ভোটের মাঠে মহসিন মিয়া মধুর যুক্তরাজ্য প্রবাসী কণ্যা সন্তান-সহধমির্ণী সক্রিয়

February 3, 2026,

সাইফুল ইসলাম : বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক পাঁচবারের মেয়র, ন্যাশনাল টি কোম্পানির পরিচালক মো: মহসিন মিয়া মধু (ফুটবল) প্রতীকে ভোট ও দোয়া চাইছেন তাঁর স্বজনরা। যুক্তরাজ্য থেকে এসে কণ্যা সন্তান, নাতি-নাতনিসহ আত্নীয় স্বজনরা ভোটের মাঠে সরব। এক দিনও ঘরে বসে থাকেননি কেউ। প্রতিদিনই ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগ করছেন, ভোট চাইছেন। ভোট শেষে আবার ফিরে যাবেন যুক্তরাজ্য। এই চিত্র মৌলভীবাজার ৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) আসনে নির্বাচনী এলাকায়।

এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সহধমির্ণী প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল পৌরসভার শ্যামলী আবাসিক এলাকা, জালালিয়া সড়ক, ভানুগাছ, পূর্বাশা ও মিশন রোড এবং উপজেলার শহরতলীর রামনগর, মতিগঞ্জ, ভূনবীর এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ ভোটারদের মাঝে ভোট চাইছেন ও উঠান বৈঠকে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ সময় তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে লিফলেট বিতরণ করেন।

তবে এবার আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরী (ধানের শীষ), বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মহসিন মিয়া মধু (ফুটবল), এনসিপি প্রার্থী প্রীতম দাশ (শাপলা কলি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী শেখ নূরে আলম হামিদী (রিকশা), জাতীয় পাটির মোহাম্মদ জরিফ হোসেন (লাঙল), বাসদের মো: আবুল হাসান (মই) মার্কা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। তবে এ আসনে বিএনপি ধানের শীষের প্রার্থী মজিবুর রহমান চৌধুরী ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মহসিন মিয়া মধুর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। দুই প্রার্থীর মধ্যে যে কোনো একজন সামন্য ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করবেন এমনটাই জানিয়েছেন ভোটাররা।

এক সাইডে চা বাগান আরেক সাইডে বস্তি। বস্তিতে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপিরও ভোট আছে বেশ কিছু। ভোটারদের বড় একটি অংশ চা বাগানের শ্রমিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। কিন্তু চা বাগানের শ্রমিকরা একচেটিয়া নৌকায় ভোট দেয়। তাদের ভোটও নৌকায় পড়ে। যে কারণে নৌকা এগিয়ে থাকে সব সময়। সংসদ সদস্য কে হবেন সেটা অনেকটা নির্ভর করে তাদের ভোটের ওপর। এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষই এ আসনে তাদের বড় ভোটব্যাংক। প্রায় ৩৫ বছর ধরে এখানে টানা ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। ছব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর  ফ্যাস্টিস্ট আওয়ামীলীগ দেশকে পালিয়ে গেলে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সরকার।

বিএনপির বিদ্রোহী প্রাথীর অনুসারিরা জানান, মহসিন মিয়া মধু গত ৫ আগস্টের পর থেকে প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্খীদের নিয়ে জনগণের নিরাপত্তায় মাঠে সক্রিয় ভূমিকায় পালন করেছিলেন। করোনা মহামারি, বন্যা, বিভিন্ন উৎসবে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ ভোটারদের বিভিন্ন সমস্যায় পাশে ছিলেন। যার জন্য তাঁর জনপ্রিয়তা বেশি।

মৌলভীবাজার-৪ আসনের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে চায়ের দোকানে আড্ডায় উপস্থিত নাগরিকদের সঙ্গে এমপি এলাকায় আসেন কি না, রাজনৈতিক দলের নেতারা কেমন? আগামী নির্বাচনে কার অবস্থান কেমন, কাদের ভোট বেশি এসব বিষয়ে কথা হয় ।

আবদুর রশিদ নামে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বলেন, ‘নেতারা নির্বাচনে দোয়া নিবার লাগি আসে। দোয়া নেওয়ার পর জয়ী হলে তো আর কাজ থাকে না।’

