শ্রীমঙ্গলে ৩৮ বছর ধরে রেলের শতকোটি টাকার ভূমি বেদখল

তোফায়েল পাপ্পু॥ শ্রীমঙ্গলে ৩৮ বছর ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে রেলের শতকোটি টাকার ভুমি। এ নিয়ে কয়েকদফা নামকা ওয়াস্তে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কারনে উদ্ধার করা যায়নি এক ছটাক ভূমিও।
রেলওয়ে বিভাগীয় এস্টেট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন শ্রীমঙ্গল স্টেশন এলাকার ভানুগাছ রোডের পূর্বপাশ সংলগ্ন রূপশপুর মৌজায় জেএল নং ৬৭, খতিয়ান নং-৩, এসএ দাগ-১৭৬১’এ ২৮৭ শতক ভূমি রয়েছে। জানা গেছে, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একাংশের নাম ভাঙ্গিয়ে এক শ্রেণীর দখলদার শহরের গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যিক এলাকায় ‘কৃষি নার্সারী প্রকল্প’র নামে ১৩৫ শতক মূল্যবান ভূমি দখলে নিয়ে বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে। এসব বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েকশ দোকান ঘর বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। রেল সূত্র মতে, মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান, আসলাম সহ ৩০ জনের একটি দখলদার চক্র রেলের এই বিপুল পরিমান ভূমি অবৈধ দখলে নেয়। ‘কৃষি নার্সারী প্রকল্প’র নামে দখল করা রেলের এই ভূমির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকারও উপরে বলে জানা গেছে।
এছাড়া শহরের শতাধিক প্রভাবশালী একই দাগের ১৫২ শতক ভূমি দখলে নিয়ে গড়ে তুলেছে অভিজাত হোটেল- রেস্তরা, ফার্নিচার শো’রুম, অফিস,চা পাতার দোকান, সেলুন, হার্ডওয়ার ষ্টোর, এলপিজি গোডাউনসহ শতাধিক বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। সূত্র মতে এই ১৫২ শতক ভূমির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। রেল বিভাগের এসব ভূমি বিগত ৩৮ বছর ধরে দখলে নিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা বানিজ্য করলেও সরকার এখাত থেকে বছরে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দখলদাররা এসব ভুমিতে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে দোকান মার্কেট গড়ে ব্যবসা পরিচালনা করলেও বাহির থেকে বোঝার উপায় নেই এই জমি রেল বিভাগের দখল করা জমি। তাদের বেশ ভূষায় মনে হবে যেন পৈত্রিক মৌরসি সম্পত্তি ভোগ দখল করছেন।
মৌরসী সম্পত্তি না হলেও ক্রয় সুত্রে রেলের জমির মালিকানা দাবী করে ‘কৃষি নার্সারী প্রকল্প’র অন্যতম দখলদার মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি চা বাগানের জনৈক এক শ্রমিকের নিকট থেকে ক্রয়সুত্রে মালিকানা ভোগদখল করছেন। তিনি এনিয়ে রেল বিভাগের বিরুদ্ধে মৌলভীবাজার আদালতে স্বত্ব মামলা দায়ের করেছেন। এই মামলার নং ও দলিলাদি দেখতে চাইলে হাবিবুর রহমান আদালতে খোঁজ নেয়ার পরামর্শ দেন।
একটি সুত্র জানায়, সরকারী রাজস্ব বাড়াতে ১৯৮১ সালে টেন্ডারের মাধ্যমে এসব জমিতে ১৮২টি প্লট বরাদ্দ করা হয়। সে সময় হানিফ ও অপরাপর দখলদারদের করা একটি স্বত্ব মামলার জটিলতায় রেল বিভাগ আজ পর্যন্ত সেসব প্লট দখল বুঝিয়ে দিতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, দখলদাররা রেলের আইন ও সংশ্লিষ্ট শাখার এক শ্রেনীর অসৎ কর্মকর্তাদের যোগ সাজসে ভূঁয়া ও জ্বাল দলিল সৃষ্টি করে ভূমি দখলে নিতে একের পর এক স্বত্ব মামলা করে। এরই মধ্যে এসব মামলা উচ্চ আদালত কর্তৃক খারিজ হলেও দখল ছাড়াতে পারেনি রেল বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ফলে উচ্চ আদালতের রেলের পক্ষে রায় থাকা সত্বেও দখল ধরে রাখতে সামর্থ হয় প্রভাবশালীরা।
জানা গেছে, গত ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর মুক্তিযোদ্ধা কৃষি নার্সারী প্রকল্পসহ অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে রেল বিভাগ এক অভিযান চালায়। এসময় দখলদাররা মুক্তিযোদ্ধা ব্যানার ও বঙ্গবন্ধুর ছবি সামনে নিয়ে সেই অভিযানে বাঁধা দেয়। বাঁধার মূখে পড়ে রেল বিভাগ অভিযান স্থগিত করে চলে যায়। তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, রেলের এই অভিযান ছিল লোক দেখানো।
রেল বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভিযানের পর শ্রীমঙ্গলের বেহাত রেলের ভূমি উদ্ধারে নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়। একটি সুত্রে আগামী ২৭ নভেম্বর বেহাত এসব ভূমি উদ্ধারে আরেক দফা উচ্ছেদ অভিযানের কথা শোনা গেছে। জানা গেছে, এই অভিযানকে সামনে রেখে দখলদারা মাঠে নেমে পড়েছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে, একজন পৌর কাউন্সিলরের নেতৃত্বে দখলদাররা উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতে এরই মধ্যে চাঁদা তুলে রেল বিভাগের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অসৎ কর্মকর্তাদের সাথে সমঝোতা করে রেখেছেন। আশংকা করা হচ্ছে এখন দখল উচ্ছেদ অভিযানের নামে আরো একটি লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান হতে চলেছে।
এব্যাপারে বাংলাদেশ রেলের বিভাগীয় এস্টেট অফিসার নজরুল ইসলাম জানান, উচ্ছেদ অভিযানের প্রোগ্রাম ঠিক করা হয়েছে। ‘সব ঠিক থাকলে এবং পরিস্থিতি ঠান্ডা রেখে যতটুকু করা যায় উচ্ছেদ করা হবে। কৃষি নার্সারী প্রকল্প উচ্ছেদ করা হবে কি না- জানতে চাইলে ‘যেটা পারি না সেটা পরে ফুল প্রিপারেশন নিয়ে এসে করা হবে’ বলে তিনি জানান।



মন্তব্য করুন