বছরে বছরে বাড়ছে ভাড়া : আইনের প্রয়োগ নেই মৌলভীবাজারে বাড়িভাড়ায় নৈরাজ্য

January 24, 2018,

স্টাফ রিপোর্টার॥ ভাড়া বাড়ছে বছরান্তে। নতুন বছর এলেই নতুন নিয়ম। নতুন চুক্তি। একমত না হলে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ। মালিকদের এমন মনোভাবে বিপাকে পড়ছেন ভাড়াটেরা। এ কারনে বাড়ছে মালিক ও ভাড়াটে দ্বন্ধ। অবনতি হচ্ছে সর্ম্পেকের। আর দূরত্ব বাড়ছে মালিক ভাড়াটেদের। প্রতিবছর জানুয়ারী এলেই এ দ্বন্ধটি প্রকট হয়। প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার শহরে বাড়িভাড়া নিয়ে এখন অনেকটা নৈরাজ্য চলছে। মালিকরা নিজেদের খেয়াল খুশিমতো বাড়িভাড়া বাড়াচ্ছেন। এমনটি অভিযোগ করছেন ভাড়াটেরা। তারা বলছেন প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে এলেই ভাড়া বাড়ানো নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়ি ভাড়া আইনের প্রয়োগ না থাকায় বাড়ি ভাড়া ও উচ্ছেদ আতঙ্কে থাকেন ভাড়াটেরা। নতুন বছরের নানা কারনে বাড়ি বদলে বাধ্য হন শহরবাসী, বিশেষত মধ্যবিত্তরা। বিশেষ করে চাকুরীজীবী পরিবার এনিয়ে পড়েন বিড়ম্বনায়। বছর ঘুরছে আর বাড়ছে বাড়িভাড়া। বাড়ছে নিত্যপণ্যের দামও। গত ১৬-১৭ বছরে মৌলভীবাজার শহরে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩-৪ গুণ। নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। অথচ বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ২৬ বছর আগে আইন হলেও বিধিমালা হয়নি। নেই আইনের প্রয়োগ। একারনে এই আইনের সুফল পাচ্ছেন না মালিক ও ভাড়াটিয়া। পৌর শহরের বেশ কয়েকজন বাড়ি ভাড়াটিয়াদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এরই মধ্যে প্রতিবারের মতো এবারও বছরের শুরুতে বাড়ির মালিকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো নানা অজুহাতে ভাড়া বাড়াচ্ছেন।

মৌলভীবাজার শহরের মুসলিম কোয়ার্টার, বনশ্রী, গোবিন্দশ্রী, দ্বারক, কাজিরগাও,বনবিথি, সৈয়ারপুর, সুলতানপুর, গীর্জাপাড়া, কুসুমবাগ, বড়হাট, ধরকাপন, বড়কাপন, পুরাতন হাসপাতাল রোড, শাহ মোস্তফা রোড, ঢাকা বাস ষ্টেন্ড এলাকার ভাড়াটের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেছেন, ইতিমধ্যে তাদের কাছে এলাকাভেদে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ পাঠিয়েছেন বাড়ির মালিকেরা। জানা যায়  প্রবাসী অধ্যুষিত এ জেলায় প্রবাসীরা দেশে আসলে কোন পূর্ব নোটিশ ছাড়াই বাড়ি ছাড়তে হয় ভাড়াটেদের। অনেক মালিক ভাড়াটেদের প্রতি এমন আচরনে পরিবার ও স্বজন নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন ভাড়াটেরা।

তাছাড়া অনেক বাসা প্রবাসীদের জন্য রেডি বাসা হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। আসবাবপত্রসহ প্রস্তুত এই বাসাগুলোরও ভাড়া বছরান্তে মাত্রা অতিরোক্ত বৃদ্ধি করা হয়। যাদের গ্রামের বাড়ি সে সকল প্রবাসীরা বাধ্য হয়ে তাদের বিদেশে বেড়ে ওঠা পরিবারের সদস্যদের জন্য এসকল বাসা ভাড়া নেন। এতে সুযোগ বুঝে মালিকরা ভাড়া বৃদ্ধি করেন। এমন একাধিক অভিযোগ ভাড়াটেদের।  তথ্যানুসন্ধান জানা যায়, মৌলভীবাজার শহরে ২০০০ সালে পাকা ভবনে দুই কক্ষের (কিচেন ও বাথরুমসহ) একটি বাসার ভাড়া ছিল ১হাজার থেকে ১৫শত টাকা। ২০০৫ সালে তা ২হাজার ৫শত থেকে তিন হাজার টাকা।

