন স্থানীয় গোটা কয়েক মানুষের প্ররোচনায় এর বিপক্ষে অবস্থান নেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দু মিয়ার। তিনি জেলা প্রশাসককে না করে দেওয়ায় জেলা প্রশাসক সিনেমা হল চালুর অনুমতি দিচ্ছিলেন না। এক সময় স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ কুটিতে এক বাসায় তিনি ভোজের আয়োজন করেন সে ভোজে শহরের বিশিষ্ট সকল ব্যক্তি এবং এমপি আব্দু মিয়াকেও দাওয়াত দেন। ওই দিন সবাই মিলে আব্দু মিয়াকে রাজী করান এবং আব্দু মিয়া জেলা প্রশাসককে অনাপত্তিপত্র দিলে জেলা প্রশাসক অনুমতি দেন। শ্রীমঙ্গল ও আখাউড়ার চেয়ে কুটিতে তিনি ব্যবসায়ীক সফল হন বেশি। কিন্তু এটি তার জন্য বিপত্তি হয়ে দাড়ায়। এটি দেখে হলের ভূমির মালিক তাকে উঠে যেতে চাপ দেয়। এক পর্যায়ে তিনি ভাড়াটে ব্যবহার করেন। কিন্তু গোপেন্দ্র দাশও নাছোরবান্দা। অন্যায় এর কাছে মাথা নত করার মানুষ তিনি নন। সিনেমা চলাকালে ভাড়াটেরা অযথা উৎপাত করতো সে সময় তিনিও কৌশলে তা সামাল দেন। এক সময় তিনি কসবা থানা পুলিশের সহায়তা নেন। শো চলাকালীন সময়ে পুলিশ আসতো আবার শেষ হলে তিনি তাদের গাড়ি দিয়ে কসবা পৌঁছে দিতেন। এভাবে অনেক দিন চলার পর তিনি নিজে জায়গা নেন এবং নিজের জায়গায় তার সিনেমা হল স্থানান্তরিত করেন। বাড়ি থেকে শূন্য হাতে বেড়িয়ে আসা গোপেন্দ্র কুমার দাশ তখন ৩টি সিনেমা হলের মালিক শ্রীমঙ্গল, আখাউড়া ও কুটিতে অনেকগুলো ভিটা বাড়িরও মালিক। নিজের গ্রামে ক্ষেতের জমি কিনেছেন অন্তত ৫শত বিঘা। এটি তার সফলতার গল্পের সার সংক্ষেপ যার বাস্তবতা আরো বিস্তর।
জীবন সংগ্রামে সফল এ মানুষটি যেমন আয় করেছেন তেমনি সমাজের জন্য চোখ বন্ধ করে দু’হাতে খরচ করেছেন। তার ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার গল্প তার এ সংগ্রামী জীবনের গল্পের চেয়েও কম নয়। মানবিক কর্মকাণ্ডে তার অসংখ্য অবদানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আখাউড়া শহীদ স্মৃতি কলেজ। গোপেন্দ্র দাশ জানান, তিনি যখন আখাউড়ায় রমরমা ব্যবসা করছিলেন তখন আখাউড়া শহীদ স্মৃতি কলেজটি অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে। তখন তিনি এটি চালু রাখতে তার সিনেমা হলের প্রতি টিকেটের ৪ আনা (২৫ পয়সা) কলেজ ফান্ডে দান করেন। যত বছর সিনেমা হল চলেছে তিনি তা দিয়ে গেছেন। তার মতে তৎকালীন সময়ে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে দিতে পেড়েছেন। ওই টাকা দেয়াতে আর কলেজ বন্ধ হয়নি। এখন ওই এলাকার নামকরা কলেজ এটি। বহু শিক্ষার্থী সেখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন। তিনি আখাউড়া সার্বজনীন শ্মশানঘাট তৈরি করে দেন। সহায়তা করেন বহু মন্দিরে ও মসজিদে। এর মধ্যে ওই সময়ে ৫ লক্ষ টাকা দিয়ে আখাউড়া থানা মসজিদটি তিনি এককভাবে করে দেন। তার আরো একটি উল্লেখযোগ্য অবদান হলো আখাউড়া রাধামাধবের আখড়া প্রতিষ্ঠা। আগরতলা রাজার প্রতিষ্ঠিত রাধামাধবের আখড়াটি অনেকে দখল করে রাখেন। স্থানীয় সনাতনীদের দাবীতে তিনি রাধামাধবের মন্দিরের বহু জায়গা পুনরুদ্ধার করে সেখানে দৃষ্টিনন্দন মন্দির করে দেন। তিনি জানান, জায়গা উদ্ধার করতে গিয়ে ওখানে বসবাস করা মানুষদের স্থানান্তরিত করতে গিয়ে তাদেরকে নগদ অর্থ দিতে হয়েছে। নিজের টাকা দিয়ে দখলদারদের অন্যত্র প্রতিস্থাপন