কমলগঞ্জে রাজকান্দি রেঞ্জে বনভূমি দখল ও পান জুমঃ অভিযোগের আড়ালে কী ঘটছে

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি : কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর, কামারছড়া ও কুরমা বন বিটে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে পান জুম, বসতঘর ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ৩ বিট মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার একর বনভূমি বিভিন্নভাবে পান চাষের আওতায় এসেছে। তবে এই পরিমাণ বনভূমির হিসাব সরকারি কোনো স্বাধীন জরিপে যাচাই করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বনভূমিতে প্রথমে বনায়ন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা বলে বাঁশঝাড়, ঝোপঝাড় ও ছোট গাছপালা সরিয়ে ফেলা হয়। পরে ওই জায়গায় গড়ে ওঠে পান জুম। নতুন করে পান চাষের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে নামপ্রতি প্রায় ৪০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই ব্যক্তির একাধিক নাম ব্যবহার করে একাধিক জায়গা দখলের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
অভিযোগের আরেকটি অংশ হলো, বনভূমির বাঁশ ও মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করার পর জায়গা পরিষ্কার করে সেখানে পান চাষের উপযোগী করা হচ্ছে। তবে কাঠ পাচার বা অর্থ লেনদেনের এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো রসিদ, লিখিত চুক্তি কিংবা সরকারি নথি এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
৩ বিটে ১হাজার একর পান জুমের দাবি:
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আদমপুর ভিটেই প্রায় ৪ হাজার একর, কামারছড়া বিটে ১ হাজারের বেশি এবং কুরমা বিটে প্রায় ১ হাজার একর বনভূমিতে পান জুম রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব সংখ্যা স্থানীয়দের বক্তব্যনির্ভর। সরকারি ভূমি রেকর্ড, বন বিভাগের হালনাগাদ মানচিত্র কিংবা স্বাধীন স্যাটেলাইট জরিপের মাধ্যমে এই দাবির সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
ফলে প্রকৃতপক্ষে কত একর সংরক্ষিত বনভূমি পান চাষের আওতায় রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নির্ধারণে যৌথ জরিপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থ নেওয়ার অভিযোগ :
স্থানীয়দের ভাষ্য, বনভূমিতে বসতি স্থাপন বা ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, পাকা ঘর নির্মাণে প্রায় ৫০ হাজার টাকা, মাটির ঘরের জন্য ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং বাঁশ-বেতের ঘরের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
আদমপুর বিটের বন কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো লিখিত প্রমাণ বা অর্থ লেনদেনের রসিদ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে অর্জুন কান্তি দস্তিদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
কুরমা বিটে উচ্ছেদ অভিযানে মিলেছে অবৈধ পান বাগান :
তবে কুরমা বিটে সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধ পান চাষের উপস্থিতির একটি ঘটনা সম্প্রতি বন বিভাগের অভিযানে প্রকাশ্যে আসে।
গত ৭ জুলাই কুরমা খাসিয়া পুঞ্জি সংলগ্ন ছোট পিকল এলাকায় প্রায় ৩ দশমিক ২৯ হেক্টর—প্রায় ৮ দশমিক ১৩ একর—সংরক্ষিত বনভূমিতে গড়ে ওঠা পান বাগান উচ্ছেদ করে বন বিভাগ। দিনব্যাপী অভিযানে আনুমানিক ১ হাজার পানচারা উপড়ে ফেলা হয়। বন বিভাগ জানিয়েছে, এ ঘটনায় বন আইনে পিওআর মামলা প্রক্রিয়াধীন।
ওই অভিযানে কুরমা বিট কর্মকর্তা মো. জুয়েল রানা এবং বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন। ফলে কুরমা বিটে সংরক্ষিত বনভূমিতে পান চাষের অন্তত একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা সরকারি অভিযানের মাধ্যমে নথিভুক্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুরমা বিট কর্মকর্তা জুয়েল রানার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে নতুন পান পুঞ্জি প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে সেগুন কাঠ পাচারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করার মতো মামলা, জব্দতালিকা বা সরকারি নথি এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। জুয়েল রানার বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
আদমপুরে ৫ একর বনভূমি দখলমুক্ত :
কুরমার অভিযানের মাত্র কয়েক দিন পর, ১৬ জুলাই আদমপুর বিটের কালেঞ্জি বসতি এলাকায় প্রায় ৫ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখলমুক্ত করে বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ। অভিযানে মাল্টা, আনারস, লেবু ও সুপারি বাগানসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। দুটি বাঁশ-পলিথিনের শেড ও একটি ওয়াচার শেডও ভেঙে দেওয়া হয়। পাশাপাশি জলাশয়ে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা অবৈধ পুকুরের পাড় কেটে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা হয়।
এর আগে রাজকান্দি রেঞ্জে বনভূমি দখলমুক্ত করার আরও কয়েকটি অভিযান চালানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত বন বিভাগীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত কামারছড়া, আদমপুর ও কুরমা ভিটে একাধিক অভিযানে পান বরজ, অবৈধ ঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, বনভূমি দখল ও বাণিজ্যিক চাষাবাদের বিষয়টি কেবল স্থানীয় অভিযোগের পর্যায়ে নেই; অন্তত কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় বন বিভাগ নিজেও উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে, দখল হচ্ছে কীভাবে?
