মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ইতিহাস: পেট না কেটে সফলভাবে কৃত্রিম যোনিপথ তৈরি

সাইফুল ইসলাম : মৌলভীবাজারের চিকিৎসা ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে প্রথমবারের মতো ল্যাপারস্কোপিক পদ্ধতিতে পেট না কেটে জন্মগতভাবে জরায়ু ও যোনিপথ অনুপস্থিত ৩০ বছর বয়সী এক নারীর কৃত্রিম যোনিপথ তৈরির জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
১১ আগস্ট মঙ্গলবার রাতে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে এ অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জন্মগত শারীরিক জটিলতার কারণে ওই রোগীর জরায়ু ও যোনিপথ ছিল না। প্রচলিত পদ্ধতিতে এই ধরনের অস্ত্রোপচারে পেটে বড় ধরনের কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হলেও, আধুনিক ল্যাপারস্কোপিক প্রযুক্তির কল্যাণে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিরাপদে এই কৃত্রিম যোনিপথ তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় এই অপারেশন সফল হওয়ায় এটি জেলার স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
অস্ত্রোপচার সফলকারী চিকিৎসক ও অস্ত্রোপচার সফল করতে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তারা হলেন ডা. ফারজানা হক পর্না (স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন), এনেস্থেসিওলজিস্ট: ডা. আরশাদ, সহকারী চিকিৎসক: ডা. ইমরান (ডিউটি ডাক্তার) সহায়তাকারী স্টাফ মিস মনিকা (সিনিয়র স্টাফ নার্স), মি. মানিক (সিনিয়র ওটি স্টাফ), মি. রবিন (ডিপ্লোমা নার্সিং স্টুডেন্ট), মি. আবদুল্লাহ (সিনিয়র স্টাফ নার্স)।
চিকিৎসকদের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করে হাসপাতালের এনেস্থেসিওলজিস্ট ডা. শাহী আরশাদ জানান, “মৌলভীবাজার জেলায় এই প্রথম এবং সেটিও সরকারি হাসপাতালে এমন জটিল অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হলো। সাধারণ বাইরে এ ধরনের চিকিৎসায় প্রায় ৬ লাখ টাকার মতো ব্যয় হয়ে থাকে। এটি আমাদের পুরো চিকিৎসা দলের জন্য একটি অত্যন্ত গর্বের ও সফল অর্জন।”
ডা. শাহী আরশাদ আরও জানান, ৩০ বছর বয়সী এক নারীর জন্মগত বিরল সমস্যা (মেয়ার-রোকিটানস্কি-কুস্টার-হাউজার সিনড্রোম)-এর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে। এই সিনড্রোমে একজন নারীর স্বাভাবিক নারীসুলভ শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও কার্যকর ডিম্বাশয় থাকলেও জন্মগতভাবে জরায়ু ও যোনিপথ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অনুপস্থিত থাকতে পারে। ফলে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন নিয়ে তৈরি হয় শারীরিক ও মানসিক নানা সংকট। এই রোগীর ক্ষেত্রে পেটে বড় ধরনের কাটাছেঁড়া না করে কয়েকটি ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ল্যাপারোস্কোপ ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষতানির্ভর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নতুন যোনিপথ তৈরি করা হয়েছে। প্রচলিত ওপেন সার্জারির তুলনায় ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে ক্ষত ও ব্যথা তুলনামূলক কম, দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ এবং শরীরে বড় দাগ না থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। এই সফল অস্ত্রোপচার শুধু একটি বিরল জন্মগত সমস্যার চিকিৎসাই নয়—এটি একজন নারীর আত্মবিশ্বাস, দাম্পত্য জীবন ও ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ। দীর্ঘদিনের সংকোচ ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে তাঁর সামনে এখন খুলেছে স্বাভাবিক জীবনের নতুন দুয়ার। একই সঙ্গে এই সাফল্য দেশে আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক গাইনোকোলজিক্যাল সার্জারির অগ্রগতিরও একটি আশাব্যঞ্জক উদাহরণ।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, স্থানীয় পর্যায়ে এই ধরনের অত্যাধুনিক চিকিৎসাসেবা চালু হওয়ায় এখন থেকে এ অঞ্চলের রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকাসহ দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার দুর্ভোগ ও আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
মৌলভীবাজার হাসপাতালের এই সাফল্য ভবিষ্যতে আরও বড় ও জটিল অপারেশন সফল করার ক্ষেত্রে পথ দেখাবে।



মন্তব্য করুন