শ্রীমঙ্গলে সংবাদ সম্মেলন জিব্বা দূর্নীতিগস্থ ॥ চা শিল্পের জন্য পৃথক মন্ত্রনালয়ের দাবী

বিকুল চক্রবতী॥ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে উন্নত পদ্ধতিতে চায়ের স্বাদ আস্বাদন করে মান নির্নয় করা হলেও বাংলাদেশে মান্দাতার আমালের পদ্ধতি অনুযারয়ী চা মুকে নিয়ে জিব্বা দিয়ে কুলচুকা করে চায়ের মান নির্ণন করেন। আর এই মান নির্ণনকারীদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভালো মানের চা এর মান কমিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে টি টেস্টারদের জিব্বা সঠিক তথ্য না দিয়ে দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে।
বুধবার রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাবে চা শিল্পে পৃথক মন্ত্রনালয় প্রতিষ্টা ও সিন্ডিকেটদারী টি টেস্টারদের বাদ দিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে চায়ের মান নির্নয় এর ব্যবস্থা করার দাবীতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন হামিদিয়া টি কোম্পানীর ভাইস চেয়ারম্যান ওলিউর রহমান।
তার পক্ষে হামিদিয়া টি কোম্পানীর জিএম সিরাজুল ইসলাম লিখিত বক্তব্যে বলেন, টি টেস্টারের সিন্ডিকেটের কারনে অনেক বাগান চায়ের উৎপাদন খরচই পাচ্ছেন না। এতে তাদের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কশন করে বলেন, চা মন্ত্রনালয় স্থাপন করে এই সকল সিন্ডিকেটসহ অনান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারলে বাংলাদেশর চা আবার রপ্তানী হবে। এ থেকে প্রচুর পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন হবে। চলমান বছরেও চায়ের উৎপাদন ১০০ মিলিয়ন কেজি ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান তিনি। এতদ্বাঞ্চলের চা শিল্পের ইতিহাস ১৬৫ বৎসরের সুদীর্ঘ ইতিহাস।
দেশে যেমন চায়ের চাহিদা বেড়েছে তেমনী চায়ের উৎপাদনও বাড়ছে। কিন্তু কিছু কিছু ব্রোকার হাউজের সিন্ডিকেট টি টেস্টারের কারনে ভালো মানের চায়ের মান একে বারে নিচে দেয়াতে চায়ের উৎপাদন খরচই তারা পাচ্ছেনা। এ বস্থায় তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই মুহুর্তে বাগান ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন সরকারের হস্তক্ষেপ ও আর্থিক সহায়তা। সিরাজুল ইসলাম বলেন, চা উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিতরণ ও বিক্রয়ে যদি কোন ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠে থাকে এবং গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে কি না তাও পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে তলিয়ে দেখার প্রয়োজন। তিনি বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের পর পরই চা এদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদিশিক অর্থ আমদানীকারক ফসল। ১৯৫৭ ইং হইতে ১৯৫৮ ইং সনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালি বাংলাদেশের শ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা শিল্পের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি হিসাবে টি বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫১ ইং সনে তৎকালীন পাকিস্তানে পাকিস্তান টি বোর্ড গঠিত হয়েছিল। ১৯৫৭ ইং সনে পাকিস্তান টি রিসার্চ স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীমঙ্গলে। ১৯৭৩ ইং সন হতে ইহার নাম রাখা হয় বি,টি,আর,আই। সবই চলছে কিন্তু ঋণের দায়ে প্রায়ই কোথাও না কোথাও চাবাগান বন্ধ ও বিক্রি হচ্ছে। দেশে ৪,১৫,৬২২ জন রেগুলার চা শ্রমিক চা শিল্পের কর্মে জড়িত। এছাড়াও ৫,৩৫,০০০ জন ক্যাজুয়েল ও পরোক্ষ শ্রমিক একই কর্মে সংশ্লিষ্ট আছেন। আর ১,১৫,৭০৮ হেক্টর ভূমি চা চাষের জন্য সরকার কর্তৃক লীজ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯,৬০৯ হেক্টর ভূমি চা চাষে ব্যবহৃত। বাদবাকী অন্যান্য কাজে যেমন রাস্তা, ঘাট, নদী-নালা, পুকুর, মাঠ, বাসা, বাঙলো, শ্রমিকদের বাসস্থান, স্কুল, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, শ্মসানঘাট, অফিস, ফ্যাক্টরী, হাসপাতাল ইত্যাদি বহুবিধ কাজে ব্যবহৃত। শ্রমিকদের স্থায়ী আবাস ভূমি ও গৃহঋণ দিতে সরকার ও আগ্রহান্নিত। ২০১৪ ইং সনে চা উৎপাদন হয়েছিল ৬৪ মিলিয়ন কেজি। ২০১৬ ইং সনে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হয়েছিল ৮৫ মিলিয়ন কেজি। উক্ত ২০১৬ ইং সনে যারা ২০০ ভাগ/ ২৫০ ভাগ অথবা ৩০০ ভাগ উৎপাদন বৃদ্ধি করলো, সরকারী সহায়তা তাহারা কেহই পায় নাই। সব শিল্পেই পুরষ্কার ঘোষণা করা হয় কিন্তু চা শিল্পে আজ অবধি তা দেখা যায় নাই। তিনি বলেন, ২০১৩/২০১৪ ইং সনে বিদেশে চা রপ্তানী হয়েছিল ১.৭৭ মিলিয়ন কেজি। এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছিল ২৮৬৭ হাজার ডলার।