২০১০ সালে তা ৫ হাজার টাকা। এবং ২০১৮ সালে সেই ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৭-৮হাজার টাকা। ২০০০ সাল থেকে চলমান বছরে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ। তবে এই ভাড়ার হার এলাকা ভেদে ভিন্ন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহরের ঢাকা বাসষ্টেন্ড এলাকায় দুই কক্ষের একটি বাসায় থাকছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ (ছদ্ম নাম)। তিনি দুই কক্ষের এই বাসাটি ৮ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন। বাড়িওয়ালা এই বছরও ২ হাজার টাকা বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছেন। সরকারী কলেজ এর শিক্ষক ও স্কুল শিক্ষিকা দম্পতি সামিনা আক্তার (ছদ্ম নাম) পরিবার নিয়ে সার্কিট হাউজ এলাকার একটি বাসায় থাকেন। তিনি জানান, ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল বাসা ভাড়া ছিল ৮৫০০টাকা, জানুয়ারী থেকে বাসার মারিক ২ হাজার টাকা বৃদ্ধি করেছে। এখন ভাড়া ১০ হাজার ৫শত টাকা। এছাড়া প্রত্যেক বছর বাসার মালিক চায় ভাড়া বাড়াতে। কুসুমবাগ এলাকার স্কুল শিক্ষক বলেন, গত বছর এক বাসায় থাকতাম ভাড়া ছিল ৭হাজার ৫শত টাকা। এবছর ভাড়া বৃদ্ধির কারণে পরিবর্তন করে এখন বেড়ীর পার এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছি। এখন ভাড়া ৭হাজার টাকা। এছাড়াও মুসলিম কোয়ার্টার এলাকার ভাড়াটিয়া সাহেদ আহমদ (ছদ্ম নাম)।  জানান, এবার ৫শতটাকা ভাড়া বৃদ্ধি হয়েছে। গত বছর ছিল ১১হাজার ৫শত এবার ১২ হাজার টাকা। দক্ষিণ কলিমাবাদ এলাকার ভাড়াটিয়া শফিক জানান, এবছর ৫শত টাকা ভাড়া বৃদ্ধি হয়েছে। মালিক পক্ষ বলেছিল ১৫শত টাকা বৃদ্ধির জন্য আমরা ৫শত টাকা মানছি। আগে আছিল ৮হাজার টাকা৫শত টাকা এখন ৯হাজার টাকা। কেবল মাসিক ভাড়া নয়, অগ্রিম হিসেবেও কয়েক মাসের ভাড়া নিচ্ছেন বাড়ির মালিকেরা।

একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, সব মিলিয়ে মাসিক ভাড়া ১০ হাজার টাকা। আর অগ্রিম হিসেবে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। অন্য দিকে বাড়িভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বাড়িওয়ালারা নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, পাহারাদার, ঝাড়–দার, গৃহঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ইত্যাদি যুক্তি দেখান। গীর্জাড়া এলাকার বাড়িওয়ালা এক লন্ডন প্রবাসী বলেন, সবকিছুর দাম বাড়লে বাড়িভাড়া বাড়বে না কেন। কিছু বাড়িওয়ালা অন্যায় ভাবে ভাড়া বাড়াচ্ছেন এটা ঠিক না। বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখেই বাড়িভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। তবে সরকার কর্তৃক বাড়িভাড়া নির্ধারিত থাকলে সে হারেই ভাড়া নিতেন বলে তিনি দাবি করেন।

জানা যায়, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত অধ্যাদেশটি প্রথম জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। বর্তমানে প্রচলিত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনটি ১৯৯১ সালের। কিন্তু সরকার এখনো এই আইনের বিধি করেনি। আইনে বলা হয়েছে, কোনো ভাড়াটের কাছে জামানত বা কোনো টাকা দাবি করতে পারবেন না বাড়িওয়ালা। এক মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না। প্রতি মাসে ভাড়া নেওয়ার রসিদ দিতে হবে, নইলে বাড়িওয়ালা অর্থদ-ে দ-িত হবেন। দুই বছর পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো যাবে না। ভাড়াটেদের স্বার্থরক্ষায় এমন আরও অনেক কথাই উল্লেখ আছে এই আইনে। বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামের এই হিসাব ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)।

এ বিষয়ে ক্যাবের মৌলভীবাজার সভাপতি আবু তাহের ও সুজনের জেলা সভাপতি ডা: ছাদিক আহমদ বলেন, ভাড়াটে মালিক দ্বন্ধ দীর্ঘদিনের। এটা স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজন। তারা বলেন বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির হার জেলাওয়ারী রাখা হয়না। ভাড়াটেরা বাড়ির মালিকদের কাছে অনেকটা জিম্মি। মালিকদের মর্জি অনুযায়ী থাকতে হয়। সরকার কখনোই ভাড়াটেদের পক্ষে ন্যায্য পদক্ষেপ নেয়নি। ১৯৯১ সালের যে বাড়িভাড়া আইন আছে, সেটিও কার্যকর নেই। ভাড়াটেদের চাহিদার সুযোগ নিয়ে বাড়ির মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com