পাথারিয়া পাহাড় বন্যপ্রাণীর ‘হটস্পট’ লোকালয়ে মরছে নিরীহ প্রাণী

আব্দুর রব॥ বড়লেখার সীমান্তঘেষা পাথারিয়া পাহাড় হিংস্র ও নিরীহ বন্যপ্রাণীর ‘হটস্পট’। পাহাড় ঘেষা এ উপজেলার লোকালয়ে প্রায়ই ঢুকে পড়ছে নানা বন্যপ্রাণী। এদের হামলার শিকার হচ্ছে শিশু, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। কিন্তু নির্বাক সরকারের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ। গুরুত্বপুর্ণ এ বিভাগটির দায়সারা দায়িত্বে লোকালয়ে আক্রান্ত হওয়ার সাথে প্রায়ই প্রাণ হারাচ্ছে বনের অনেক নিরীহ প্রাণী।
ইতোপূর্বে বন্য হাতির আক্রমনে দুই ব্যক্তির মৃত্যু ও গত ২ মাসে বন্য বানরের আক্রমনে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত এবং এলাকাবাসীর হাতে বন্য বানর মারা যাওয়ার পরও ঘুম ভাঙ্গেনি ওয়াইল্ড লাইভ ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, পাথারিয়া পাহাড় ঘেষা লোকালয়ে প্রায়ই বন্যহাতি, বন্যবানর, শুকর, মেছোবাঘ, অজগরসহ বিভিন্ন হিংস্র ও নিরীহ প্রকৃতির প্রাণী প্রবেশ করে বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালায়। আহত করে অনেককে। এমনকি বন্যপ্রাণীর আক্রমনে একাধিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব ব্যাপারে খবর দিলেও মিলে না এ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেখা। এমনকি কোন আক্রান্ত এলাকায় বারবার যোগাযোগ করেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়াতো দুরের কথা তাদেরকে সেখানে উপস্থিত করাই যায় না। উল্টো সরঞ্জাম, লোকবল, লজিস্টিক সাপোর্ট, পরিবহন ব্যয় না থাকাসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগের পায়তারা করেন।
বন্যপ্রাণী আক্রমন করলে প্রতিরোধ মুলক কি কি পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করতে হবে অথবা জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে কি কৌশল অবলম্বন করতে হবে এ সংক্রান্ত কোন প্রকার নুন্যতম সচেতনতা কার্যক্রম যেমন, সেমিনার, ওয়ার্কশপ, রোড শো’র আয়োজন করতে কখনও দেখা যায়নি।
মাঝে মাঝে শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে জনমানুষের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন সব নিরীহ বন্যপ্রাণীও মারা পড়ছে নির্বিচারে। বনাঞ্চল ঘেরা বড়লেখার বিভিন্ন এলাকায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে শিশু ও বৃদ্ধ নারী-পুরুষ। বন্যপ্রানীর লোকালয়ে প্রবেশের কারণে তাদের আক্রমনের শিকার হচ্ছে শিশুরা। আক্রান্তদের খোঁজ-খবর পর্যন্ত নেয়না এ বিভাগের কর্মকর্তারা। আহত নিহতদের পরিবার পায় না কোন ক্ষতিপুরণ। এমনকি বন্যপ্রাণীর হামলায় প্রাণ গেলে সরকারী অনুদানের কোন ব্যবস্থা আছে কি না, থাকলেও তা পাওয়ার উপায় কি এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর আজ পর্যন্ত বিভাগটির কাছে পায়নি পাথারিয়া পাহাড় ঘেরা জনপদের নিরীহ মানুষগুলো।
অক্টোবরের শুরুতেই উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ও দক্ষিণভাগ উত্তর (কাঠালতলী) ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক গ্রুপে বন্য বানরের উপদ্রপ শুরু হয়। উত্তর শাহবাজপুর এলাকায় ৩টির গ্রুপের একটি বানর স্কুল, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, পথচারী ও বৃদ্ধ নারী-পুরুষের ওপর ওপর দাপটের সাথে হামলা চালাতে থাকে। এ বানরের আক্রমনে গত দুই মাসে অন্তত ২৫ ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। ওই বানরের উৎপাত এখনো অব্যাহত থাকলেও খবর দিয়েও সে এলাকায় উপস্থিত করা যায়নি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বড়লেখা রেঞ্জ কর্মকর্তা কিংবা কোন স্টাফকে। দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের কাঠালতলী, মুছেগুল, রুকনপুর, খলাগাও গ্রামে গত ২ মাস ধরে বন্যবানরের উপদ্রপে অতিষ্ট এলাকাবাসী। একটি বানরের আক্রমনে অন্তত ৩০ ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। স্থানীয় ইউপি মেম্বার ও গণমাধ্যম কর্মীদের বারবার যোগাযোগের পর একবার ওই এলাকায় গিয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আক্রমনকারী বানরটি মেরে ফেলার পরামর্শ দেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা জুলহাস উদ্দিন। এর ৭ দিনের মধ্যেই অতিষ্ট এলাকাবাসী হামলাকারী ওই বানরকে মেরে ফেলেন।
উত্তর শাহবাজপুর ইউপি চেয়ারম্যান আহমদ জুবায়ের লিটন জানান, তার এলাকায় গত ২ মাস ধরে কয়েক বানর উৎপাত করছে। মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে। অন্তত ২৫ জনকে গুরুতর আহত করেছে। এদের মধ্যে ৩ জনের চিকিৎসায় তিনি আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। এখনও বানরের উপদ্রপে লোকজন আতঙ্কিত। বন্যপ্রাণী বিভাগের রেঞ্জারকে বারবার অনুরোধ করার পরও কোন ব্যবস্থা নেননি এমনকি আজও এলাকা পরিদর্শন করেননি।
দক্ষিণভাগ উত্তর (কাঠালতলী) ইউপি চেয়ারম্যান এনাম উদ্দিন জানান, তার ইউপি এলাকায় বন্য বানরের আক্রমনে শিশু, নারীসহ ৩০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এদের বেশির ভাগ অতি দরিদ্র। এখনো অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগ কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় অতিষ্ট লোকজন ইতিমধ্যে একটি বানর মেরে ফেলেন। এখন আরেকটি বানর উৎপাত শুরু করেছে। সংশি¬ষ্ট বিভাগের উদাসীনতায় হয়ত সেটিও মারা যাবে। তিনি বন্য বানরের আক্রমনে আহতদের ক্ষতিপুরণ দাবী করেন।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বড়লেখা রেঞ্জার জুলহাস উদ্দিন জানান বানর, হাতিসহ কোন ধরণের বন্যপ্রাণী লোকালয় থেকে ধরে বনাঞ্চলে অবমুক্ত করার সরকারী সরঞ্জাম ও অন্যান্য কোন সাপোর্টই তাদের নেই। লোকবল সংকট ও পরিবহন ব্যয় না থাকায় তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না।



মন্তব্য করুন