সিলেট রুটের ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির দখলে, কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রেনের সব টিকিট উধাও

October 11, 2025,

মাহফুজ শাকিল : সিলেট রুটে ভোগান্তির অপর নাম ট্রেনের টিকিট পাওয়া। এ যেন সোনার হরিণ। অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দালালদের কাছ থেকে মিলছে সকল ট্রেনের টিকিট। এসব কালোবাজারি বন্ধে রেলওয়ের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোন প্রদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। সিলেট-আখাউড়া রেলপথে সকল ট্রেনের টিকিট নিয়ে এখন চলছে কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য। কালোবাজারিদের খপ্পড়ে পড়েছেন ট্রেনযাত্রীরা। এতে যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।

অতিরিক্ত টাকা দিলেই কালোবাজারিদের কাছ থেকে সহজে মিলছে টিকিট। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালে অনলাইনে টিকিট নিতে বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ১০ দিন আগে টিকিট অবমুক্ত করলেও দুই থেকে তিন মিনিটের ভিতরে উধাও হয়ে গেছে সকল ট্রেনের টিকেট। যাত্রীরা কেউই টিকিট কাটতে পারেননি। সকাল ৮টার পরপরই রেল সেবা অ্যাপে প্রবেশ করলে দেখা যায় “সার্ভার ব্যস্ত”। মাত্র দুই-তিন মিনিট পর সার্ভার সচল হলে দেখা যায়, সব ট্রেনের সকল আসন শূন্য। ৩ যাত্রীদের প্রশ্ন “এটা কি করে সম্ভব? এর পেছনে কারা জড়িত?” টিকিট না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে ক্ষোভ ঝেড়েছেন। এসব বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন সিলেট অঞ্চলের ট্রেন যাত্রীরা।

খোদ কুলাউড়া জংশনের স্টেশন মাস্টার রোমান আহমদ এই ঘটনায়ও হতবাক হয়েছেন। প্রশ্ন রেখে বলেন, এটা কি করে সম্ভব। টিকিট না পাওয়া মানুষের ভোগান্তির খবর শুনে তিনি নিজেই অনলাইনে ঢুকে কোন টিকেট কাটতে পারেননি।

সিলেট-ঢাকা রেলপথে ট্রেনে নিয়মিত চলাচলকারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ আলাউদ্দিন আল আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি সপ্তাহে দুইদিন ঢাকা থেকে কুলাউড়া এসে চেম্বারে রোগী দেখেন। ইদানিং সিলেট-ঢাকা যাওয়া আসার জন্য কোন টিকেট পাওয়া যাচ্ছে না। টিকেট পাওয়া যেন সোনার হরিণ হয়ে গেছে। অনলাইনে টিকিট ক্রয়ের জন্য বুধবার সকাল ৮টা ২ মিনিটে রেল সেবা অ্যাপে প্রবেশ করি। কিন্তু ঢাকাগামী কোন ট্রেনের টিকেট পাইনি। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যায় ব্ল্যাকারের মাধ্যমে এক হাজার টাকার বিনিময়ে টিকেট পাই। এভাবে কতদিন চলবে। ব্ল্যাকারদের কারণে যাত্রীদের বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। আমি মনে করি এর পেছনে টিকেট কালোবাজারি সিন্ডিকেট চক্র কাজ করছে। এ থেকে আমরা সকল যাত্রীরা পরিত্রাণ চাই।

সাউথ ইস্ট ব্যাংক কুলাউড়া শাখার অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার সুয়েবুর রহমান জরুরিভাবে ঢাকা যাওয়ার প্রয়োজনে ব্ল্যাকারদের দ্বারস্থ হয়েও সমাধান পাননি। ব্যবসায়ী হারুন আহমদ জানালেন, চিকিৎসার জন্য যেতে হচ্ছে ঢাকা। কালনী এক্সপ্রেসের সাড়ে ৩৫০ টাকার টিকিট কিনতে হয়েছে এক হাজার টাকায়। কিন্তু ‘টিকিট যার ভ্রমণ তার’ নীতির কারণে ব্ল্যাকারদের কাছ থেকে পাওয়া টিকিট নিয়েও রয়েছে জরিমানার ঝুঁকি। একদিকে অনলাইনে টিকিট মিলছে না অন্যদিকে ব্ল্যাক মার্কেটের টিকিট নিয়ে কমলাপুরে হয়রানির শিকার হতে হয়, ফলে ক্ষোভ এখন তুঙ্গে।

চৌধুরী নজরুল নামের একজন যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসুবকে লিখেন, কি ভয়ংকর একটা অবস্থা রাত ১২টার পরে এবং সকাল ৮টায় অনলাইনে ঢুকলে দেখা যায় সব টিকিট শেষ এটা কোন কথা। দশ দিন আগে টিকিট দেয় তারপরও টিকিট মিলেনা। সব চলে যায় ব্ল্যাকারদের হাতে বেশিরভাগ ট্রেনের টিটিরা এসব কাজে জড়িত।

