কুলাউড়া ভূমি অফিসের কানুনগো মানিক মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, ভোগান্তিতে ভূমি মালিকরা

August 27, 2026,

মাহফুজ শাকিল : কুলাউড়া উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো মোহাম্মদ মানিক মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। শুধু ভূমি মালিক নয়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তাসহ ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশও তাঁর আচরণে অতিষ্ঠ রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, নামজারি ও ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন ফাইল যাচাই-বাছাইয়ের নামে অর্থ আদায় করা কানুনগো মানিক মিয়ার অন্যতম কৌশল। দাবিকৃত অর্থ না দিলে কাগজপত্রে ত্রুটি বা ঘাটতি রয়েছে এমন অজুহাত দেখিয়ে নামজারি আবেদন মঞ্জুর না করার জন্য সুপারিশ করা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

কুলাউড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ নামজারি সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রেও চাপের মুখে পড়েন। কোনো ক্রেতা বিক্রেতার কাছ থেকে একটি বা একাধিক দাগের জমি ক্রয় করলে শুধু ক্রয়কৃত জমির ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের পরিবর্তে বিক্রেতার খতিয়ানে থাকা সব দাগের খাজনা পরিশোধের জন্য বাধ্য করার বিতর্কিত পদ্ধতি কুলাউড়ায় চালু করেছেন কানুনগো মানিক মিয়া। ভূমি মালিকদের দাবি, তারা যে জমি ক্রয় করেছেন, সেই জমির খাজনা পরিশোধ করতে আপত্তি নেই। কিন্ত বিক্রেতার খতিয়ানে থাকা অন্যান্য সকল দাগের জমির খাজনা পরিশোধের শর্ত আরোপ করায় তারা নতুন করে ভোগান্তিতে পড়েছেন।

কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদ আলী, মর্তুজ আলী ও শওকত আলী ৫ একর ৪০ শতকের ভূমি কর দিয়ে নামজারির আবেদন করেন। একটি আবেদন মঞ্জুর করলেও তাদের দুটি আবেদন না মঞ্জুর  করার সুপারিশ করেন কানুনগো মানিক মিয়া। তিনি আমাদের বলেন, যে খতিয়ান থেকে জমি ক্রয় করেছেন ওই খতিয়ানের পুরো ৫৫ একরের খাজনা পরিশোধ করলে নামজারি আবেদন মঞ্জুর করা হবে।

কাদিপুর ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা আকবর খান বলেন, আমার ও আমার স্ত্রী রাহেলা বেগমের নামে ২১ শতক ৭৫ শতাংশ জমির কাগজপত্র ঠিক থাকলেও কানুনগো আমার নামজারি মঞ্জুর হবে না বলে জানান। পরে এসিল্যান্ড অফিসে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে কেন হবেনা বলে কৈফিয়ত চাইলে তিনি বাধ্য হয়ে আমার আবেদন পরে মঞ্জুর করেন।

ভূকশিমইল ইউনিয়নের মহেষগৌরি গ্রামের বাসিন্দা মো. শুকুর মিয়া বলেন, আমার ভাই-বোনদের কাছ থেকে ৯ শতক ৪৭ শতাংশ জমি ক্রয় করি। সেই জমির নামজারি আবেদন করার পর শুনানির দিন এসিল্যান্ড অফিসে গেলে কানুনগো মানিক চা-নাস্তার জন্য আমার কাছে টাকা দাবি করেন। পরে আমি  বিষয়টি এসিল্যান্ডকে জানানোর কথা বললে তিনি ভয় পেয়ে আমার নামজারি প্রতিবেদন দেন।

জয়চন্ডী ইউনিয়নের রঙ্গীরকুল গ্রামের বাসিন্দা ও ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রাজন আহমদ বলেন, প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্রসহ ১৬ শতক জমি আমার ও আমার স্ত্রীর নামে নামজারির জন্য আবেদন করি। ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে প্রতিবেদনেও পাঠানো হয়। কিন্তু এসিল্যান্ড অফিসের কানুনগো মানিক মিয়া আমার আবেদনটি বিভিন্ন অজুহাতে তিন বার না মঞ্জুরের সুপারিশ করেন। উনার আচরণে মনে হলো টাকা দিলে হয়তো তিনি কাজটি করে দিতেন। বিষয়টি এসিল্যান্ডকে অবগত করে পুনরায় আবদেন করেছি।

