আলোচনা সমালোচনায় ছাত্রলীগ কমিটি

তমাল ফেরদৌস॥ আলোচনা সমালোচনায় মুখর এখন মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগ কমিটি। কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলমকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন কথাবার্তা। মাহবুবের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে তাঁকে সমালোচিত করতে ভুল বানানে বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া হয়েছে বলে মাহবুব অভিযোগ করেছেন। তিনি এপর্যন্ত তিনবার তাঁর ফেসবুক আইডি পরিবর্তন করেছেন।
শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন এর দক্ষতা, দূরদর্শীতা, শিক্ষাসহ তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়েও অনেক মন্তব্য করা হয়েছে। অনেক নেতাও এসব পোস্ট শেয়ার করে ছড়িয়ে দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আবার ইতিমধ্যে অনেকে নিজেদের শেয়ার করা পোস্ট মুছে ফেলেছেন। পোস্টটিতে বিভিন্ন ব্যক্তিরা যে যার ইচ্ছেমতো মন্তব্য লিখেছে। যা আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন করার শামিল।
গোয়েন্দা রিপোর্ট, স্থানীয় সাংবাদিক, রাজনীতিবিদসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবুজ সংকেতে জাকির হোসাইনকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তাই জাকির হোসাইনকে নিয়ে মন্তব্য করার অর্থই হলো প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বা পছন্দকে নিয়ে কথা বলা। আর এসব ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগ এর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকেই। 
যদি আলোচনা সমলোচনা করতে হয় তাহলে শুরু করতে হবে জেলা আওয়ামী লীগকে দিয়ে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নেছার আহমদ, সহ-সভাপতি মসুদ আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক আলহাজ্ব ফজলুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক মো. কামাল হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক অজয় সেন। উপরোল্লিখিত নেতারা রাজনীতি করার দাবী রাখে একারণে যে, ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে এপর্যন্ত তাঁদের একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে। তাঁরা রাজপথে যেমন নের্তৃত্ব দিতে গিয়ে অনেক ঘাম ঝরিয়েছে তেমনি মৌলভীবাজারে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে এরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এদের রয়েছে রাজনীতি করার মতো লবিং, জ্ঞান, জনসম্পৃক্ততাসহ ব্যাপক জনপ্রিয়তা।
কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগে গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিরাও আছেন যারা তৈল মর্দন করে ওইসব নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে লেজুরবৃত্তি করে (আমার নেতা অমুক, আমি অমুকের রাজনীতি করি, অমুক আমার রাজনৈতিক গুরু ইত্যাদি বলে) পদটি পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। এরা না ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছে, না যুবলীগের। এরা পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিবিদ নয় তবুও জেলা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে বসে আছে। একজনতো বাকশাল করতেন এখন নব্য আওয়ামী লীগ হয়েছেন। এরা নিজেদের পেশা, ধান্ধা ও সামাজিক অবস্থানকে সর্বোপরি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে এসব পদ পদবি ব্যবহার করছে। এসব ব্যক্তিদের নিয়ে কেউ কিছুই লিখেনা। বরং এসব নেতাদেরকে অনেকেই অভিনন্দন, শুভেচ্ছা জানিয়ে তৈল মর্দনের বাক্য দিয়ে ফেসবুকের পাতা ভরিয়ে তোলেন।
২৩ এপ্রিল ঘোষিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক হলেন মাহবুব আলম। তিনি একজন মাস্টার্স পাশ করা ছাত্রলীগ কর্মী। শিক্ষিত, মার্জিত, সহজ-সরল প্রকৃতির মাহবুব ২০০৯ সাল থেকে কলেজ ছাত্রলীগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোন পদে না থাকলেও এপর্যন্ত ক্লিন ইমেজ নিয়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শ সৈনিক হিসেবে ছাত্রলীগের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।
