অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে চা উৎপাদন ব্যাহত, হারাচ্ছে গুণগত মান

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি : ভরা মৌসুমে চা-বাগানে এখন ব্যস্ততা চরমে। ভোরের আলো ফুটতেই শ্রমিকরা ছুটছেন বাগানের সারি সারি চা-গাছের দিকে। কচি দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি সংগ্রহ করে দ্রুত তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কারখানায়। কিন্তু কারখানায় পাতা পৌঁছানোর পরই শুরু হচ্ছে নতুন সংকট। বিদ্যুতের লুকোচুরি।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ে মৌলভীবাজারের চা কারখানাগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ। সময়মতো পাতা শুকানো, রোলিং, জারণ ও পুনরায় শুকানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে চায়ের গুণগত মান নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করলেও বেড়ে যাচ্ছে ব্যয়।
মৌলভীবাজার জেলার সাতটি উপজেলায় ছোট-বড় ৯৩টি চা-বাগান রয়েছে। বছরের এই সময়টিই চা উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। এ সময়ে বাগানে পাতা সংগ্রহের পর তা দ্রুত কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা না গেলে পাতার স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব শুধু কারখানাতেই নয়, পুরো চা উৎপাদন ব্যবস্থায় পড়ছে।
চা কারখানায় কাঁচা পাতা পৌঁছানোর পর নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও সময় মেনে একাধিক ধাপে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। প্রথমে পাতাকে শুকানো হয়। এরপর রোলিং মেশিনে পাতা ভেঙে দেওয়া হয়। পরে জারণ প্রক্রিয়া শেষে আবারও শুকানো হয়। পুরো প্রক্রিয়াটিই যন্ত্রনির্ভর হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া থেমে যাচ্ছে, আবার বিদ্যুৎ ফিরে এলে মেশিন চালু করতে সময় লাগছে। এতে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবান যন্ত্রপাতির ওপরও বাড়তি চাপ পড়ছে।
চা-বাগান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জেনারেটর ব্যবহার ছাড়া অনেক সময় বিকল্প থাকছে না। তবে জেনারেটরে উৎপাদন চালু রাখার ব্যয় অনেক বেশি। ফলে উৎপাদন সচল রাখলেও বাড়তি জ্বালানি খরচের কারণে চায়ের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বিশিষ্ট চা-বিশেষজ্ঞ ও ফিনলে চা কোম্পানির চিফ অপারেটিং অফিসার তাহসিন আহমদ চৌধুরীসহ একাধিক বাগান ব্যবস্থাপক ও টি প্ল্যান্টার জানান, অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে চায়ের গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
ক্লোনেল চা-বাগানের ব্যবস্থাপক রনি ভৌমিক বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জেনারেটর দিয়ে কারখানা সচল রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাগান পরিচালনাতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন সিলেট শাখার চেয়ারম্যান ও দেশের সিনিয়র চা প্ল্যান্টার জিএম শিবলী বলেন, উৎপাদন চালু রাখা গেলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় চায়ের গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
চা উৎপাদনে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মিসআহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে এবং শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
মৌলভীবাজার বিউবো পরিচালন ও সংরক্ষণ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইন্দ্রোজিৎ দেবনাথও জানান, কিছু দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস জানান, জেলার সাতটি উপজেলায় প্রায় ৫ লাখ গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১১২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় সমহারে লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। চা-বাগানের উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু চলতি মৌসুমের উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; চায়ের গুণগত মান, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজার প্রতিযোগিতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ভরা মৌসুমে প্রতিদিনের উৎপাদন ঘাটতি পরবর্তী সময়ে আর পূরণ করা কঠিন।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে দেশে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মৌলভীবাজারের চা-বাগানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভরা মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা না ফিরলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও মান দুটিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চা-বাগানের সবুজ পাতার ভেতর এখন তাই শুধু ভালো ফলনের প্রত্যাশা নয়, কারখানার মেশিন সচল রাখার দুশ্চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে। বিদ্যুতের এই সংকট দ্রুত কেটে গিয়ে উৎপাদনের স্বাভাবিক গতি ফিরবে, এটাই এখন চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের প্রত্যাশা।



মন্তব্য করুন