এইচএসসির ফলাফল পর্যালোচনা– মৌলভীবাজারে এইচএসসির ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে…

ইমাদ উদ দীন॥ গেল কয়েক বছর থেকে এ জেলায় উচ্চ মাধ্যমিক ও ¯œাতক পর্যায়ের ফলাফল আশানুরুপ হচ্ছেনা। এমনটিই অভিযোগ এজেলার অভিভাবক ও সচেতন মহলের। এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সিলেট শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা বোর্ডের মধ্যে এ জেলা পিছিয়ে থাকায় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মান অভিমানের আওয়াজ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বার বার এরকম ফলাফল বির্পযয়ের নেপথ্যের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকরা প্রতিদিনের পাঠদান কার্যক্রমে গুরুত্ব না দিয়ে কোচিং কিংবা প্রাইভেটে আগ্রহী হওয়া এমন ফলাফল বির্পযয় হচ্ছে। তারা বলছেন প্রবাসী অধ্যুষিত এজেলায় সদর উপজেলার কলেজ গুলোতে যে শিক্ষকরাই আসেন তারাই বেশি উর্পাজনের আশায় কোচিং কিংবা প্রাইভেটের দিকে ঝুঁকেন। আর একারনেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা মূল ¯্রােতধারা থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। এতে করে ফলাফলের গড় হিসাবে পিছিয়ে যাচ্ছে এ জেলা। জেলার সচেতন মহল ও শিক্ষানুরাগীরা বলছেন অপেক্ষাকৃত গরীব শিক্ষার্থীরা ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও কোচিং কিংবা প্রাইভেটে পড়ার প্রতিযোগিতায় আর্থিক সাধ্যে কোলিয়ে উঠতে না পারায় তাদের ফলাফল খারাপ হচ্ছে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক ক্ষোভের সাথে জানান জেলা ও উপজেলার কলেজ গুলোতে দীর্ঘ দিন থেকে শিক্ষক স্বল্পতা,পাঠদানে শিক্ষকদের অনাগ্রহতা ও আন্তরিকতার কমতির কারনেই মূলত এসএসসি ও ¯œাতক পর্যায়ে ফলাফল বির্পযয় ঘটছে। মৌলভীবাজার সরকারী কলেজ ও সরকারী মহিলা কলেজের অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন দীর্ঘ দিন থেকে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক বিষয়ের শিক্ষক নেই। তাছাড়া যারা আছেন তারও রিতিমত পাঠদানে অংশ নেন না। মাসের অধিকাংশ সময়ে শিক্ষকরা কলেজে অনুপস্থিত থাকেন। বিষয়টি অধ্যক্ষকে জানালেও তার কোন প্রতিকার নেই। অনেক শিক্ষকই ক্লাসের সময় আকারে ইঙ্গিতে অথবা কোন কোন সময় অনেকটা প্রকাশ্যেই শিক্ষার্থীদের কোচিং কিংবা প্রাইভেটের কথা বলে থাকেন। শিক্ষকদের এমন আচরনে হতাশ এজেলার শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। এবছর এ জেলায় এইচএসসিতে পাসের হার ৫৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। ১৪,৪৯৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮,২৫৮জন। এর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১ শত ১৮ জন শিক্ষার্থী। এদিকে কমলগঞ্জের হুরুন্নেসা খাতুন চৌধুরী কলেজের শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে গত এক যুগের চেয়ে এবারই বেশি ফল বিপর্যয় হয়েছে এজেলায়। ইংরেজি ও আইসিটিতে অধিকাংশেরও বেশি শিক্ষার্থীরা খারাপ করায় এমন ফল বিপর্যয় হয়েছে বলে জানান শিক্ষকরা। তবে জেলার সচেতন নাগরিক ও অভিভাবকরা ফল বিপর্যয়ের জন্য শিক্ষকদের দায়ী করছেন। তারা বলছেন, নিয়মিত কলেজে ক্লাস না হওয়া এবং শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের মানুষিকতার কারণে এ বিপর্যয় হয়েছে। শিক্ষার্থীরা লাগাতার ক্লাসে উপস্থিত না হলেও কলেজের পক্ষ থেকে অভিভাকদের সাথে যোগাযোগ করা হতো না। সর্বপরি শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা ও বাণিজ্যিক মানুষিকতার কারনে এরকম ফল বিপর্যয় হয়েছে বলে সচেতন নাগরিকদের মন্তব্য। ফল বিপর্যয়ের কারন জানতে একাধিক অভিভাবকের সাথে কথা হলে তারা বলেন “আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্লাস মুখি না হয়ে এখন কোচিং মুখি। ছেলে-মেয়েরা ঘুম থেকে উঠে স্যারের বাসায় কোচিংয়ে দৌঁড়ায়। কোচিং বাদ দিয়ে যদি ক্লাসে গুরুত্ব দেয়া হতো তাহলে ফলাফল এত খারাপ হতো না”। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে পাসের হার ৮০ শতাংশ, আলহাজ্ব মখলিছুর রহমান ডিগ্রী কলেজে ৯৬ শতাংশ, সরকারি মহিলা কলেজে ৫৩ শতাংশ, শাহ মোস্তফা ডিগ্রী কলেজে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ, রাজনগর ডিগ্রী কলেজে ৩১ দশমিক ০৩ শতাংশ, মফাজ্জাল হোসেন মহিলা কলেজে ২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ, তারাপাশা স্কুল এন্ড কলেজে ৩৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, ইম্পিরিয়েল কলেজে ৭৫ শতাংশ, কাশীনাথ আলাউদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজে ২৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ ও কমলগঞ্জ গণ মহাবিদ্যালয় ৪৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধিনে আলিম পরীক্ষায় ১,২৮২ জন শিক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৫৯জন। শতকরা পাসের হার ৬০ শতাংশ। জেলায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে কোনো এপ্লাস আসেনী এবং কারিগরী শিক্ষা বোর্ড থেকে ২৩৭ জন শিক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করে ২০৯জন উত্তীর্র্ণ হয়েছেন। শতকরা পাসের হার ৮৮ দশমিক ১২ শতাংশ। কোনো এ প্লাস নেই। আলহাজ্ব মখলিছুর রহমান ডিগ্রী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট শিল্পপতি আলহাজ্ব এম এ রহিম সি আই পি বলেন আমাদের ব্যক্তি উদ্যোগের কলেজটি এখনো এমপিও ভুক্ত হয়নি। অথচ প্রতিবছরই আমাদের কলেজ ভালো ফলাফল করে যাচ্ছে। তিনি বলেন ভালো ফলাফলের জন্য কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, গর্ভনিংবডি, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সমন্বয়ের প্রয়োজন। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কলামিষ্ট এডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন একসময় এজেলা শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে থাকলেও এখন যেনো দিন দিন অবনতির দিকে এগোচ্ছে। এরকারন হিসেবে তিনি শিক্ষকদের অতিমাত্রায় কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। সর্বপরি অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধিরপ্রতি তিনি জোর দেন। শিক্ষানূরাগী ও অভিভাবক বকসি মিছবাহ উর রহমান বলেন ফলাফল ভালো করতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কলেজ ও নিয়মিত ক্লাস মুখী করতে হবে। এরজন্য শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা ও হ্রদিক সম্পর্ক জোরাদার করার প্রয়োজন। এবিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক) এম এ ওয়াদুদ বলেন, কিছু কলেজে বছরের অধিকাংশ সময় বিভিন্ন পরীক্ষা থাকে। যার কারনে ঠিক মতো ক্লাস করা সম্ভব হয়না। যার কারনে ফলাফল একটু খারপ হয়েছে। তবে অনান্য কলেজে ফলাফল বির্পযয়ের বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে।



মন্তব্য করুন