লাইলাতুল বরাত: তওবা, ক্ষমা ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী

February 2, 2026,

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক : সময় ও কালের মধ্যে কিছু মুহূর্ত বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্যের অধিকারী। এসব সময় মানবজীবনে আত্মিক উন্নয়ন, আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং আত্মশুদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তেমনই এক মহিমান্বিত রজনী হলো লাইলাতুল বরাত, যা উপমহাদেশে শবে বরাত নামে অধিক পরিচিত। এই পবিত্র রাতটি শা’বান মাসের পঞ্চদশ রজনীতে পালিত হয়। হাদিসের ভাষায় একে “লাইলাতু নিসফি মিন শা’বান” অর্থাৎ শা’বানের মধ্যবর্তী রাত বলা হয়েছে। ‘শব’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে আগত, যার অর্থ রাত বা রজনী। আর ‘বারাআত’ আরবি শব্দ, যার অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃতি, অব্যাহতি ও পবিত্রতা। এই অর্থগত দিক বিবেচনায় লাইলাতুল বরাত হলো-গুনাহ থেকে মুক্তি এবং আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভের রাত। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন এবং ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত করে দেন।

পবিত্র কোরআনে সরাসরি ‘শবে বরাত’ শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও সূরা দুখানের ১ থেকে ৪ নম্বর আয়াতে যে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাতের কথা বলা হয়েছে, তা নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-“শপথ স্পষ্ট কিতাবের! নিশ্চয়ই আমি একে নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়।” তাফসিরবিদদের একটি অংশের মতে, এখানে বরকতময় রাত দ্বারা লাইলাতুল কদরকে বোঝানো হয়েছে। তবে অন্য একদল মুফাসসির, যেমন তাফসীরে জালালাইন ও তাফসীরে বাগভীতে, শবে বরাতের সাথেও এই রাতের সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, শবে বরাতে তাকদিরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয় এবং লাইলাতুল কদরে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ফেরেশতাদের নিকট অর্পণ করা হয়। এই ব্যাখ্যা শবে বরাতের গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে।

শা’বান মাস ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। এটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস হওয়ায় একে রমজানের প্রস্তুতির মাস হিসেবেও গণ্য করা হয়। হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর এই শা’বান মাসেই কিবলা পরিবর্তনের ঐতিহাসিক নির্দেশ নাজিল হয়। বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কাবা শরিফকে মুসলমানদের স্থায়ী কিবলা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। একই মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের নির্দেশনাসংবলিত আয়াত অবতীর্ণ হয়, যা ইসলামী আকিদা ও আমলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে শা’বান মাস ও শবে বরাতের ফজিলত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান ছাড়া অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় শা’বানে অধিক নফল রোজা রাখতেন। তিনি বলেন- “শা’বান আমার মাস, আর রমজান আল্লাহর মাস।”

এই হাদিস শা’বান মাসের মর্যাদা ও তাৎপর্যকে বিশেষভাবে তুলে ধরার মধ্য শা’বানের রাত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন-“এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (ইবনে মাজাহ)। এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, আল্লাহর ক্ষমা লাভের জন্য কেবল ইবাদতই যথেষ্ট নয়; বরং অন্তরের পরিশুদ্ধতা, শিরক ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকাও অপরিহার্য। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত বর্ণনায় জানা যায়, শবে বরাতের রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে দোয়া ও মোনাজাতে রত ছিলেন। অন্য হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা এ রাতে বনী কালব গোত্রের মেষের পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। আরব সমাজে বনী কালব ছিল বৃহৎ গোত্র; এই উপমা আল্লাহর অবারিত ক্ষমা ও অনুগ্রহের ব্যাপকতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি। এ রাতে বান্দা তার অতীত জীবনের ভুলত্রুটি স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দরুদ পাঠ ও তওবা-ইস্তিগফার এই রাতের গুরুত্বপূর্ণ আমল। পাশাপাশি পরদিন নফল রোজা রাখা সুন্নত হিসেবে বিবেচিত। তবে শবে বরাত পালনকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত রীতির প্রচলন দেখা যায়, যা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আতশবাজি, পটকা ফোটানো, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, অপচয় কিংবা শুধুমাত্র খাবার আয়োজনকে কেন্দ্র করে রাত উদযাপন করা শরিয়তসম্মত নয়। শবে বরাত কোনো উৎসবের রাত নয়; এটি ইবাদত, সংযম ও আত্মশুদ্ধির রাত।

লাইলাতুল বরাত মুসলমানদের জন্য আত্মসমর্পণ ও আত্মোপলব্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই রাত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ তাআলার রহমত অবারিত এবং আন্তরিক তওবার মাধ্যমে যে কেউ তাঁর নৈকট্য লাভ করতে পারে। সঠিক জ্ঞান, সুন্নাহসম্মত আমল ও পরিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে শবে বরাত পালন করাই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মহিমান্বিত রজনীর যথাযথ মর্যাদা উপলব্ধি করে নেক আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখকঃ  প্রাবন্ধিক মুদ্রণ ব্যবস্থাপক, দৈনিক সিলেটের ডাক।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com