করে মন্দিরটিকে নিরবিচ্ছিন্ন করেন। তিনি জানান, মন্দিরটি চালু করে ওখানে একটি কমিটি করে তাদের হাতে সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে আসেন। তবে মন্দিরের জন্য খনন করা বড় বড় দুটি দিঘী ( রাজার দিঘী ও রাণীর দিঘী) উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রাধামাধবের আখড়া ছাড়াও তিনি আখাউড়ায় আরো বিভিন্ন ধমীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তার হাত বাড়ান। এ ব্যপারে কথা হয় আখাউড়ার গণমাধ্যমকর্মী জুটন বনিকের সাথে তিনি জানান, আখাউড়ায় গোপেন্দ্র দাশের অনেক উদ্যোগ আছে। তিনি ছোট বেলায় সিনেমা হলের টিকেটে লিখা দেখেছেন কলেজের নামে ২৫ পয়সা লিখা।
একইভাবে কুটিতেও তিনি সার্বজনীন উদ্যোগে বহু প্রতিষ্ঠানে ও কর্মকান্ডে আর্থিক সহায়তা করেন। বহু কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার পাশে দাড়িয়েছেন পিতার ভূমিকা নিয়ে। বর্তমানে তিনি আখাউড়া, কুটির ব্যবসা গুটিয়ে এনে শুধু শ্রীমঙ্গলে ব্যবসা করছেন। তার সবগুলো সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেলেও। শুধু শ্রীমঙ্গল নিউ ভিক্টোরিয়া সিনেমা হলটি চালু আছে। শ্রীমঙ্গলের ধানসিঁড়ি এলাকায় পরিবার পরিজনকে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
শ্রীমঙ্গলের সামাজিক উদ্যোগ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রয়েছে তার প্রশস্ত হস্ত। তিনি শ্রীমঙ্গল বিরাইমপুর সার্বজনীন শ্মশানঘাটটি সর্বপ্রথম চালু করেন। শ্রীমঙ্গল শ্রীশ্রী শ্রীমঙ্গলেশ্বরী কালীবাড়ির পুকুর খনন ও ঘাট নির্মাণসহ, অফিস ঘর তৈরি করে দেন। শ্রীমঙ্গল জগন্নাথ মন্দিরের নাট মন্দির স্থাপনে নগদ ৫০ হাজার টাকা, রুপশপুর ইসকনের রথ, হবিগঞ্জের অনুকূল ঠাকুরের মন্দিরসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে সহায়তা করেন। তার গ্রামের বাড়ি অন্তেহরিতে একটি আখড়া স্থাপন করেন। অন্তেহরি পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাটি ভরাট, টিউবওয়েল ও বাথরুম করে দেন। মানুষের চলাচলের জন্য অসংখ্য নিচু রাস্তায় তিনি মাটির কাজ করে দেন। সর্বশেষ তিনি অন্তেহরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস ভবনটি করে দেন।
তার এই কর্মকান্ডের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি সম্মানিতও হয়েছেন। এর মধ্যে আখাউড়া থেকে চলে আসার সময় তাকে আখাউড়ার মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানায়। স্মৃতি হিসেবে তারা তাকে সোনার চাবি উপহার দেয়। গোপেন্দ্র দাশ জানান, আখাউড়া থেকে চলে আসার পর তিনিও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। আখাউড়ার স্মৃতি তার সারা জীবনের স্মৃতি। বর্তমান আকাশ সংস্কৃতির যুগে সিনেমা হল ব্যবসায় ছন্দপতন হলে তিনি আখাউড়া ছেড়ে আসেন।
বর্তমানে তিনি অনেকটা শারীরিকভাবে অসুস্থ। শ্রীমঙ্গলস্থ নিজ বাসায় অবসর জীবন অতিবাহিত করছেন। তিনি বর্তমানে বাসায় বসে শ্রীমঙ্গলের ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
৮ মে শ্রীমঙ্গলস্থ তাঁর বাসভবনে দীর্ঘ আলাপচারিতায় এ প্রতিবেদকের কাছে তার জীবন সংগ্রাম ও এর সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদি তুলে ধরেন।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •