মৌলভীবাজারের সাংবাদিকদের নিয়ে কালবেলায় কাল্পনিক সংবাদ, নিন্দার ঝড়

স্টাফ রিপোর্টার : মৌলভীবাজারের সুনামধন্য সিনিয়র সাংবাদিকদের নিয়ে কালবেলায় প্রকাশিত উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিমূলক সংবাদে জেলা জুড়ে নিন্দার জড় বইছে। তাদের এমন মনগড়া মানহানিকর অপসাংবাদিকতায় জেলার গণমাধ্যমকর্মীরা হতবাক। এঘটনায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রেসক্লাব ও অন্যান্য সংগঠনের পক্ষ থেকে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।
তারা ক্ষোভের সহিত জানান এই কাল্পনিক সংবাদ প্রত্যাহার এবং এই সংবাদ প্রকাশে সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের নি:শর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। তা না হলে জেলায় কালবেলা অবাঞ্চিত করাসহ মানহানির মামলা দায়ের করা হবে। তাছাড়া এই দাবি আদায় না হলে রাজপথে আন্দোলনে নামবেন জেলার গণমাধ্যমকর্মীরা।
জানা যায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার চাতলাপুর ব্রিজ বাজার এলাকায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সমাবেশ শেষে, সেখানে স্থানীয় ও জেলার কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে দৈনিক কালবেলার মাল্টিমিডিয়ার রুমেল আহমেদ নামের জনৈক এক সাংবাদিকের সাথে জেলার সাংবাদিকদের বাকবিতন্ডা ও শারিরিক লাঞ্চিত হওয়া ঘটনা তৈরি করে বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হলে এর প্রতিবাদে সোচ্ছার হোন জেলার গণমাধ্যমকর্মীরা। দৈনিক কালবেলা একটি পরিচিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকা। সেই পত্রিকাটির মাল্টিমিডিয়ার অনলাইন পেইজে কোন ধরনের সত্যতা ও যাচাই-বাছাই না করে জেলার সুনামধন্য ৬ জন সাংবাদিকদের ছবিসহ অন্যাদের নাম ও প্রতিষ্ঠানকে জড়িয়ে এক পেশে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। সেই নিউজগুলোতে ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে জেলার সিনিয়র সাংবাদিকদের একটি গ্রুপ ছবি ব্যবহার করা হয়। সেখানে শিরোনাম দেওয়া হয় ‘মৌলভীবাজারে কালবেলার সাংবাদিক রুমেল আহমেদের ওপর হামলা’। তাছাড়া ছবির ক্যাপশনে অভিযুক্ত বলে সম্বোধন করে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাফিয়া বলে জেলার সিনিয়র সাংবাদিকদের আখ্যায়িত করা হয়। এই খবরে ক্ষোভে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে জেলার সাংবাদিকসহ সুশীল সমাজে। এমন নিউজ প্রকাশের পর শুক্রবার ২৬ জুন রাতেই মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ জরুরী বৈঠকে বসে একটি প্রতিবাদ লিপি দিয়ে ঘটনাটি অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করায় এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবসহ জেলার অন্যান্য উপজেলা প্রেসক্লাব ও সাংবাদিকদের সংগঠনের নিন্দা ও প্রতিবাদ লিপিতে বলা হয় ২৬ জুন রাতে দৈনিক কালবেলা অনলাইনে প্রকাশিত ‘মৌলভীবাজারে কালবেলার সাংবাদিক রুমেল আহমেদের ওপর হামলা’ শীর্ষক সংবাদ এবং এর আগে ও পরে কালবেলার হেড অব মাল্টিমিডিয়া অমর্ত্য মালাঙ্গি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট (Amrita Malangi) থেকে পরিচালিত ধারাবাহিক প্রচারণা আমাদের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।
মূলত গত ২৬ জুন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারি ও মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের কুলাউড়া উপজেলার দত্তগ্রাম ও চাতলাঘাট এলাকায় সফরের সংবাদ সংগ্রহে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমের অসংখ্য সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে কালবেলার ঢাকা ভিত্তিক মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হোসাইন রুমেল (রুমেল আহমেদ) ও উপস্থিত ছিলেন। সফরে রবিরবাজার জামে মসজিদ নামাজ শেষে এনসিপি নেতারা মুজিবুর রহমানের কবর জিয়ারত করেন, পরে তার বাড়িতে ও চাতলাঘাট বাজারের পথসভায় অংশ নেন। এসময় রাজনৈতিক কর্মী, গণমাধ্যম কর্মী, স্থানীয় কিছু যুবক এবং মুরব্বিদের সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ তোলা নিয়ে হোসাইন রুমেলের (রুমেল আহমেদ) ভুল বোঝাবুঝি হয় বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানও হয়। ঘটনার আগে বা পরে কোনো ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু পরবর্তীতে হোসাইন রুমেল ক্লোজ সর্টে একটি ভিডিও ধারণ করেন। ওই ভিডিওতে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে একজনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ভাই আমাকে বাঁচান, আমাকে ওরা মেরে ফেলেছে।’ অথচ ভিডিওটিতে তিনি কারা তার ওপর হামলা করেছে, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন কিংবা ঘটনার প্রকৃত বিবরণ কী সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করেননি। এই ভিডিওটি কালবেলার হেড অব মাল্টিমিডিয়া অমর্ত্য মালাঙ্গি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট (Amrita Malangi) থেকে প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীতে সেটিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়।
এরপর অমর্ত্য মালাঙ্গি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মৌলভীবাজারের সাংবাদিকদের একটি গ্রুপ ছবি এবং ৬ জনের একত্রিত ছবি ব্যবহার করে একাধিক পোস্ট করেন। তারা হলেন এনটিভির স্টাফ করেসপনডেন্ট এস এম উমেদ আলী, একাত্তর টিভির জেলা প্রতিনিধি আহমেদ ফারুক মিল্লাত, চ্যানেল ওয়ানের জেলা প্রতিনিধি শাহজাহান মিয়া, নিউজ টোয়েন্টিফোরের জেলা প্রতিনিধি শেখ সিরাজুল ইসলাম, মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার মু. ইমাদ উদ-দীন, চ্যানেল ২৪-এর জেলা প্রতিনিধি আব্দুর রব, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি তুহিনুর রশীদ, ডিবিসি নিউজের জেলা প্রতিনিধি অনি চৌধুরী। ওই পোস্টেও গ্রুপ ছবির বাহিরে দৈনিক জনবানীর জেলা প্রতিনিধি পরে দৈনিক জনবানীর কুলাউড়া প্রতিনিধি জামাল হোসেন তারেকের নাম ও ছবি অপর একটি পোস্টে প্রকাশ করা হয়। এরা সবাই জেলায় দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। অমর্ত্য মালাঙ্গির ওই পোস্টগুলোতে তাদেরকে ‘মাফিয়া গ্রুপ’, চিহৃতসন্ত্রাসী’সহ বিভিন্ন আপত্তিকর অবমাননাকর শব্দে আখ্যায়িত করা হয়। এবং হুমকিমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত সম্মানহানিই হয়নি বরং তারা যে জাতীয় গণমাধ্যমে কর্মরত সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জনমনে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। পরবর্তীতে পোস্টগুলো একাধিকবার এডিট করা হয়। একের পর এক ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করা হয়।
একইভাবে হোসাইন রুমেল তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি (Hossain Rumel) থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মৌলভীবাজারের সাংবাদিকদের দায়ী করে একাধিক পোস্ট করেন। সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিগত ছবি ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে কালবেলা অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ একতরফাভাবে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। অভিযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট কোনো সাংবাদিকের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি, যা সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পরিপন্থী।
প্রতিবেদনে মৌলভীবাজার জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম শেফুলের বক্তব্যও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ‘তাদের বিরুদ্ধে আগেও এমন অভিযোগ আছে’ এ ধরনের কোনো বক্তব্য তিনি দেননি। তার প্রকৃত বক্তব্য ছিলো, সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা সত্য হলে তা অবশ্যই দুঃখজনক এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো। অথচ তার বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে প্রকাশ করা হয়েছে।
একইভাবে ডিবিসি নিউজের ডেপুটি নিউজ এডিটর মিঠুন বিশ্বাসের নামেও এমন একটি বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা তিনি কখনো প্রদান করেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়।
এ ছাড়া কালবেলার প্রতিবেদন এবং অমর্ত্য মালাঙ্গির ফেসবুকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রুবেল রানা নামের এক যুবকের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আমি দেখলাম একজনকে সবাই মিলে মারছে। পরে এগিয়ে যাই। তারা বলাবলি করছিল আরও মারবে। পরে আমিসহ কয়েকজন তাকে নিরাপদে সরিয়ে নিই।’ তবে রুবেল রানা এ ধরনের কোনো বক্তব্য কালবেলাকে দেননি বলে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। তার দাবি তার নাম ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি মনগড়া বক্তব্য যুক্ত করা হয়েছে, যা তাকে অযথা বিতর্কে জড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত ঘটনাকেও বিকৃত করেছে।
বিবৃতিতে তারা জানান আমরা সাংবাদিকের ওপর যেকোনো ধরনের হামলার নিন্দা জানাই এবং এমন ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত প্রত্যাশা করি। তবে অমর্ত্য মালাঙ্গি ও সংশ্লিষ্টদের এ ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মানহানিকর ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবি আমাদের। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের সাংবাদিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট জাতীয় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ঘটনায় সুবিচার নিশ্চিতসহ কালবেলার এই সংবাদ ও ফেসবুকের পোস্ট প্রত্যাহারের দাবী জানান জেলার সংবাদিক নেতৃবৃন্দ।



মন্তব্য করুন