কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় নষ্ট হচ্ছে সুস্বাদু আনারস

সাইফুল্লাহ হাসান॥ আনারস একটি সুস্বাদু ও রসালো ফল। মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি টিলা জুড়ে এই ফলটির ব্যাপক আবাদ হয়। এরমধ্যে চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলেও কমতি নেই। টিলার বাঁকে বাঁকে সারি সারি করে সাজানো আনারসের গাছগুলো।
প্রতিবছরই এখানকার স্থানীয় মানুষরা এই আনারস বিক্রি করে স্বাবলম্বী হন। এই আনারসগুলো জেলার বাইরেও অনেক জায়গায় যেতো। শ্রীমঙ্গলের আনারসের বেশ সুনামও রয়েছে। কিন্তু মহামারী করোনা ভাইরাসের কারনে দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে এই আনারস যাচ্ছে না। গেলেও খুব সীমিত পরিসরে।
সরেজমিন শ্রীমঙ্গলের মোহাজেরাবাদ এলাকায় গেলে দেখা যায়, উঁচু নিচু টিলা আর টিলা। তাতে রয়েছে আনারসের গাছ। বাগানে শ্রমিকরা সকাল থেকে আনারস সংগ্রহ শুরু করেন। দুপুরের আগেই শ্রীমঙ্গলের আড়তে পৌঁছাতে হয় আনারস। কেউ ঠেলাগাড়ি বোঝাই করে আবার কেউ জীপগাড়িতে করে আনারস নিয়ে যাচ্ছেন বাজারে। এই সিজনে অত্র এলাকার প্রতিদিনকার চিত্র এটি।
শ্রীমঙ্গলের আড়ত ব্যবসায়ী উদয় বাণিজ্যালয়ের মালিক আরিফ আহমদ বলেন, এইবার আনারসের ফলন ভালো হলেও আমরা ব্যবসায়ীরা বিপদে আছি। দেশে লকডাউনের কারনে বাইরের ব্যবসায়ীরা আনারস কিনতে আসেন নাই। ফলে অনেক ফল আমাদের নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। বাধ্য হয়ে কম দামে খুচরা বিক্রি করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি স্থানীয়ভাবে একটা হিমাগার শ্রীমঙ্গলে প্রয়োজন। এরকম স্টোরেজে আনারস বা অন্যন্য মৌসুমি ফল সংরক্ষণ করে রাখা যাবে দীর্ঘদিন। পচেও নষ্ট হবে না। সংরক্ষণ না করতে পারায় প্রতি বছরের মতো এবারও বেশ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে আমাদের ।
মোহাজেরাবাদের আনারস চাষি মোঃ সেলিম মিয়া। তিনি সাত একর জায়গায় আনারস চাষ করেছেন। এবছর তার খরচ হয়েছে ৫ লক্ষ টাকা। আনারস বিক্রি করে এবার তিনি আয় করেছেন ৯ লক্ষ টাকা। তার বাগানে কাজ করেন ১০ জন লোক। তার বাগানে ক্যালেন্ডার ও বিলাতী এই দুই ধরনের আনারস পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, আমরা একশো আনারস বিক্রি করি ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। উৎপাদিত আনারস বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলা সদর ছাড়াও সিলেট, সুনামগঞ্জ ও শায়েস্তাগঞ্জে এই অনারস আমরা পাঠাচ্ছি। করোনা ভাইরাসের কারনে বাইরের জেলাগুলোতে পাঠানো যাচ্ছে না। সে কারনে আমাদের কিছু আনারস এবার নষ্ট হয়েছে। তবে বানর আর শুকরের জন্য আনারসগুলে টিকানো মুশকিল হয়ে দাড়ায়।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবছর জেলায় ১২০১ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে কমলগঞ্জ উপজেলায় ৫৫০ হেক্টর জমিতে। এছাড়াও শ্রীমঙ্গলে ৪০৯ হেক্টর, কুলাউড়ায় ৫৫ হেক্টর, রাজনগরে ৪০ হেক্টর , বড়লেখায় ৩২ হেক্টর, জুড়ীতে ৮৮ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ২৭ হেক্টর জমিতে।
এবছর জেলায় আনারসের উৎপাদন হয়েছে মোট ২০হাজার ৪শত ১৭ মেট্টিক টন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী কমলগঞ্জ উপজেলায় উৎপাদন হয়েছে ৯হাজার ১শত ৬ মেট্টিক টন। শ্রীমঙ্গলে ৭হাজার ১শত ৫৮, কুলাউড়ায় ৯৬২, রাজনগরে ৬৭০, বড়লেখায় ৫১২, জুড়ীতে ১৫৪০ ও সদর উপজেলায় ৫৫৯ মেট্টিক টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী লুৎফুর বারী বলেন, জেলায় গতবারের চেয়ে ভালো ফলন হয়েছে আনারসের। আমার জানামতে অন্যন্য জায়গায় আনারস গিয়েছে, তবে অন্যান্য বারের মতো নয়। এখন সমস্যা হচ্ছে দেশের এই অবস্থায়তো আনারস পাঠানোর খরচটা বেশি লাগতে পারে বা একটু স্লো যাবে।
তিনি বলেন, আনারস দ্রুত পচে যায়। এটা শুধু করোনার কারনে নয়। প্রতি বছরই কিছু আনারস পচে নষ্ট হয়। স্থানীয়ভাবে কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় ফল চাষিদের লোকসান গুণতে হচ্ছে। শ্রীমঙ্গলে কোল্ডস্টোরেজ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠতো, তাহলে ব্যবসায়ী ও চাষিদের সুবিধা হতো। বিষয়টি আমরা ঊদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কয়েকটা কোম্পানির সাথেও কথা হইছে।



মন্তব্য করুন