নির্বাচন পর্ব ১: তৃপ্তির ঢেঁকুর নয়, এখন দরকার সংযত আত্মবিশ্বাস
মোস্তফা সালেহ লিটন : কনফিডেন্স থাকা ভালো। কিন্তু সেই কনফিডেন্স যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখনই বিপর্যয়ের সম্ভাবনা জন্ম নেয়। এই কথাটি আজ সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক,বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে।
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে জটিল ও বহুমাত্রিক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চমক বলুন, বিস্ময় বলুন এই নির্বাচন অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্ম দেবে। এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্যে অতীতে এ দেশে আর কোনো নির্বাচন হয়নি। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে একতরফা ভোটের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ এবার মানুষকে নিজের মতামত প্রকাশে মরিয়া করে তুলেছে। দিন ক্ষন গুনছে তারা। ভোটযুদ্ধের ময়দানে প্রায় সবাই ভেতরে ভেতরে একেকজন নিজেকে বিপ্লবী ভাবছে। সহজ ভাষায় যদি বলি “খবর আছে কিন্তু?”
একদিকে রয়েছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রচ্ছন্ন ভোটব্যাংক, অন্যদিকে জামায়াত, এন সি পি ও বিভিন্ন ইসলামী দলের মরিয়া হয়ে উঠা, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রায় এক কোটি জেন-জি ভোটারের কঠিন ও মনস্তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত। এই সবকিছু মিলিয়েই এবারের নির্বাচনী মাঠ পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর সমীকরনে। “মেটিকুলাস ডিজাইন” শব্দটির সঙ্গে জাতি আগে এতটা পরিচিত ছিল না। কিন্তু আজ এই শব্দটি অনেকের ভীত নাড়িয়ে দিচ্ছে। নির্বাচনী ভাবনার প্রথম ধাপেই একটি সরাসরি প্রশ্ন রাখতে চাই –
আওয়ামী ও জামায়াত-সমর্থিত প্রশাসন দিয়ে কি আদৌ একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব? বাস্তবতা হলো প্রশাসনের ৭৮ জন সচিব লেভেলের কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত ৬৬ জন আওয়ামী ও জামায়াত সমর্থিত বলে নানা সূত্রে জানা যাচ্ছে। এই প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে কীভাবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব? শুধু তাই নয় যেসব এসপি, ডিসি ও ওসিরা সহজেই নির্বাচনী ফল প্রভাবিত করতে পারেন, তাদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিনিয়ত এমন তথ্যই সামনে আসছে।সবাই যখন হুজুগে মেতে উঠেছেন, তখন অন্দরমহলের বাস্তবতা ক’জনই বা জানেন? বাংলাদেশের নির্বাচন এক ভয়াবহ নেশা। প্রার্থী নিজেই জানে সে হয়তো নিশ্চিত পরাজিত হবে, তবুও অর্থ, সময়, নাম-যশ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে মাঠে নামে। কারণ এখানে শুধু ভোট নয়, জড়িয়ে আছে বহূমূখী স্বার্থ। দেশি-বিদেশি নানা রসায়ন।
এ কারণেই নির্বাচনকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, এবারের নির্বাচন সহজ নয়, একে হালকাভাবে নেবেন না। তিনি কথাটি এমনি এমনি বলেননি। রাজনীতিতে সব কথা সোজাসাপ্টা বলা যায় না; অনেক কিছু ইঙ্গিতেই বুঝে নিতে হয়। এর মধ্যেই একটি বিশেষ দল কৌশলগত ভাবে দারুণ খেলছে। তারা আগেই ন্যারেটিভ তৈরি করে মাঠ গরম করছে এবং প্রকৃত সত্যকে আড়ালে ফেলতে অনেকটাই সফল হয়েছে। কখনো “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” কখনো তারেক রহমানের নিরাপত্তা, কখনো প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়ছে, এমন নানা ফালতু ইস্যু বানিয়ে অন্দরমহল সংগঠিত রাখছে। জনগণের সামনে ফেরেশতার মুখোশ পরে তারা দুই দিক থেকেই লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা আছেন, তাদের অনেকেই অবসরপ্রাপ্ত বা সরাসরি নির্বাচনী মাঠে ব্যস্ত। যারা তারেক রহমানের আশপাশে আছেন, তাদের বড় অংশই বাংলাদেশের নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দুর্বল। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ কিংবা হার্ভার্ডের ডিগ্রি নিঃসন্দেহে সম্মানের কিন্তু বাংলাদেশের একজন সাধারণ চেয়ারম্যান বা মেম্বারের মাথায় যে নির্বাচনী খেলার ধারণা থাকে তার সিকিভাগও ধারনা তাদের মধ্য পাওয়া যায় না।
পরিকল্পনা তৈরি করা যায় কাগজে কলমে রূপরেখা আঁকা যায়। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা না জানলে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। মাঠের বাস্তবতা হচ্ছে শহর কিংবা গ্রাম গন্জের সহজ সরল নিবেদিতপ্রান কর্মীরা। যারা ১৭টি বছর নিপীড়ন নির্যাতন মামলা হামলার পরও দলের জন্য জীবনবাজী রেখে যুদ্ধ করে গেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বৃহত্তম এই দলটির সামনে তাই সময় এসেছে দ্রুত এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। আত্মতৃপ্তি নয়, প্রয়োজন বাস্তব ভিত্তিতে সঠিক বিশ্লেষণ ও পদক্ষেপ । কারণ এবারের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি একটি বৈতরণী, যা পার হতে হলে আবেগ নয়, চাই নিখুঁত হিসাব। সময় কিন্তু অপেক্ষা করছে না।



মন্তব্য করুন