মনু ও ধলাই নদী ভাঙ্গার আতঙ্কে বাঁধের উপরেই রাত দিন

ইমাদ উদ দীন॥ তেমন ভারী বর্ষণ হয়নি। তারপরও হঠাৎ নদীর পানি অস্বাভিক বৃদ্ধি। উজান থেকে প্রবল ¯্রােতে নেমে এলো পাহাড়ি ঢল। প্রবল ¯্রােতে উপচে পড়ে মনু ও ধলাইর দ’ু কূল। দেখতে দেখতে মনু ও ধলাইর প্রতিরক্ষা বাঁধের কয়েকটি স্থানে ভাঙ্গন। ভাঙ্গন দিয়ে প্রবেশকৃত পানির ¯্রােতের তোড়ে প্লাবিত হয় গ্রামের পর গ্রাম। মুর্হুতেই তলিয়ে যায় ওই এলাকার বসত ভিটা আর ক্ষেত কৃষি। বাদ যায়নি পৌর শহরও। সর্বস্বান্ত নদী তীরের এ জেলার কয়েক লাখ মানুষ।
১৩ জুন দুপুর থেকে এমন আকস্মিক বন্যায় দিশেহারা জেলার মনু ও ধলাই নদীতীরের বাসিন্দারা। দু’টি নদীর বাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে এমন খবরে আতঙ্কগ্রস্থ জেলার নদীতীরের বাসিন্দারা। উদ্বেগ উৎকন্ঠায় তাৎক্ষনিক গ্রাম ও শহরবাসীরা নিজ উদ্যোগে নদী শাসনের বাঁধ রক্ষায় সিন্ধান্ত নেন। এর পর থেকে তাদের রাত দিন কাটছে বাঁধের উপর। কোদাল,বেলছা আর বালু ভর্তি বস্তা নিয়ে মেরামত চলতে থাকে তাদের। দুটি দলে বিভক্ত হয়ে গ্রামবাসী দিন রাত বাঁধ মেরামত আর পাহারা দিতে থাকেন। রাতে বাঁধের উপর কাটে তাদের র্নিঘুম রাত। মুন্সিবাজার ইউনিয়নের বাদে করিমপুর গ্রামের আবাস মিয়া (৫০), মায়া বেগম(৬৫),হারুন মিয়া (৪৮),হাসান মিয়া (৪৬),শরিফ মিয়া (৩৩),কালাম মিয়া (২৬)সহ অনেকই ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাধের ভাঙ্গা অংশের অদূরে দাঁড়িয়ে ক্ষোভের সাথে বলেন কি কাজ করল পানি উন্নয়ন র্বোড। নবনির্মিত বাঁধ দিয়ে ভেঙ্গে বানের পানি প্রবেশ করে আমাদের র্সবনাশ করল।
তারা বলেন স্থায়ী বাঁধ আর নদী খনন না হলে প্রতি বছরই আমাদের কপালে এমন দূর্ভোগ লেগেই থাকবে। তারা জানান গ্রামের কিছু তরুণ নিজ উদ্যোগে হঠাৎ ফাটল দেওয়া ধলাই নদীর বাঁধ মেরামত কাজের জন্য গ্রামবসীকে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা ঘর প্রতি চাঁদা ও লোকবলও নির্ধারণ করেন। কিন্তু এই সীন্ধান্তের মাত্র কয়েক ঘন্টার পর কাজে নামার আগেই ৩টি স্থানেই বাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে পাশর্^বর্তী গ্রামগুলো ডুবিয়ে দেয়।
অপরদিকে কুলাউড়ার টিলাগাঁও,হাজিপুর,মৌলভীবাজারের কনকপুর, মনুমুখ ও রাজনগর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবনের কবল থেকে রক্ষাপায় গ্রামবাসীর উদ্যোগে নদী শাসনের বাঁধ বালু ভর্তি বস্তা ফেলে তাৎক্ষনিক মেরামত করায়। এমনটি জানালেন স্থানীয় দূর্ভোগ্রস্থ নদী তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা।
মৌলভীবাজারের কনকপুর ইউনিয়নের মামুন আহমদ,সায়েন আহমদ চৌধুরী,আব্দুস সালাম,সুলেমান মিয়াসহ বেশ কয়েজন তরুণ জানান তাদের এলাকায় মনু নদীর বাঁধ রক্ষায় গ্রামবাসী একজোট হয়ে রাত দিন পাহারা দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত বাঁধ ভাঙ্গার আতঙ্কে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ গ্রামবাসী বাঁধের উপরই রাত দিন কাটাচ্ছেন। একারনে তারা এখন পর্যন্ত বড়ধরনের বির্পযয় ও ক্ষয়ক্ষতির কবল থেকে রক্ষা পেয়েছেন। মঙ্গলবার রাজনগরের কালাবাজার হামরকোনা এলাকায় নতুন করে কুশিয়ারা নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন কুশিয়ারা নদীর বাঁধের আরো কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় তারা তাৎক্ষিনক বালুর বস্তা ফেলে মেরামত করে কোনরকম তা রক্ষা করেছেন। গেল কয়েকদিন থেকে ভারতের উত্তর ত্রিপুরা এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় মনু, কুশিয়ারা ও ধলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মনু ও ধলাই নদীর এ পর্যন্ত প্রায় ৩০টি স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে বন্যার পানি প্রবেশ করে কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও সদর উপজেলার বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে। সেনাবাহিনীর মেজর মোহাইমিন বিল্লার নেতৃত্বে ২১ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটলিয়ন সিলেট সেক্টরের ৭০ সদস্যের একটি টিম জেলার বন্যা কবলিতদের সাহাযার্ত্যে গেল কয়েক দিন থেকে কাজ করছেন।
মৌলভীবাজার শহরের এম সাইফুর রহমান সড়ক (সেন্টাল রোড) মনু নদীর রক্ষা বাঁধের পাশাপাশি হওয়ায় আতঙ্কগ্রস্থ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শহরের বাসিন্দারা। মনু নদীর পানি শহরের ওই এলাকায় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ (গাইড ওয়াল) উপচিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করতে পারে এ আশঙ্কা থেকে বাধ রক্ষায় সেনাবাহীনি, পৌরসভার কর্মচারী,বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাধ রক্ষায় রাত দিন কাজ করছেন।
শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় শহরবাসীকে শতর্ক থাকতে মাইকিংও করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। এই কাজগুলি তদারকি করেন সৈয়দা সায়রা মহসীন এমপি, জেলা প্রশাসক মো: তোফায়েল ইসলাম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহজালাল, পৌর মেয়র ফজলুর রহমান, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তীসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
এছাড়া সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সভাপতি এম নাসের রহমান ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নেছার আহমদ ঝুকিপূর্ণ এসকল স্থান ও বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে সার্বিক সহযোগিতা করতে দলের নেতাকর্মীদের আহবান জানিয়েছেন। শহরের গুরুত্বপূর্ন এম সাইফুর রহমান সড়ক দিয়ে যাবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলা সদরের সাথে উপজেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ঈদের আগের রাতে বাঁধ ভাঙ্গার আতঙ্কে শহরবাসি ও মনু ও ধলাই নদীর তীরবর্তী এলাকার আতঙ্কগ্রস্ত বাসিন্দারা রাত জেগে কাটান।
শহর রক্ষায় মনু নদীর উত্তর পাড়ের প্রতিরক্ষা বাঁধ প্রশাসন থেকে কেটে দেয়ার গুজবে রাত জেগে বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে পাহারা দেন ওই এলাকার মানুষ। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ওই এলাকায় মনু নদীর বাঁধ না ভেঙ্গে শহরের বড়হাট এলাকায় ভাঙ্গায় পৌর শহরের ৩টি ওর্য়াড বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলাম জানান, জেলার ৩টি উপজেলায় সেনাবাহিনী কাজ করছে। সরকারী তরফে বন্যা কবলিতদের সাহায্য করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মোঃ ফজলুর রহমান জানান শহর এলাকায় মনুনদীর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ ঝুঁকিতে থাকায় পৌর সভার উদ্যোগে ৪-৫ দিন থেকে বাঁধ রক্ষায় তিনি সহ পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৮৪ সালে শহরে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ওই সময়ের নদীর পানির উচ্চতার চেয়ে এখনো ১ থেকে দেড় ফুট পানি বেশী। পানি অনেকটা কমছে জানিয়ে শহরবাসীকে আতঙ্কগ্রস্থ না হওয়ার পরামশর্ দেন। এই প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় তিনি সকলের সহযোগিতা ও দোয়া চান।



মন্তব্য করুন