লাইনে দাড়িয়েও মিলে না ওএমএস’র চাল, বিপাকে হাকালুকি হাওর পারের দূর্গত মানুষ

বিশেষ প্রতিনিধি॥ নেই ত্রাণ, লাইনে দাঁড়িয়েও মিলে না ওএমএস এর চাল। বিপাকে পড়েছেন হাকালুকি হাওর তীরের কুলাউড়া উপজেলার ৭ ইউনিয়নের মানুষ। ত্রাণ না দিলেও ওএমএস এর চালের বরাদ্ধ বাড়ানোর দাবি সেই সাথে হাওর পারে ন্যায্য মুল্যের ভ্রাম্যমান দোকান (টিসিবি) চালুর দাবি হ্ওার পারের মানুষের। সরেজমিন হাকালুকি হাওর তীরের ভুকশিমইল ইউনিয়নে গেলে বাদে ভুকশিমইল গ্রামের ফরিদা বেগম (৪০), লায়লা বেগম (৪৫) জানান, প্রতি বৃহস্পতিবারে আমাদের ওয়ার্ডে দেয়া হয় ওএ্মএস এর চাল। চাল আনতে হলে সকাল ৬টায় গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। ২ সপ্তাহ দাঁড়ানোর পর পেয়েছেন ৫ কেজি চাল। কিন্তু এতে লায়লা বেগমের ১৫ সদস্যের পরিবারে চলে মাত্র ৫ বেলা। অর্থাৎ দিনও চলে না এই ওএমএস এর চালে। ফলে সপ্তাহে ৫দিনই তাদের অনাহাওে অর্ধাহাওে কাটাতে হয়। একই কথা একই গ্রামের ফারুক মিয়া (৬৫), পাখি মিয়া (৬০) ও মনির উদ্দিন (৪৫) এর। ওএমএসএর চাল যদি প্রতিদিন ৫ কেজি হাওর পারের মানুষকে দেয়া হয়, তাহলে কিছুটা স্বস্তি পাবে মানুষ। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের জন্য কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকি হাওর তীরের ৭টি ইউনিয়নে চালু করা হয়েছে ওএমএস কার্যক্রম। এই ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে জয়চন্ডী ইউনিয়ন অন্যতম। এই ইউনিয়নের ডিলার আব্দুস সালাম ওএমএস দোকান খুলেছেন ইউনিয়নে অবস্থিত বিজয়া চা বাগানের পাশর্^বর্তী বিজয়া বাজারে। বাগান এলাকায় ডিলারের দোকান হওয়ায় সকালে চা শ্রমিকরা লাইনে দাঁড়িয়ে চাল কিনে নেয়। দুরবর্তী স্থান থেকে ক্ষতিগ্রস্থ বোরো চাষীরা আসার আগেই ডিলারের চাল ফুরিয়ে যায়। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ বোরো কৃষকরা ওএমএস এর চাল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান।
আবুতালীপুর গ্রামের জাহিদুর রহমান, মুসা মিয়া, মানিক মিয়া, নৃপন্দ্রে নাথ, জিতেন্দ্র দাস। রামপাশা গ্রামের রেনু মিয়া, তারা মিয়া, মিটুপুর গ্রামের রিয়াজ মিয়া, লিটন মিয়া, তোতা মিয়া অভিযোগ করেন, আমরা ৩দিন গিয়ে চাল না পেয়ে ফিরে এসেছি খালি হাতে। যদি ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের জন্য ওএমএস চাল দেয়া হয়, তাহলে ডিলারের দোকান হওয়া উচিত ছিলো ইউনিয়নের মধ্যবর্তী ও বোরো ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায়। আমরা যাওয়ার আগে বাগানের লোকজন লাইনে দাঁড়িয়ে চাল নিয়ে যায়। তাছাড়া চাল বিক্রিতে ডিলারের কোন শৃঙ্খলা নেই।
জয়চন্ডী ইউনিয়নের ওএমএস ডিলার আব্দুস সালাম জানান, তার দোকান বিজয়া বাজারে। এখানে ফযরের নামাযের পর থেকে এসে লোকজন লাইনে দাঁড়ায়। চাল বিক্রি শুরু হওয়ার দেড় দুই ঘন্টার মধ্যে বিক্রি শেষ হয়ে যায়। ইউনিয়নের যেকোন স্থান থেকে লোকজন আসলে চাল পায়। যে এলাকায় অধিক বোরো ফলন হয় সেই এলাকার কিছু মানুষ চাল নিতে আসে। বাগানের লোকজন লাইনে দাঁড়ালে তাদেরকে তো আর ফেরৎ দেয়া যায় না। যারা আগে লাইনে এসে দাঁড়ায় তারাই পায়। প্রতিদিন ২শ মানুষ চাল পেলেও আর দেড় দুইশ লোক ফেরৎ যায়। চালের বরাদ্ধ দ্বিগুন করলেও মানুষের পূরণ হবে না।
