দুই বন্ধুর টেবিল হাজার তরুন তরুনীর ভবিষতের পথ

বিকুল চক্রবর্তী॥ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য দুটি পড়ার টেবিল আর দুইটি সেলেরন কম্পিউটার দিয়ে সাড়ে ৮ হাজার তরুণ তরুণীকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যতের পথ প্রদর্শন করেছে ইউনাইটেড কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দুই কর্ণধার সুমন ও পাপ্পু নামে দুই তরুণ।
গল্পটি মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার লাউয়াছড়া বনের ভিতরের গ্রাম ডলুবাড়ির নৃতাত্মিক জনগোষ্টীর অধিবাসী সুমন দেববর্মা ও শ্রীমঙ্গল শহরতলীর রুপসপুর আবাসিক এলাকার বিশ্ব রাজ ধর (পাপ্পু)। গল্পের শুরু ১০ বছর আগে ২০০৮ সালের ৩ ডিসেম্বর।
এর আগে ২০০৫ সালে শ্রীমঙ্গল সাঈদ কম্পিউটার এন্ড ট্রেনিং সেন্টার থেকে পৃথক পৃথক সময়ে দুই জনেই প্রশিক্ষন নেন। কিছু দিন পর সুমন ঢাকা এন আই টি থেকে দুই বছরের ডিপ্লামা করতে যান ২০০৬ সালে পাপ্পু একই জায়গায় কুরিয়ান ভাষা শিখার কোর্স করতে যান। সেখানেই দেখা হয় দুইজনের। দুই জনের বাড়িই শ্রীমঙ্গল তাই কোর্স সম্পন্ন করার সময় দুইজনই একসাথে আড্ডা দিতেন। একজনের উদ্দেশ্য ছিল জীবিকার সন্ধানে বহি:বিশ্বে পাড়ি জমাবেন। কিন্তু দুইজনের একত্র চিন্তা একটু পাল্টে গেলো। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন কোর্স শেষে শ্রীমঙ্গল ফিরে নিজেরা কম্পিউটার শিখাবেন কোন গ্রামীণ এলাকায়। কিন্তু সে সময় তাদের কাছে কোন অর্থ নেই। পরিবার থেকেও তারা কোন সাপোর্ট পাচ্ছেন না। ঢাকা থেকে কোর্স সম্পন্ন করে শ্রীমঙ্গল এসে দু’জনে মিলে খোঁজে বের করলেন সবুজবাগ আবাসিক এলাকায় ছোট একটি কক্ষ। মাসে ৫শত টাকা ভাড়া নিয়ে ঘরটি নিয়ে নেন। নিজেদের বাসায় শিখার দুটি সেলেরন কম্পিউটার আর তাদের পড়ার দুটি টেবিল নিয়ে আসেন সবুজবাগের ভাড়া নেয়া সেই ঘরে। ইতিমধ্যে দুইজন ছাত্রও তারা অল্প ফি তে পেয়ে যান। শুরু হয় দুই জনের কম্পিউটার প্রশিক্ষন কেন্দ্রর কাজ। তারা অত্যন্ত যতœসহকারে শিক্ষার্থীদের দিতে থাকেন প্রশিক্ষন। বাড়তে থাকে তাদের শিক্ষার্থী। এক সময় তাদেরকে বড় জায়গা নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। চলে আসেন শহরের ব্যস্ততম স্থান শ্রীমঙ্গল চৌমুহনী এলাকায় পরিধি বাড়িয়ে ১২টা কম্পিউটার দিয়ে প্রশিক্ষন প্রদানের কাজ শুরু হয়। অনুমোদন নেন বাংলাদেশ কারিগরী প্রশিক্ষন কেন্দ্রেরও। আসতে থাকে বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও শিক্ষার্থীরা। পাশবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলা থেকেও অনেক শিক্ষার্থী আসেন প্রশিক্ষন নিতে। সিন্ধান্ত নিলেন প্রশিক্ষনার্থীদের সুবিধার্থে তৃণমুলে প্রশিক্ষন কেন্দ্র ছড়িয়ে দিতে। আর এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রতিষ্টা করেন বড় আরেকটি প্রশিক্ষন কেন্দ্র। একই সাথে শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আরও ৪টি প্রশিক্ষন কেন্দ্র স্থাপন করে অল্প ফি তে দিতে থাকেন গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবক যবতীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষন। একে একে ৬টি প্রতিষ্ঠান দাড় করান তারা। ৬টি প্রতিষ্টানেরই অনুমোদন নেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে। ৬টি প্রতিষ্টানে বর্তমানে প্রশিক্ষক ও ম্যানেজারসহ ২৮ জন স্টাফ কর্মরত আছেন। আর বর্তমানে দুই কম্পিটার ও দুই টেবিলের স্থলে এখন শতাধিক কম্পিউটার ও টেবিল স্থান পেয়েছে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে। এই মুহুর্তে কয়েকটি ব্যাচে তাদের শিক্ষার্থী রয়েছেন সাড়ে ৫শত। সুমন দেববর্মা জানান, কয়েকটি ব্যাচে ৩মাস ও ৬মাসের কোর্সে প্রায় সাড়ে ৫শত প্রশিক্ষনার্থী রয়েছেন তাদের ৬টি প্রশিক্ষন কেন্দ্রে। আর বিগত ১০ বছরে তারা সাড়ে ৮ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষন দিয়েছেন। সুমনের অপর ব্যবসায়িক পার্টনার বিশ্বরাজ ধর পাপ্পু জানান, এই সাড়ে ৮ হাজার শিক্ষার্র্থীর মধ্যে কয়েকশত শিক্ষার্থী বিভিন্ন দপ্তরে সরকারী চাকুরী পেয়েছেন। হাজার খানেক বে-সরকারী প্রতিষ্টানে চাকুরী করছেন। অনেকে নিজেই ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্টান করেছেন। একই সাথে তারা শুরু করেছেন আউট সোর্সসিংএর কাজ। বর্তমান সরকার দেশে যে ডিজিটালাইজেশন ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন তাদের এই শিক্ষা প্রতিষ্টান এটি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে।



মন্তব্য করুন