মৌলভীবাজারে গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন

স্টাফ রিপোর্টার॥ ‘এ লড়াই নারীমুক্তির লক্ষ্যে নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উদ্যোগে ১১২-তম আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও সংগঠনের ২৮-তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়।
এ উপলক্ষে ৮ মার্চ সকালে এক বিক্ষোভ মিছিল শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহরের চৌমুহনাস্থ কার্যালয়ে এসে এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়। গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহবায়ক দেলোয়ারা বেগমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি শহীদ সাগ্নিক এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাস ও ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমলেশ শর্ম্মা। এছাড়াও সভায় বক্তব্য রাখেন মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিঃ নং চট্টঃ ২৩০৫ এর সাধারণ সম্পাদক শাহিন মিয়া, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিঃ নং চট্টঃ ২৪৫৩ এর সভাপতি মোঃ সোহেল মিয়া, মৌলভীবাজার হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ খোকন ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহজাহান মিয়া, চা-শ্রমিক সংঘের নারী সদস্য তুলসামা নাইড়ু, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক আম্বিয়া বেগম, সদস্য হাসনা বেগম, জয়তুন বেগম, বিরজা বেগম, শ্রমিকনেতা শাহজাহান আলী, মোঃ গিয়াসউদ্দিন ও সন্যাসী নাইড়ু প্রমূখ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন সভায় বক্তারা বলেন উৎপাদনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের নেই অধিকার ও মর্যাদা। গার্মেন্টস, চা-বাগান, ফার্মাসিউটিক্যালস, নির্মাণ, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি শিল্প সেক্টরে নিয়োজিত নারী শ্রমিকসহ সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, হাসপাতাল, ব্যাংক, বীমা, অফিস-আদালতে পরিচ্ছন্নতা কর্মী, গৃহকর্মী, গ্রামের কৃষাণী তথা শ্রমজীবী নারীদের হাড় ভাঙ্গা খাটুনি, রক্ত-ঘামঝরা পরিশ্রমে মুনাফার পাহাড় গড়ে দেশের অর্থনীতি চালু রাখলেও নির্মম শোষণের যাতাকলে পিষ্ট এ নারীরা পায় না ন্যায্য ও সমমজুরি। চলমান বৈশ্বিক মন্দার সাথে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবে আমাদের শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত জনগণের ওপর চাল-ডাল, লবন-তেল-পিয়াজ ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দফায় দফায় লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, তেল-গ্যাস-বিদ্যুত-পানি, সার-কীটনাশককে মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহণ ভাড়া, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ইত্যাদিতে বিপর্যস্ত জনজীবনে বৈশ্বিক যুদ্ধময় পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি করছে। বিশ্ব বাজার বন্টন, পুনর্বন্টন নিয়ে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো যে যুদ্ধ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে ধারাবাহিক তৎপরতা চালাচ্ছে তারই অংশ হচ্ছে ইউক্রেনে রুশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন। এই আগ্রাসনের লক্ষ্য হচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্ব গঠিত সামরিক জোট ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ নীতি মোকাবেলা করে স্বীয় লক্ষ্য হাসিল করা। অন্যদিকে তাইওয়ান স্বাধীনতার ইস্যু নিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও বৃহত সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যে অগ্রসরমান পুঁজিবাদী চীনের মুখোমুখি অবস্থান ও তাইওয়ান স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে তাকে চীনের রেড লাইন ঘোষণা বিশ্ব পরিস্থিতিকে উত্তেজনাকর করে তুলেছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভবনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। সাম্রাজ্যবাদীরা জোরদার করছে সর্বাত্মক যুদ্ধ প্রস্তুতিকে। তাদের এই যুদ্ধ প্রস্তুতি থেকে আমাদের দেশও মুক্ত নয়। ভূ-রাজনৈতিক ও রণনীতিগত গুরুত্বের প্রেক্ষিতে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশকে নিয়েও আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব সুতীব্র। সাম্রাজ্যবাদী এই অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের দেশসহ বিশ্ববাসীকে রুখে দাঁড়াতে হবে।
সভায় বক্তারা আরও বলেন গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারী মুক্তির লক্ষ্যে শোষিত-বঞ্চিত নির্যাতিত নারী-পুরুষ আপামর জনগণের দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটন-সমস্যা-সংকটের জন্য দায়ী প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। নারী অধিকার, নারীর ক্ষমতায়, নারী উন্নয়ন নিয়ে নানা রকম গালভরা বুলি শুনালেও দেশের অধিকাংশ নারীরা, বিশেষত শ্রমজীবী নারীগণ কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। গৃহকর্মে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের নেই কোন মজুরি কাঠামো, তেমনি নেই কর্মের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীর জীবন-জীবিকার সমস্যার সাথে জড়িত। বাংলাদেশের নারী সমাজ তথা শ্রমিক-কৃষক-জনগণেরসমস্যা-সংকট, শোষণ-লুন্ঠন,দুঃখ-কষ্ট,নিপীড়ন-নির্যাতনের কারণ হচ্ছে প্রচলিত নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থা। এর জন্য দায়ী সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিকে উচ্ছেদ করা ছাড়া নারী মুক্তি অর্জিত হতে পারে না। এই সত্যকে আড়াল ও অস্বীকার করে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল শাসক-শোষক গোষ্ঠি ও এনজিওরা নারী পুরুষের মধ্যকার বিভক্তি বৃদ্ধি করে চলছে। এর বিরুদ্ধে দাড়িয়ে বাংলাদেশের নারী সমাজের দায়িত্ব নারী মুক্তির লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজি বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার, রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে নারী-পুরুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।



মন্তব্য করুন