কমলগঞ্জে জীর্ণ ঘরে চা শ্রমিক সন্তানদের পাঠদান

June 28, 2025,

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি : কমলগঞ্জ উপজেলার সুনছড়া চা-বাগান। এখানকার একটি টিলার চূড়ায় টিনের ছাপড়া জীর্ণ একটি ঘরেই চলছে শতাধিক শিশুর পাঠদান। বাইরে বাঁশের খুঁটিতে ঝুলছে জাতীয় পতাকা, ভিতরে বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাগ করা দুটি ছোট কক্ষ এই হচ্ছে সুনছড়া চা-বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়।

স্থানীয়ভাবে এটি দেবলছড়া চা-বাগান নামেও পরিচিত। তিন হাজারের বেশি মানুষের এই বাগানে স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও স্থানীয়রা বলছেন, ১৯৪০ সাল থেকেই এখানে স্কুল ছিল; তবে সরকারি নথিপত্রে ১৯৮০ সাল উল্লেখ রয়েছে। বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা দেখে তা যে কতটা অবহেলার শিকার, তা বলাই বাহুল্য।

মৌলভীবাজারের ৬৯টি চা-বাগানে আছে এমন আরও অনেক স্কুল, যেখানে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। সরকার এসব স্কুলে শুধু পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে, নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শিক্ষা উপকরণ, বিশুদ্ধ পানি বা শৌচাগারের ব্যবস্থা। বিদ্যালয়গুলো কার্যত বাগান মালিকদের নামমাত্র তত্ত্বাবধানে চলছে।

শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, অন্যান্য গ্রামের তুলনায় চা-বাগানের শিশুদের উপস্থিতির হার ভালো হলেও মানসম্পন্ন শিক্ষার ঘাটতি স্পষ্ট।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, চা-বাগানগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার করুণ চিত্র নিয়ে আমরা বহুবার আন্দোলন করেছি, স্মারকলিপি দিয়েছি, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আজও দেখা যাচ্ছে না।

এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দাদা-পরদাদারা যেমন ছিল, আমরাও তেমনি। এখন সন্তানরাও কোনো উন্নতি ছাড়া বড় হচ্ছে। মৌলিক অধিকার বলে কিছুই নেই আমাদের কপালে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিটুন কুর্মী জানান, এখানে ১৯২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে আছি মাত্র ৩ জন শিক্ষক। একজন চা-শ্রমিকের সমান মজুরি প্রতিদিন ১৭৮ টাকা নিয়ে আমাদের শিক্ষকতা করতে হয়। আবার অনেকের পুরো মাসের সম্মানী মাত্র ১,২০০ টাকা। এটা শিক্ষক জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর বাস্তবতা।

মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সফিউল আলম বলেন, চা-বাগানের এসব বিদ্যালয় সরকারিকরণের জন্য সরকারের সদিচ্ছাই মুখ্য। পার্বত্য এলাকায় যেমন ২৫০টির বেশি স্কুল সরকারিকরণ হয়েছে, ঠিক তেমনি এ ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা রয়েছে, যদি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আশরাফুল করিম বলেন, ১৯৭৭ সালের আইন অনুযায়ী প্রতিটি চা-বাগানে একটি করে স্কুল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার অনেক কম। যেগুলো আছে, সেগুলোর অবস্থাও ভয়াবহ। প্রতিটি বাগানে অন্তত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

তিনি আরও বলেন, “স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও চা-শ্রমিকরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, এমনকি ন্যায্য মজুরির বঞ্চনায় পড়ে আছে। সরকার যে বৈষম্যবিরোধী সংগ্রামের কথা বলে, এই বঞ্চনা দূর করার দায়িত্ব তাদেরই সর্বাগ্রে নেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে এখনও সে উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com