গত কমিটিতে (দুই রনি সভাপতি ও সম্পাদক) তিনি স্থান না পেলেও আদর্শিক রাজনীতির কোন কমতি তাঁর মাঝে ছিলোনা। ফলশ্রুতিতে ২০০৯ থেকে ২০১৮ এই ৯ বছর একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ এর জেলা নের্তৃবৃন্দের সুনজরে তিনি ছিলেন। একারণে একজন ক্লিন ইমেজের কর্মীকে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন।
একটু পেছনে ফিরে যেতে হয়। যখন ডাকসুর ভিপি ছিলেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ। মৌলভীবাজারে যারা ৯০ সাল থেকে এপর্যন্ত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ নেতারাই সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ এর কাছ থেকে রাজনৈতিক মন্ত্র শিখে এখন মাঠ গরম করে আছেন। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ আওয়ামী রাজনীতিতে এখন সক্রিয় না হলেও তাঁর হাতে গড়া তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারাই এখন মূলত জেলার রাজনীতির চালক হিসেবে কাজ করছেন।
বর্তমান পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আলহাজ্ব ফজলুর রহমান এর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ এর হাত ধরে। ফজলুর রহমান ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দাপটের সাথে জেলা ছাত্রলীগের নের্তৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সাথে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী জিল্লুল আহমদ ও আলকাছ মিয়া। তিনি সফলতার সাথে জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
এর আগে জেলা ছাত্রলীগের দায়িত্ব পালন করেছেন তুখোড় ছাত্রনেতা মসুদ আহমদ। এজেলার ছাত্রলীগ নের্তৃবৃন্দ তখনকার সময়ে তাঁকেই অনুসরণ করতো। ছাত্রলীগের ১৯৮৫-৮৬ ব্যাচটি ছিলো জেলা ছাত্রলীগের স্বর্ণযুগ। সেসময়ে ২ হাজারেরও বেশী ছাত্রলীগ সদস্য মৌলভীবাজার সরকারী কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। এতো বিশাল কর্মীবাহিনীকে মসুদ আহমদ নিজের দক্ষতা ও সাহসিকতায় সুযোগ্য নের্তৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি জেলা আওয়ামী লীগ এর সহ-সভাপতি।
দাপটের সাথে ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন আরেক নেতা বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও দি মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির তিন বারের নির্বাচিত সভাপতি মো. কামাল হোসেন। সে সময়ে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন মো. আহসান ও পরবর্তীতে নির্মল কান্তি দেব। মো. কামাল হোসেন স্পষ্ট ও ডায়নামিক নেতা হিসেবে নিজ দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছে সুপরিচিত। রাজনীতিতে যেমন একটি উজ্জল ক্যারিয়ার তাঁ রয়েছে তেমনি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও তিনি সারা জেলা তথা সিলেট বিভাগে সফল। তাঁর সময়োপযোগী ও নিজের সুদৃঢ় যোগ্য নের্তৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তিনি ইতিমধ্যে সর্বমহলে জানান দিয়েছেন।
১৯৯৮ সালে মো. আবু সুফিয়ান জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও রুহুল আমীন রুহেল সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এই কমিটিও যোগ্যতার ভিত্তিতে জেলা ছাত্রলীগকে পরিচালিত করে।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর মবশ্বির আহমদকে আহবায়ক ও সুজিত দাশ, সৈয়দ রেজাউর রহমান সুমন, সজীব হাসান ও আব্দুল মতিনকে যগ্ম আহবায়ক করে জেলা ছাত্রলীগের ৫ সদস্যবিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। পরে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
এরপর ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই ৬ সদস্যবিশিষ্ট মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের কমিটি দেওয়া হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন, সভাপতি আসাদুজ্জামান রনি, সহ-সভাপতি সৈয়দা সাবরিনা শারমিন, সাজ্জাদুর রহমান রাজন, সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রনি, সাংগঠনিক সম্পাদক সৌদ আল সুফিয়ান সাগর ও জাকের আহমদ অপু।



মন্তব্য করুন