এদিকে পাকিস্তানি তরুণ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত উমর সাদ্দিক খানের মৌরসী ১৬ শতক জমির নামজারি করতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁর বাবা মো. সাদ্দিক খান উরফে আলফু মিয়া ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। তিনি কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামের বাসিন্দা। আলফু মিয়ার বড় ভাই মখলিছুর রহমানের জামাতা নিজাম উদ্দিন খান বলেন, কয়েক মাস আগে তিন মাসের ভিসা নিয়ে আমার শ্যালক উমর সাদ্দিক খান একাই বাংলাদেশে আসেন। এসে তার মৌরসী জমি নামজারি করতে ইউনিয়ন থেকে তার পিতা ও তার জন্মনিবন্ধন, উত্তরাধিকারী সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে চলতি বছরের ৭ জুলাই নামজারির জন্য আবেদন করেন। কিন্তু এসিল্যান্ড অফিসের কানুনগো মানিক মিয়া সাদ্দিক খানের উত্তরাধিকারী সনদ ভূয়া বলে নামজারি আবেদনটি বাতিল করে দেন।

সাদ্দিকের চাচাতো ভাই সাজেদুর রহমান বলেন, একাধিকবার কানুনগো মানিকের কাছে ধরনা দিয়েও নামজারি করা সম্ভব হয়নি। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর হিস্যা থেকে ছেলেকে বঞ্চিত করার কি কোন আইন রয়েছে? কিন্তু কানুনগো মানিক কোন আইনের বলে আমার চাচাতো ভাইয়ের নামজারি বাতিল করলেন সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানতে চাই।

অভিযোগের বিষয়ে কানুনগো মোহাম্মদ মানিক মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগগুলো সঠিক নয়। সার্ভারের সিস্টেমের কারণে জমির ক্রেতাদের খতিয়ানের পুরো ভূমির কর জমা দেয়ার জন্য নির্দেশনা রয়েছে। তবে এটা সত্য যে, ভূমি মালিকরা এই পদ্ধতির কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন, বিষয়টি আমরা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। আর উমর সাদ্দিকের নামজারির আবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি পাকিস্তানি নাগরিক এবং তার আবেদনে কাগজপত্র ত্রুটি থাকায় আবেদনটি বাতিল করা হয়।

এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রনয় বিশ^াস বলেন, ভূমি অফিসে নামজারি করতে এসে সেবাগ্রহিতারা যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য অফিসের সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে যদি কেউ হয়রানির শিকার হয় তাহলে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভূমি করের বিষয়ে তিনি বলেন, সবাইকে জমির খাজনা পরিশোধ করে জমি বিক্রি করার পরামর্শ দিয়ে থাকি। কানুনগো কর্তৃক নামজারি আবেদন না মঞ্জুর করার কোন সুযোগ নেই। জমির মালিকদের নামজারির বিষয়টি আমরা পজেটিভ ভাবে দেখি।

তিনি আরো বলেন, কুলাউড়ায় আমি একমাস আগে যোগদান করার পর জেনেছি কানুনগো মানিক মিয়ার ওপর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও এসিল্যান্ড অফিসের স্টাফরা বিভিন্ন কারণে ক্ষুব্দ। বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। সার্বিক অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। যারা ভুক্তভোগী রয়েছেন তারা এসিল্যান্ড অফিসে যোগাযোগ করলে সেটি সমাধান করা হবে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত উমর সাদ্দিকের সকল কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কেন নামজারি বাতিল হলো সেই বিষয়ে তিনি বলেন, ইউনিয়ন থেকে ওই ব্যক্তির জন্মনিবন্ধনসহ উত্তরাধিকারী সনদ থাকলে সেটি যাচাই করে নামজারি মঞ্জুর করা যেত। কিন্তু কেন হলো না সেটি খতিয়ে দেখা হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয় পরিদর্শন করেন তৎকালীন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার জামাল উদ্দিন আহম্মেদ। এসময় ভুক্তভোগী লোকজন তাঁর কাছে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। পরে বিভাগীয় কমিশনার এক চিঠিতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে কানুনগো মানিক মিয়াসহ ওই কার্যালয়ের অপর সাত কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে তাৎক্ষণিক বদলির জন্য হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিলে ওইদিনই তাদেরকে জেলার বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়। ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল মানিক মিয়া কানুনগো হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে কুলাউড়ায় যোগদান করেন।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com