চাঞ্চল্যকর শিশু মাহিম হত্যা : হারিয়ে যাওয়া সীমকার্ড না পাওয়ায় পরিকল্পিত হত্যা

ইমাদ উদ দীন॥ প্রায় তিন মাস থেকে মুঠোফোনের সীমকার্ড হারিয়ে ছিলো প্রতিবেশী সাব্বির নামের এক যুবকের। সেই সীমকার্ড রাস্তায় কোথাও কুড়িয়ে পেয়েছে নিহত মাহিম। এমনটি ধারণা ছিলো সাব্বির এর। ওই সীমকার্ডই কাল হল শিশু মাহিমের। ওই ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ১শ টাকার লোভ দেখিয়ে মাহিমকে ডেকে নেয় সাব্বির। এরপর মাহিম বাড়িতে আর জীবিত ফেরেনি। কাঙ্খিত সেই সীমকার্ড না পাওয়ায় ঘাতকের নির্মম নিষ্ঠুরতায় চিরতরে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিতে হল তাকে এমনটিই দাবি মাহিমের পরিবারের।
আব্দুল হাসিম মাহিম (৮) ও রাহিম আহমদ ফাহিম (৪) দুই ভাইয়ের মধ্যে মাহিম ছিলো বড়। সে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলো। বাবার বাড়ি রাজনগর উপজেলার রাজনগর সদর ইউনিয়নের ৭নং ওর্য়াডের খারপাড়া গ্রামে। তারা বাবা বদরুল ইসলাম টেংরা বাজারের ব্যবসায়ী। বাবার বাড়িতে বাবা চাচাদের জায়গা সম্পত্তির দ্বন্ধ থাকায় সে মায়ের সাথে নানার বাড়িতেই থাকত। স্কুল পাশে থাকায় নানা বাড়ির পাশের গ্রাম পশ্চিম সম্পাশীতে তার খালার বাড়ি ও নানা বাড়ি দু’বাড়িতেই ছিলো তার বসবাস। তবে তার মা কলসুমা বেগম ছোট ছেলেকে নিয়ে থাকতেন মাহিমের নানা বাড়িতে। ওই দিন সন্ধ্যায় মায়ের দেওয়া বিস্কুট ও খাবার খেয়ে সে নানা বাড়ি থেকে বের হয়। যাওয়ার সময় সে বলে যায় বাড়ির পাশে সাব্বির ব্যাডমিন্টিন খেলার স্থানে তাকে ডেকেছে সে নাকি তাকে ১শ টাকা দেবে। এরপর সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা হয়ে গেলেও সে বাড়িতে না ফেরায় তাকে নিয়ে বাড়িতে হৈচৈ শুরু হয়। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজে থাকে না পেয়ে প্রতিবেশী সাব্বিরের বাড়িতে একাধিকবার ধর্ণা দিলেও তাদের কেউ কথা বলতে চায়নি উল্টো তাদের ধমক দেন। এরপর তারা উপয়ান্তু না পেয়ে থানায় জিডি করেন এরই সাথে খোঁজতে থাকেন। নিখোঁজের একদিন পর হাত,পা ও গলা রশি দিয়ে বাধা অবস্থায় বাড়ির অদূরে মনু নদীতে পাওয়া যায় তারা বস্তাবন্দি লাশ। পরিবারের বড় ছেলেকে হারানো শোকে এখন মা কুলসুমা বেগম ও বাবা বদরুল ইসলামের বিলাপ কিছুতেই থামছেনা। নির্মম এঘটনায় প্রতিবেশী ও স্বজনরাও নির্বাক। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের পূর্বসম্পাশী গ্রামের বাসিন্দারা এঘটনায় শোকাহত। সকালে ঘটনাস্থলে গেলে গ্রামবাসীরা ক্ষোভের সাথে জানান কি কারণে একটা নিষ্পাপ শিশুকে প্রাণে হত্যা করে তার লাশ গুম করতে হাত পা বেধে মনু নদীতে বস্তাবন্দি করে ফেলে দিলো। এমন জঘন্য পাষান্ড আমাদের সমাজে বসবাস করে তা ভাবতেই পারিনা। একটি সীমকার্ডের জন্য এমন নির্মমতা? কি ছিলো ওই সীমকার্ডে? আমরা আর কিছুই বলতে চাইনা। এই হত্যাকান্ডের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি চাই। ইতিমধ্যেই তারা নির্মম এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে। মাহিমের পরিবার ও স্বজনরা জানান ৩ মাস পূর্বে সাব্বিরের মুঠোফোনের সীমকার্ড হারিয়ে যায়। ওই সীমকার্ড হন্যে হয়ে তা খোঁজতে থাকে সাব্বির। তার ধারণা সীম কার্ড মাহিম