বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় অনেক শিক্ষক, সমন্বিত বদলি চালুর দাবি

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি : দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম। তবে নতুন বদলি নীতিমালার কয়েকটি শর্ত নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। বিশেষ করে কোনো বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত থাকলে সেখান থেকে শিক্ষক বদলি হতে না পারা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৪০-এর বেশি হলে বদলির সুযোগ না থাকার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, এবার উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। কিন্তু নতুন নীতিমালার এসব শর্তের কারণে অনেক শিক্ষক ন্যায্য বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে বর্তমানে পাঁচজন করে শিক্ষক কর্মরত। আবার সরকারের একটি প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত প্রায় ১ হাজার ৫০০ বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের সংখ্যাই পাঁচটি করে নির্ধারিত। ফলে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি ‘পাঁচজন শিক্ষক থাকলে বদলি নয়’ এই শর্তের আওতায় পড়েন, তাহলে তারা ভবিষ্যতেও বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। যা তাদের নায্য অধিকার হরণ বলেও জানান বঞ্চিত শিক্ষকরা।
অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ জনেরও কম। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যার তুলনায় শিক্ষার্থী অনেক কম হওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিফট অনুযায়ী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭-৮ জনের মতো। বিপরীত চিত্রও রয়েছে। কিছু বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা থেকে ৭০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত। এতে কোথাও শিক্ষক-সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না, আবার কোথাও শিক্ষকদের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত পাঠদানের চাপ।
শিক্ষকদের মতে, বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর এই বৈষম্য দূর করতে আগে যে ‘সমন্বিত বদলি’ ব্যবস্থা ছিল, সেটি কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থী কম থাকা বিদ্যালয় থেকে অতিরিক্ত শিক্ষককে শিক্ষার্থী বেশি থাকা বিদ্যালয়ে পদায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমানে সমন্বিত বদলি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে এবং নতুন বদলি নীতিমালায় এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই।
জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, বিষয়টি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় আনা উচিত। বিশেষ করে সমন্বিত বদলি ব্যবস্থা চালু করা গেলে একদিকে শিক্ষক সংকট কমবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও এর সুফল পাবে।
শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদা শারমিন জুলি বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ২৮৪ জন, শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। অর্থাৎ প্রত্যেক শিক্ষকের ওপর ৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব। সমন্বিত বদলি চালু হলে যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম এবং যেসব বিদ্যালয়ে বেশি, সেখানকার শিক্ষকসংখ্যার মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
শিক্ষক সমিতির নেতা জাকির হোসেন বলেন, শ্রীমঙ্গল চা বাগানসহ বেশ কিছু এলাকায় অনেক বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন, অথচ সেসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার কারণেও অনেক সহকারি শিক্ষক বদলির সুযোগ পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, বদলির ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। যেসব বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত ১:২০-এর নিচে, সেসব বিদ্যালয় থেকে অন্তত একজন সহকারি শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। অথবা ১:৪০ অনুপাত বজায় রেখে বদলির বিধান রাখা যেতে পারে।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল খেজুরিছড়া চা বাগান সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমা রানী দেব জানান, তার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০৬ জন আর শিক্ষক ৫জন। প্রচুর পরিশ্রমক করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে হয়। এ অবস্থায় তাদের বিদ্যালয়ে আরো কয়েকজন শিক্ষক হলে ভালো হতো।
এ ব্যাপারে চা বাগান অধ্যুশিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম জানান, বেশ কিছু শিক্ষককের কাছ থেকে মৌকিকভাবে এমন অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি আমি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে অবহিত করেছি। তাছাড়া এ বিষয়ে এখন চূরান্ত সিন্ধান্ত দিবে বদলী সংক্রান্ত শ্রীমঙ্গল উপজেলা কমিটি।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌসী জানান, পাঁচজন শিক্ষকের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনের বিধান রয়েছে। বিষয়টি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ের বদলি কমিটিরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তগুলো মন্ত্রণালয় থেকে হয়ে থাকে। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সিদ্ধান্ত আমরা বাস্তবায়ন করি। যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বেশি, কিন্তু শিক্ষকের পদ কম, সেসব বিদ্যালয় নিয়ে কাছাকাছি সময়ে একটি সার্ভে করে মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে যেসব বিষয় করা প্রয়োজন, মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেবে।
তাছাড়া কাছাকাছি সময়ে প্রায় ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষককে পদায়ন করা হবে। তখন এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।
তবে শিক্ষকরা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ের কমিটির হাতে সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকলেও নীতিমালায় বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। এতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কমবে এবং শিক্ষক বদলিতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, শিক্ষকদের বদলির সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ভেদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বৈষম্য দূর করতে দ্রুত সমন্বিত বদলি ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হবে। এতে শুধু শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকারই নিশ্চিত হবে না, বরং শিক্ষক সংকটে থাকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে।



মন্তব্য করুন