বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি-হাকালুকি হাওর পাড়ের তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি

June 20, 2017,

বিশেষ প্রতিনিধি॥ এশিয়ার সর্ব বৃহৎ হাকালুকি হাওরে বন্যার চরম অবনতি দেখা দিয়েছে। কয়েক দিনের ভারি বর্ষনে অব্যাহতভাবে পানি বাড়াছে। হাওর পাড়ের মৌলভীবাজারের ৩ উপজেলায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বড়ছে পানিবন্দি মানুষের হাকাকার। রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা পানিতে প্লাবিত। সেই সাথে গবাদি পশুরও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে চরম আকারে। প্রায় অর্ধ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানি বন্ধি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও শত শত ঘরবাড়ী। অব্যাহতভাবে পানি বাড়ায় মানুষজন রয়েছে চরম উদ্বেগ-উৎকন্ঠায়। সেই সাথ গবাদি পশুরও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে চরম আকারে। এদিকে মৌলভীবাজার-কুলাউড়া-বড়লেখা আঞ্চলিক মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে জেলার সদর ও রাজধানীর সাথে সড়ক যোগাযোগ।

স্থানীয় লোকজনতের মতে, এবার বন্যার শুরু হয়েছে চৈত্র মাসের শুরু থেকে। জৈষ্ঠ্য মাসে এর তীব্রতা এতই বেশি যে, বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে হবে। এখনও আষাঢ়, শ্রাবণ দুই মাস বাকি। হাওর পাড়ের মানুষ এবার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা করছেন। জলাবদ্ধতা ও বন্যাকবলিত এলাকার স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থী ও লোকজন জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানি ভেঙ্গে নৌকা দিয়ে চলাচল করছে। স্থানাভাব ও খাদ্যাভাবে লোকজন কমদামে গোবাদি পশু বিক্রি করে দিচ্ছেন। এবছর অকাল বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় মানুষ একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। কিভাবে সারা বছর দিনপাত করবেন ভেবে কুল-কিনারা পাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, হাকালুকি হাওর পাড়ের কুলাউড়া উপজেলা ভুকশিমইল ইউনিয়ন, জয়চন্ডী, কাদিপুর, কুলাউড়া সদর, ব্রাহ্মণবাজার, ভাটেরা ও বরমচাল ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দি পড়েছেন। এ ৭ ইউনিয়নের প্রায় ২৫-৩০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রায় সকল রাস্তা-ঘাট পানিবন্দি য়েছে। জুড়ী উপজেলার ৪ ইউনিয়নের প্রায় ৩০ টি গ্রামে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। উপজেলার ১৪-১৫ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও প্লাবিত গয়েছে। এ উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের বেলাগাঁও, সোনাপুর, শাহাপুর, রাজাপুর, নিশ্চিন্তপুর, গোবিন্দপুর, জাঙ্গিরাই, নয়াগ্রাম, শিমূলতলা, ইউসুফনগর, পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের বাছিরপুর, খাগটেকা, তালতলা, কালনিগড়, হরিরামপুর, কৃষ্ণনগর, ভবানীপুরসহ ৩০ টি গ্রামের বিভিন্ন রাস্তা ও বাড়ীঘর, ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়।  এছাড়াও বড়লেখার সোনাই নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় হাওর পাড়ের বর্নি, তালিমপুর ও সুজানগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৬০-৭০ টি গ্রাম । আর অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় লক্ষাধিক মানুষ হয়ে পড়েছেন পানিবন্দি।

হাওর পাড়ের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান মিন্টু, কামিল আহমদ, মামুন আহমদ, সেজু মিয়া জানান, এবছর বন্যায় হাকালুকি হাওরের বোরো ধান সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। হাওর পাড়ের মানুষ একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। তার উপর বন্যা, কোন কাজ কর্ম করা যাচ্ছে না। সরকার যদি আমাদের দিকে নজর না দেয় তাহলে আমরা কিভাবে সারা বছর কাটাবো ভেবে পাচ্ছিনা।

ভুকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুর রহমান মনির জানান, ইউনিয়নের বেশিরভাগ গ্রামের রাস্তা তলিয়ে গেছে। মানুষের চলাচলের একমাত্র উপায় হচ্ছে এখন নৌকা। বিশেষ করে সাদিপুর, চিলারকান্দি, জাব্দা, কানেহাত, মুক্তাজিপুর এসব গ্রামে মানুষের ঘরে বন্যার ২-৩ ফুট বন্যার পানিতে পানি তলিয়ে গেছে।

ভাটেরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম জানান, বেড়কুড়ি, শাহমীর, খামাউরা, নওয়াগাঁও ও শরীফপুর গ্রামের মানুষ চৈত্র মাসের ১৫ তারিখ থেকে অদ্যাবধি নৌকাযোগে চলাচল করছে। কিন্তু গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাতে মানুষের বাড়িঘরে বন্যার পানি উঠেছে। যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে আরও দু’একদিন বাড়লে মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে হবে।

বড়লেখা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রাহেনা বেগম বলেন, বড়লেখার ৩ ইউনিয়নের ৬০-৭০ গ্রাম প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যা ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের জন্য এখনও কোন ত্রাণ আসেনি। আসলে তা বন্ঠন করা হবে।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী মোঃ গোলাম রাব্বি জানান, আমি উপজেলা প্রকৌশলীকে সাথে নিয়ে সরেজমিন কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ও কাদিপুর ইউনিয়ন ঘুরে দেখেছি। হাওরের উত্তাল ঢেউয়ে রাস্তাঘাটের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে। স্থানীয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে বস্তায় বালু ভর্তি করে আপাতত ঢেউয়ের কবল থেকে রক্ষার জন্য বলেছি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের জন্য আপাতত কোন বরাদ্ধ নেই। তবে ঈদের জন্য ১০৬ মেট্রিক টন ভিজিএফ  চাল বরাদ্ধ পেয়েছি। সেগুলো দ্রুত বন্টন করার ব্যবস্থা করছি।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com