ভুকশিমইল ইউনিয়নের ওএমএস চালের ডিলার মেসার্স আজমল ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী আজমল আলী জানান, ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওয়ার্ড ওয়ারী ভাগ করে দেয়ায় অনেকটা সুবিধা হয়েছে। তারপরও প্রতিদিন ৪ শতাধিক মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। হতাশা নিয়ে মানুষ ফিরে যায়। ওয়ার্ড ভাগ করার আগে চাল নিতে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো দুষ্কর। গত বৃহস্পতিবার মাত্র দেড় ঘন্টায় ১ টন চাল বিতরণ করা শেষ হয়। তিনি মানুষের সুবিধার জন্য রেজিষ্টারে নাম লেখতে একজন, চাল মেপে দেয়ার জন্য দুই জন এবং মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে যাতে সুশৃঙ্খলভাবে চাল নিতে পারে তার জন্য আর দুই জন স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে। ভুকশিমইল ইউনিয়নে ওএমএস’র দোকানে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব পালনকারী উপসহকারী খুষি অফিসার কানাই লাল সরকার জানান, ৭.৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের লোকজনকে চাল নিতে এসে গাড়ী ভাড়া গুনতে হয় বেশি। ফলে সুবিধাজনক স্থান নির্ধারণ করে সপ্তাহে ১ বা ২ দিন সেই স্থানে চাল বিক্রি করা যেতে পারে।
হাকালুকি হাওর তীরের ইউনিয়নগুলোতে এখনও শতকরা ৬৫ ভাগ মানুষ ত্রাণ বঞ্চিত। ভুকশিমইল ইউনিয়নে অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ তালিকাভুক্ত কৃষক ও জেলের সংখ্যা ৩ হাজার। এরমধ্যে আর ত্রাণ পেয়েছে ১৪ শ মানুষ। ভাটেরা ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সংখ্যা ১৮শ। আর ত্রাণ পেয়েছে মাত্র ৯শ জন ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ। সর্বশেষ হাকালুকি হাওর পারে গত ২৫ ও ৩০ এপ্রিল। ৩ মে এখন কোন ত্রাণ নেই।
ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুর রহমান মনির জানান, যে দু’দফা ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় ছিলো অপ্রতুল। রোযায় মানুষ বিপাকে পড়বে। এখন ওএমএস চালের যদি বরাদ্ধ বাড়ানো না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ১০ টাকার চালও বন্ধ। ন্যায্যমূল্যেও দোকান যেমন-তেল, মরিচ, পেয়াজ এসব সামগ্রী দেয়া হলে রোযায় মানুষ স্বস্তিতে থাকবে। বিষয়টি আমি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবগত করেছি।
এব্যাপারে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌঃ মোঃ গোলাম রাব্বি জানান, জয়চন্ডী ইউনিয়নের বিষয়টা আমি অবগত আছি। ইতোমধ্যে আমি চেয়েছিলাম যাতে দোকানটা সুবিধাজনক স্থানে করা যায়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে একটু বিতর্ক রয়েছে। তাছাড়া একাধিক স্পটে চাল বিক্রি করতে ডিলার অপারগতা প্রকাশ করায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া বাকি ইউনিয়নগুলোতে ওয়ার্ডওয়ারী ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু জয়চন্ডী ইউনিয়নে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আর টিসিবির দোকান হয়তো হাওর এলাকায় চালু করা সম্ভব হবে না। তবে উপজেলা পর্যায়ে রমযানের শুরুতেই টিসিবি পন্যের দোকান চালু হবে।



মন্তব্য করুন