যাত্রীরা মনে করছেন, টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেট চক্রটি হয়তো বা বিশেষ কোন পদ্ধতির মাধ্যমে সকল ট্রেনের টিকিট নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্লক করে রেখে দেয় যাতে করে সাধারণ যাত্রীরা রেলসেবা অ্যাপসে ঢুকে টিকিট কাটতে না পারে। ওই সুযোগে চক্রটি সব টিকিট কেটে রাখে পরে ওই টিকিটগুলো অতিরিক্ত দামে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে। যাত্রীরাও বাধ্য হয়ে টিকিট ক্রয় করছেন। টিকিট নিয়ে গোটা সিলেট অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। ব্ল্যাকার সিন্ডিকেটের সাথে রেল বিভাগের এক শ্রেণির অসাধু লোক জড়িত থাকতে পারে। যাত্রীদের দাবি “ব্ল্যাক মার্কেটিং রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং সিস্টেমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে রেল কর্তৃপক্ষসহ প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে।

দৈনিক ইত্তেফাকের কমলগঞ্জ প্রতিনিধি নুরুল মোহাইমিন মিল্টন ফেসবুকে লিখেছেন, শমসেরনগর স্টেশনে ১০ দিন আগে অনলাইনে টিকিট সকাল ৮টায় মুহূর্তেই শেষ করে ফেলে কালোবাজারি চক্র। পরে সেগুলো বিক্রি হয় দ্বিগুণ-তিনগুণ মূল্যে। সিলেট, শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনেও একই চিত্র। স্থানীয়রা দাবি করছেন, পর্যটন বগি সংযোজন, আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, অনলাইন টিকিটিংয়ে স্বচ্ছতা ও কালোবাজারি রোধের মধ্য দিয়েই পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব।

কুলাউড়া জংশনের স্টেশন মাস্টার রোমান আহমদ বলেন, প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলের সিলেট-রেলপথে চলছে ৬ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন। এতে ১২-১৫ হাজার যাত্রী সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রামে যাতায়াত করেন। চাহিদার তুলনায় প্রতিটি ট্রেনে আসন সংখ্যা অনেক কম। বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সিলেট-ঢাকা, সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করেন এক হাজার দুইজন যাত্রী। মাসিক ৩০ হাজার ৭০ জন যাত্রী চলাচল করেন। যাত্রীদের কাছ থেকে শুধু সেপ্টেম্বর মাসে আয় রেলের আয় ৪৯ লাখ ২৮ হাজার ৬৩৩ টাকা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরিফ বৃহস্পতিবার বিকেলে মুঠোফোনে  বলেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সকল ট্রেনের টিকিট অনলাইন ও কাউন্টারে অবমুক্ত করা হয়। সিলেটের যাত্রীদের টিকিট চাহিদা অনেক বেশি এটা সত্য। সেই চিন্তা থেকে রেলওয়ের পক্ষ থেকে পারাবত ট্রেনে দুটি বগি, বাকি সবক’টি ট্রেনে একটি করে বগি সংযুক্ত করা হয়েছে। দুই-তিন মিনিটের মধ্যে কিভাবে রেলসেবা থেকে অনলাইন টিকিট উধাও হচ্ছে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অতিদ্রুত অনলাইন টিকিট কাটায় রেলসেবা প্রতিষ্টান সহজ.কম কর্তৃপক্ষের গাফিলতি থাকলে তাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে। এ বিষয়ে তারা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

টিকিট কালোবাজারি বন্ধে কোন প্রদক্ষেপ নেয়া হবে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্টেশনে অভিযান চলমান আছে। প্রতিটি স্টেশন এলাকার জেলা প্রশাসনকেও বলা হয়েছে কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার জন্য। এক্ষেত্রে যদি রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টিকিট সিন্ডিকেট চক্রের সাথে জড়িত থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে সিলেট-ঢাকা রুটে রেললাইন সংস্কার, আসনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন দুটি বিশেষ ট্রেন চালুসহ ৮দফা বাস্তবায়নের দাবিতে সিলেট অঞ্চলে গত আগস্ট মাসে শুরু হয় আন্দোলন। আট দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদ কুলাউড়ার উদ্যোগে প্রথম আন্দোলন শুরু হলেও পরবর্তীতে গোটা সিলেট জুড়ে এই আন্দোলন বিস্তৃতি লাভ করে। ধারাবাহিকভাবে, কুলাউড়া, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, ভাটেরা, টিলাগাঁও, লংলা স্টেশনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর কুলাউড়া জংশন স্টেশনে আট দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করা হয়। এসময় বিক্ষুব্দকারীরা চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেন প্রায় আধা ঘন্টা আটকে রাখে। ট্রেন আটকের খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও রেলওয়ে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন। একপর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনের মাধ্যমে রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরিফের সাথে আন্দোলনকারীদের মুঠোফোনে কথা হয়। এসময় ৮দফা দাবির বিষয়টি রেলের উর্দ্বতন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরিফকে অবহিত করেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আতিকুর রহমান আখই। মুঠোফোনে আলোচনার একপর্যায়ে রেলের উর্দ্বতন কর্মকর্তা ১৫ দিনের মধ্যে দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন আন্দোলনকারীরা।

আট দফা দাবি আদায় আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম বলেন, সিলেটে রেলের যাত্রীদের টিকিটের চাহিদা অনেক বেশি। প্রতিবছর শুধু সিলেট থেকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি ট্রেনের আসন সংখ্যা দেয়া হয়েছে খুবই সীমিত। প্রতিটি ট্রেনে টিকিট বৃদ্ধিসহ ৮দফা দাবিতে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের দাবি না মেনে নেয় তাহলে আগামীতে কঠোর আন্দোলন করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com