হাকালুকিতে ধানের পর মরছে মাছ ও হাঁস দুর্গন্ধে ভারি হয়ে উঠে হাওরের বাতাস গো খাদ্যের চরম সংকট

April 21, 2017,

হোসাইন আহমদ॥ ধানের পর এবার হাকালুকি হাওরে মারা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও হাঁস। এক মাসের ব্যবধানে কৃষকরা হারিয়েছেন বোরো ধান, মৎস্যজীবিরা মাছ ও খামারের মালিকরা হাঁস। ওই অঞ্চলে গো খাদ্যেরও চরম সংকট দেখা দিয়েছে। হাকালুকি হাওর পাড়ের কৃষক এবং জেলে পরিবারে চলছে এখন হাহাকার।
কৃষকরা বাড়িতে পালা গরু/ছাগল নিরাপদের জন্য এলাকা থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। অধিকাংশ কৃষকরা কম মূল্যে গরু/ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন। বাতাসের দুর্গন্ধ ও হাওরের খাবার খেয়ে গরু অসুস্থ হতে পারে এমন আসষ্কা বিরাজ করছে তাদের মাঝে।
এলাকার জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে জেলে কৃষকসহ খেটে খাওয়া মানুষজনরা জানিয়েছেন, এতো বড় হাওরে মাছ মরে হাওর শূন্য হয়ে পড়ছে। কিন্তু মাছ বাঁচানো বা এথেকে রক্ষা পেতে মৎস্য বিভাগের উল্লেখযোগ্য কোন তৎপরতা তাদের চোখে পড়েনি।
প্রায় ৬দিন ধরে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট ও বড় মাছ মরে পানিতে ভেসে উঠছে। কি কারণে মাছগুলো মারা যাচ্ছে তা জানা যায়নি। তবে স্থানীয়রা ধারণা করছেন, বৃষ্টির কারণে হাওরের বোরো ধান থেকে কীটনাশক পানিতে ছড়িয়ে পড়ার কারণে হয়তো মাছগুলো বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে। এদিকে মাছ কেন মারা যাচ্ছে সেবিষয়ে জেলা বা উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে কোন সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি। তারা বলেন, ধারণা করা হচ্ছে বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার কারণে সেই পঁচা ধানের দুর্গন্ধ, জমিতে প্রয়োগ করা কিটনাশক ও বিভিন্ন ধরনের স্যার প্রয়োগের কারণে মাছ মারা যাচ্ছে।
এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির সীমানা মৌলভীবাজার জেলা ছাড়িয়ে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত। ৫টি উপজেলা (কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ) জুড়ে ২৩৮টি বিল নিয়ে এ হাওরের আয়তন ২০ হাজার ৪ শ‘ হেক্টর। এই হাওরে যেমন ধানও জন্মে তেমনি পাখি ও মাছের বিশাল অভয়াশ্রম।
সাদীপুর গ্রামের বেলাল মিয়া (৪৫) ও স্থানীয় পাইকারী মৎস্যজীবী মর্তুজা আলী (৪২) জানান, গত ৬দিন আগে রাতে খুব বেশী বৃষ্টিপাত হয়। এরপর থেকে হাওরে শোল, গজার, বোয়াল, বাইম, পুঁটি, কালি বাউস, বাউস ইত্যাদি হাজার হাজার মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠছে। স্থানীয় কৃষক ও জেলেরা হাওরে গিয়ে এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতিদিনই হাওরের পানিতে ছোট-বড় মাছ ভেসে উঠছে। হাওরের পানি ময়লা-আবর্জনাযুক্ত হয়ে পড়েছে। পানির উপরে আবছা লাল ও কালো রঙের স্তর দেখা যাচ্ছে।
এদিকে হাওর পাড়ের গ্রামের লোকজন জানান, রাতের বেলা একপ্রকার দুর্গন্ধও বাতাসে ভেসে এসে পরিবেশ দূষিত করছে। এর আগে তাঁরা এধরণের পরিস্থিতিতে পড়েন নি। ৫০/৬০ বছর বয়সের অনেক কৃষক বলেন, অনেক বার বয়াবহ বন্যা দেখেছি কিন্তু এরকম এক সাথে ধান, মাছ ও হাস মারা যেতে দেখিনি। এটা মনে হয় আল্লাহর গজব।
মাছ মরার কারণে কয়েকদিন ধরে স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে মাছ ওঠছে না। কিছু কিছু মাছ বাজারে উঠলেও ভয়ে কেউ মাছ কিনছে না। বর্তমানে হাওরে জেলেরা মাছ ধরছেন না বলে জানালেন স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
তবে ১৮ এপ্রিল মঙ্গলবার ও বুধবার হাওরের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার বিভিন্ন অংশে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে চুন ফেলতে দেখা গেছে। বিশাল হাওরের তুলনায় এগুলো কিছুই না বলে স্থানীয়রা জানান।
ভুককশিমইল ইউনিয়নের ইমরুল কায়েছ বলেন, বাতাসের দুর্গন্ধের কারণে বাড়িতে থাকা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ আসছে। এটা স্বাভাবিক পর্যায়ে না আসলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
এদিকে ভুকশিমইল ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড সদস্য আনফর আলী মধু (৫৫) জানান, ৬ দিন ধরে হাওরে অজ্ঞাত কারণে মাছ মারা যাচ্ছে। কিন্তু মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে তাঁর সাথে কেউ কথা বলেনি বা এলাকার কারো সাথে কথা বলতে তিনি দেখেন নি।
এবিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শফিকুজ্জামান জানান, তিন উপজেলার জন্য সরকারি ভাবে ৩ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। আমরা ইতি মধ্যে হাকালুকিতে চুন প্রয়োগ করেছি। বুধবার থেকে মাছ মরা বন্ধ হয়েছে। আশকরা যায় এটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com