লাখাইছড়া চা বাগানে শিক্ষার্থী  তপন বৈদ্য (২৮) বলেন, ভোটের আগে ভোট চাইতে আসতেন আর পাস করার পর আর কেউ কোনো খোঁজ খবর রাখেন না। সব দলের নেতাদেরই একই অবস্থা, ভোট ছাড়া কেউ আসেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক দিনমজুর বলেন, ‘এটা আওয়ামী লীগের আসন। এবার আওয়ামীলীগ মাঠে না থাকায় ভোট হলেও  বিএনপি নেতা মহসিন মিয়া মধু পাস করবে। কারণ এই আসনে এবার ব্যক্তি দেখে ভোট দিবে।’

জাকির হোসেন নামে এক দোকানি বলেন, ‘আমার বয়সে আমি দেখিনি নৌকা হারতে। কিন্তু এবার নির্বাচনে বিএনপির দুই প্রার্থীর মধ্যে মহসিন মিয়ার গণজোয়ার বেশি। কারণ আওয়ামীলীগ মাঠে নেই।’

সাবেক মেয়র মো: মহসিন মিয়া মধু বলেন, ‘এ আসনে সব জাতি ধর্ম-বর্ণের মানুষের ভোট আছে।  চা বাগানের শ্রমিকরা বেশিরভাগ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। বাগানের শ্রমিকরা আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। কারণ গণঅভুত্থানের পর আমি সরকারী চা বাগানের মজুরি বন্ধ ছিল। আমাকে ইউনুস সরকার পরিচালকের দায়িত্ব প্রদান করায় তাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছি এবং দিয়ে যাবো।’

তিনি বলেন, ‘এখানে সংখ্যালঘু বেশি। চা শ্রমিক বেশি। তারা নৌকায় ভোট দেন। এখানে ৬৫ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। এবার তো নৌকা নেই, ধানের শীষে দিবে না, সেই ভোট আমি পাবো ব্যক্তিগত ক্রেডিটে।’

বিএনপির প্রার্থী মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকার জনগণ আমার কাছে (হিন্দু-মুসলিম) সমান সুবিধা ভোগ করবে। আমার কাছে কোনো ভেদাভেদ থাকবে সবাইকে সমান চোখে দেখবো আর এলাকায় উন্নয়ন করা আমার মূল লক্ষ্যে। কি কি উন্নয়ন করবেন এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, উন্নয়ন এখন কি কি এসব সিলেক্ট করবো আমার বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক এবং সম্বনয় কমিটি গঠন করেছি তাদের মাধ্যমে উঠে আসবে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে পর্যটন খাতে উন্নয়ন করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘চান্দাবাজি, সন্ত্রাসী, হিরোইন, গাঁজা ও মাদক এসব একেবারে নিশ্চিহৃ করবো। বন্যাকবলিত এবং চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীসহ সার্বিকভাবে এলাকার  উন্নয়নে কাজ করবো।’

১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান:

মৌলভীবাজার-৪ আসনে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পেয়ে আসছেন এবং নির্বাচিতও হচ্ছেন উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ।

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত আসন মৌলভীবাজার-৪। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮৮৮ জন।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ (২০১৮) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুস শহীদ পান ২ লাখ ১৬ হাজার ৬১৩ ভোট এবং বিএনপির মুজিবর রহমান চৌধুরী ৯৩ হাজার ২৯৫ ভোট পেয়েছেন।

১০ম সংসদ নির্বাচনে (২০১৪) আওয়ামী লীগের আবদুস শহীদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী। ৯ম সংসদ নির্বাচনে (২০০৮) আওয়ামী লীগের আবদুস শহীদ ১ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির মুজিবুর রহমান চৌধুরী পান ৭৯ হাজার ৫৯৯ ভোট।

৮ম সংসদ নির্বাচনে (২০০১) আওয়ামী লীগের আবদুস শহীদ পান ৯৬ হাজার ৩২৯ ভোট এবং মুজিবুর রহমান চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পান ৭০ হাজার ৩৬৪ ভোট।

৭ম সংসদ নির্বাচনে (১৯৯৬) আওয়ামী লীগের আবদুস শহীদ ৯১ হাজার ৮১১ ভোট পান। জাতীয় পার্টির আহাদ মিয়া পান ৫৯ হাজার ৮২৫ ভোট।

৫ম সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১) আওয়ামী লীগের আবদুস শহীদ পান ৭৫ হাজার ৩২১ ভোট এবং জাতীয় পার্টির আহাদ মিয়া পান ৬০ হাজার ২১৫ ভোট।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com