ইতিহাসের এক নিঃশব্দ বিদায়! সন্তান হারিয়েছেন, ঘর হারিয়েছেন, আপসহীনতার বাতিঘর বেগম খালেদা জিয়া

December 30, 2025,

মোস্তফা সালেহ লিটন : বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। সমাপ্তি হলো এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান বা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন এদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের আশা-ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল, এক মমতাময়ী মা-যিনি সময়ের পরিক্রমায় আবির্ভূত হয়েছেন ‘মাদার অফ দ্য নেশন’ রূপে।

গৃহবধূ থেকে দেশনেত্রী, এক বিস্ময়কর উত্থান ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর যখন বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সমীকরণ চলছিল, তখন ঘরোয়া এক গৃহবধূ থেকে রাজনীতির কঠিন রাজপথে পা রাখেন বেগম খালেদা জিয়া। ৯০‘এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তার আপসহীন নেতৃত্ব তাকে গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয়। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার এই যাত্রা এদেশের কোটি কোটি নারীর জন্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

রাষ্ট্র সংস্কার ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের স্বর্ণযুগ। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দূরদর্শী সিদ্ধান্তগুলো আজও এদেশের মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে:

সংসদীয় পদ্ধতির প্রবর্তন: ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন করেন তিনি।

শিক্ষা বিপ্লব: নারী শিক্ষার প্রসারে দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং দরিদ্র শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ তার হাত ধরেই এসেছে।

উচ্চশিক্ষার প্রসার: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ পাসের মাধ্যমে দেশে উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন তিনি।

অর্থনৈতিক সংস্কার: বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী করতে ১৯৯১ সালে ভ্যাট (ঠঅঞ) ব্যবস্থা চালু করেন, যা আজ আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা: পলিথিন নিষিদ্ধকরণ এবং এসিড সন্ত্রাস নিরোধে কঠোর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি এক বাসযোগ্য সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ‘আপসহীনতা’। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো ভোটের মাঠে হারেননি আবার অন্যায়ের কাছেও মাথা নত করেননি। দীর্ঘ কারাবাস, অসুস্থতা এবং অমানিশার মতো অন্ধকার সময়েও তাকে দেশত্যাগের প্রস্তাব দিয়ে প্রলুব্ধ করা যায়নি। নিজ দেশের মাটি ও মানুষের টানে তিনি সকল ত্যাগ স্বীকার করেছেন কিন্তু আধিপত্যবাদের কাছে নতজানু হননি। সন্তান-শোক, কারার অন্ধকার কিংবা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। একটি যুগের অবসান, একটি চেতনার চিরবিদায়। নক্ষত্রেরও বিদায় হয় কিন্তু তার রেখে যাওয়া আলো থেকে যায়। বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ঠিকই কিন্তু রেখে গেছেন প্রতিবাদের ভাষা এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবিচল থাকার রাজনৈতিক শিক্ষা। তিনি প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্বের আসল শক্তি ব্যক্তিগত বেদনাকে জাতির শক্তিতে রূপান্তর করা। আজ ইতিহাস নিঃশব্দে কাঁদছে। বাংলাদেশ হারালো তার এক পরম অভিভাবককে। যে মাটির টানে তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছেন আজ সেই মাটির কোলেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। তার এই ত্যাগ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এদেশের মানুষের চেতনায় অম্লান হয়ে থাকবে। তিনি চলে যাননি, তিনি মিশে গেছেন এই দেশের ধূলিকণায়। যে মাটির টানে বিদেশের সুখ আর আপসের প্রস্তাবকে তুচ্ছ করেছিলেন আজ সেই মাটির কোলেই চিরনিদ্রায় শায়িত আমাদের প্রিয় ‘মা। ভালো থাকবেন ওপারে, বাংলাদেশের আপসহীন ধ্রুবতারা। বাংলাদেশের প্রিয় ‘দেশনেত্রী। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।

লেখক : মোস্তফা সালেহ লিটন, সাবেক প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক, জেলা জাসাস,  সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রদল।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com