কুড়িয়ে পেয়ে তাকে দিচ্ছেনা। এনিয়ে মাহিমের মায়ের কাছেও একাধিকবার নালিশ করে সাব্বির। মাহিমের মা সাব্বিরকে জানান যে তার ছেলে কোনো সীমকার্ড পায়নি। পেলে সে তাকেই অবশ্যই ফিরত দিতো। একিই বিষয় বার বার উঠায় ওই বিষয়ে তার ছেলেকে দায়ী না করতে ধমক দিয়ে শাসান সাব্বিরকে। তবে তার সাথে সাব্বিরের আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন এর জোর প্রতিবাদ জানান। ওই শাসানোর পর থেকে সাব্বির ক্ষোব্দ হয়ে কাউকে না বুঝিয়ে মাহিমকে কখন টাকা দিয়ে সুপারি পাড়ার কথা বলে তাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইত। মাহিমের সাথে নানা কৌশলে মিশতে চাইত। সঙ্গত কারণে ওটা তারা আর কেউই খেয়াল করেননি। তারা বলেন সাব্বির বখাটে প্রকৃতির ছিলো। সে মুঠোফোনে একাধিক সীম ব্যবহার করে নারী কণ্ঠে কথা বলতো। একদিন মাহিমের খালা (সিপা আক্তার) কে নারী কণ্ঠ বানিয়ে আজে বাজে নানা কথা বলে। তা তারা বুঝতে পারায় পরে ক্ষমা চেয়ে বলে সে ঢং করেছে। আর কোনো দিনও তা করবেনা। সীমকার্ড হারানোর পর থেকে মাহিমের নানা বাড়ির শিশু কিশোরদের বাড়ির বাহিরে দেখা হলে নানা হুমকি দিত। এদিকে এই ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে প্রেরিত জেলা পুলিশের (আর এম বি গ্রুপ) প্রেসবার্তায় জানানো হয় স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে রোববার সকালের দিকে মনু নদীর পূর্ব সম্পাশি এলাকায় হাত,পা ও গলা বাধা বিবস্ত্র বস্তাবন্দি ভাসমান অবস্থায় শিশুর মাহিমের লাশ উদ্বার করা হয়। মৃতদেহটি নিখোঁজ ছেলের বলে সনাক্ত করেন বদরুল ইসলাম। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে সম্পাশী গ্রামের আবুল বক্রের ছেলে সাব্বির বক্স (১৯), সহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সাব্বির নিজেই আব্দুল হাসিম মাহিমকে (৮) হত্যার কথা স্বীকার করে। সে জানায় মাহিম-এর মায়ের কাছে এক হাজার টাকা পাওনা ছিলো। সেটা সে আদায় করতে পারছিলো না। এটাকে কেন্দ্র করে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে গলায় রশি পেচিয়ে হত্যা করে। হাত-পা বেঁধে মৃতদেহ বস্তাবন্দি করে গুম করার উদ্দেশ্যে মনু নদীতে ফেলে দেয়।
এ ঘটনায় নিহত আব্দুল হাসিম মাহিম-এর বাবা বদরুল ইসলাম (৪২) বাদী হয়ে এজাহার দায়ের করলে হত্যা মামলা রুজু হয়। অভিযুক্ত সাব্বির বক্স (১৯) নিজেকে ওই মামলার ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত বলে নিজেকে অভিযুক্ত করে আদালতে ১৬৪ ধারা মোতাবেক দোষ স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ধৃত অভিযুক্তের দেওয়া তথ্য মোতাবেক হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত রশির অবশিষ্ট অংশ ও মাহিমের ব্যবহ্রত সেন্ডেল উদ্ধার করা হয়েছে।
মুঠোফোনে মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াছিনুল হক জানান ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হলে সাব্বির ছাড়া অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হয়। যে হেতু সাব্বির ঘটনার সাথে জড়িত বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবান বন্দি দিয়েছে তাই আমরা ওই বিষয়টিই এখন গুরুত্ব দিচ্ছি। তদন্ত কাজ চলছে।



মন্তব্য করুন