সরকার যদি এ ক্লাস/ বি ক্লাস/ সি ক্লাস এর মধ্যে শতকরা হারে সবচাইতে বেশি চা তৈরী কারক সিলেক্ট করে ভর্তুকী সহ সম্মানী পদক/ ট্রফি উপহার দিলে তারা উৎসাহিত হবেন এবং এতে দেশে চায়ের উৎপাদন বাড়বে। আমাদের দেশেই চায়ের প্রয়োজন (হোম কনসামপশন) ৮৫ মিলিয়ন কেজি (প্রায়)। এই বৎসরের প্রডাকশন টার্গেট অনুমিত হয়েছে ১১৫ মিলিয়ন কেজি। অর্থাৎ সরকারী সহায়তা পেলে ৩০ মিলিয়ন কেজি চা বিদেশে রপ্তানী করা সম্ভব। চা তৈরী করে অকশনে বিক্রি করার জন্য বিভিন্ন ব্রোকারর্সদের ওয়্যার হাউজে পাঠিয়ে দিতে হয়। ব্রকার্সগণই বাগান মালিকদের ভরসা আর ক্রেতা ও ব্রোকারসদের হাতেই চায়ের বাজার। এখানে চা বাগান মালিকগণ অসহায়।
প্রতি কেজি চা তৈরী করতে ১৫০ টাকা হতে ১৬০ টাকা খরচ হয়। বন্যা, খরা, তৈল, গ্যাস ও ম্যাসিনের দাম বাড়লে চিটাগাংয়ে চা পাঠারোর জন্য গাড়ী ভাড়া ইত্যাদি কারণে খরচ আরও বেশি হয়ে দাড়ায়। কিন্তু আশ্চর্য অকশনে তাদের চায়ের দাম বাড়ে না। বরং দিন দিন কমতেই থাকে। এতে তারা সন্দেহ করেন টি টেস্টারদের জিব্বা দূর্নীতি গস্থ হয়ে পড়েছে। তারা সিন্ডিকেট করে ভালো মানের চায়ের রেটিং কমিয়ে দিচ্ছেন। বর্তমানেও ডিজিটাল বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়াই মান্দাতার আমলের ধারামতে গুটি কতেক লোক মুখের ভিতর লিকার চা ঢুকিয়ে কুলকুচা করেই টি টেস্টার রা বলে দেন এটা ভালো ও আর ওটা মন্দ। তাদের মূখের কথায় কয়েক ঘন্টায় হাজার হাজার টেস্ট সম্পাদন করতে গিয়ে জিহবা ও মূখ গহবরের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাড়ায় তা সবাই জানেন।
১৬৫ বৎসর পরেও বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বা চায়ের ভালো মন্দ গুন মাপার কোন মানদন্ড আজ অবধি চা শিল্পে প্রচলিত হয়নি যা অতন্ত দু:খজনক।এখানেও সরকারী খরচে নিরপেক্ষ টি টেস্টার রাখা প্রয়োজন। তখন তারা বড় মূখ, ছোট মূখ না দেখে শুধু গুন বিচার করবে। চাবাগান যে যে কোম্পানীর নতুন, পূরাতন মালিকগণ চালান তাহারা সকলেই বিশ^াস করেন তাদের তৈরী চা প্রতিকেজি ১ম ক্লাস= ৩৫০/-, ২য় ক্লাস= ৩০০/- এবং ৩য় ক্লাস= ২৫০/- টাকা দরে অকশনে বিক্রি না হলে বহু বড় ছোট ও মাঝারী চা বাগান অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে। কোন কোন মালিক চাবাগান বিক্রিও করে দিতে পারেন। হবে শ্রমিক হবে অসহায়। সিরাজুল ইসলাম বলেন, টি ইজ এন এগ্রোবেইজড ইন্ডাস্ট্রিজ। এখানে প্রাকৃতিক সাহায্য যেমন পরিমিত আলো বাতাস, পরিমিত বৃষ্টি, রোগ বালাই থেকে মুক্তি অত্যধিক প্রয়োজন। অতি বৃষ্টি, খরা, ভ ূমিকম্প, ভ ূমিধ্বস, ঝড় তুপান, শিলা বৃষ্টি, লাল মাখরের আক্রমণ, হেলোপ্যালটিস (এক প্রকার ক্ষুদ্র ও বিষাক্ত রস খাদক মশ) ইত্যাদি প্রডাকশন কমানোর প্রধান কারণ। এখানেও লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। চা মালিকগণ অবশ্যই সরকারী অনুদান বা সাহায্য পাওয়ার দাবী রাখেন।
চা প্রোডাকশন বেশি হলে সিন্ডিকেটই গড়ে ওঠে। চায়ের দাম কমে যায় অথবা কমিয়ে দেয়া হয়। অকশনে ক্রেতারা চা কিনতে চায় না। অথবা নানান ত্রুটি বিচ্যুতি বদমান ছড়িয়ে সেইল থেকে চা-কে আউট রাখা হয়। আবার চা প্রোডাকশন কম হলে ক্রেতারা ও সিন্ডিকেটের লোকজন ব্রোকারসদেরকে চাপে ফেলে কম দামে চা কিনতে বাধ্য করে এবং পরে বাজার নিয়ন্ত্রন করে বেশি দামে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চা বিক্রি করে।
বিসিএস, বিটিএ, বিটিটিএ, আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু যেহেতু, চায়ের জন্য মন্ত্রী নেই, চা মন্ত্রণালয় নেই, শুধু আছে টি বোর্ড, তাই চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা চায় চা বিশেষজ্ঞদের সমন্নয়ে চা মন্ত্রণালয় গঠনের জন্য তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আর্কশন করেন।



মন্তব্য করুন