স্থানীয়দের মূল প্রশ্ন এখানেই। যদি সংরক্ষিত বনভূমিতে পান, ফলের বাগান কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক চাষ আইনত নিষিদ্ধ হয়, তাহলে বছরের পর বছর ধরে এসব জায়গায় পান জুম বা বাগান গড়ে ওঠার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো?
একটি পান জুম তৈরি করতে সাধারণত জায়গা পরিষ্কার, বাঁশের কাঠামো তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। ফলে রাতারাতি একটি বড় পান জুম তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই—এমন যুক্তি দিয়ে স্থানীয়রা বলছেন, বন বিভাগের নিয়মিত নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এসব জায়গা দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন।
তবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, সংরক্ষিত বনভূমিতে জবরদখল করে পান, কমলা, মাল্টা, আনারসসহ বাণিজ্যিক চাষ আইনসঙ্গত নয় এবং এসব দখল উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
কাঠ পাচারের অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে :
পান জুম তৈরির আগে বনভূমির বাঁশ ও গাছ কাটার অভিযোগও গুরুতর। বিশেষ করে সেগুনসহ মূল্যবান কাঠ পাচারের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু বনভূমি দখলের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বনজ সম্পদ পাচারের প্রশ্নও যুক্ত হয়।
তবে কুরমা ভিটে সেগুন কাঠ পাচারের যে অভিযোগ স্থানীয়রা করেছেন, তার পক্ষে এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত কোনো মামলা, জব্দতালিকা বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
অর্থ লেনদেনের অভিযোগে প্রমাণের ঘাটতি :
বনভূমি ব্যবহারের সুযোগের বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে। কারণ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু বনভূমি দখল নয়, সরকারি দায়িত্বে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো রসিদ, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, লিখিত চুক্তি কিংবা স্বাধীন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের পাশাপাশি বন বিভাগের নথি, ভূমির মানচিত্র, অভিযানের প্রতিবেদন, জব্দতালিকা এবং প্রয়োজন হলে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
রেঞ্জ কর্মকর্তার অবস্থান :
রাজকান্দি রেঞ্জের তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক প্রীতম বড়ুয়া অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা বলেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ হালনাগাদ তথ্য হলো, ৪ আগস্ট ২০২৬ প্রীতম বড়ুয়াকে রংপুর সামাজিক বন বিভাগে বদলি করা হয়েছে। তাঁর বদলির খবর প্রকাশের সময় অন্য একটি ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলার কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
ফলে বর্তমানে রাজকান্দি রেঞ্জের প্রশাসনিক দায়িত্বে কে আছেন এবং এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অবস্থান কী—সেটিও আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
শুধু উচ্ছেদ নয়, দখলের নেপথ্যও খতিয়ে দেখা দরকার :
রাজকান্দি রেঞ্জের সাম্প্রতিক অভিযানগুলো দেখাচ্ছে, সংরক্ষিত বনভূমিতে বাণিজ্যিক চাষ ও অবৈধ স্থাপনার উপস্থিতি বাস্তব। কিন্তু কয়েকটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে অন্তত ৫টি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—কোন দাগ ও মৌজায় কত বনভূমি দখল হয়েছে, কতটুকু এলাকায় পান জুম রয়েছে, এসব জায়গা কখন এবং কীভাবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে, বনজ সম্পদ কাটার সঙ্গে কারা জড়িত এবং অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না।
একই সঙ্গে উচ্ছেদ করা জমি পুনরায় দখল ঠেকাতে সেখানে বন বিভাগের নজরদারি ও পুনর্বনায়নের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।
কারণ বনভূমি দখলমুক্ত করার পর একই জায়গা আবার দখলে চলে গেলে উচ্ছেদ অভিযান কেবল সাময়িক সমাধান হয়। আর অভিযোগের পেছনে যদি কোনো সংঘবদ্ধ দখলচক্র বা অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে শুধু পান জুম উচ্ছেদ নয়—দখলের পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
এই প্রতিবেদনে স্থানীয়দের উত্থাপিত বনভূমি দখল, অর্থ লেনদেন ও কাঠ পাচারের অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। ৬ হাজার একর পান জুমের দাবি সরকারি বা স্বাধীন জরিপে যাচাই করা হয়নি এবং অর্থ লেনদেন/কাঠ পাচারের অভিযোগের পক্ষে এই প্রতিবেদনের জন্য প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা পাওয়া যায়নি।



মন্তব্য করুন