হুমকিতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মৌলভীবাজারে দেদারছে চলছে পাহাড় কাটা

মু. ইমাদ উদ দীন॥ কাটা হচ্ছে পাহাড়ী টিলা। ধ্বংস হচ্ছে বনাঞ্চল। আর হুমকিতে পড়ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। কিন্তু তারপরও কিছুতেই থামছেনা পাহাড় খেকো চক্র। এখন জেলা জুড়ে দিন দুপুরেই দেদারছে চলছে পাহাড় কাটা। এমন দৃশ্যই চোখে পড়ছে পাহাড়ী এলাকা গুলোতে। প্রভাবশালী চক্রের এমন বেপরোয়া মনোভাবে বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। কেউ কেউ পাহাড় কেটে পাদদেশে বসতঘর বানাচ্ছেন। অনেকেই মাটি বিক্রি করছেন। আবার কেউ কেউ তৈরী করছেন রিসোর্ট বা বাগান। রাস্তা তৈরী বা মেরামতের অজুহাতসহ নানা ছুতায় কায়দা কৌশলে কাটা হচ্ছে পাহাড়। কিছুতেই থামছেনা পাহাড় কাটা। নির্বিকার স্থানীয় প্রশাসন। এ কারনে দিন দিন ছোট হচ্ছে এ জেলার পাহাড় ও বনাঞ্চলের আয়তন। একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে চালাচ্ছেন এই নিধনযজ্ঞ। পাহাড় কাটার এমন উৎসবে এ অঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন প্রভাবশালীদের এমন খপ্পরে ধ্বংস হচ্ছে পাহাড়। তাদের লোলুপ দৃষ্টিতে অস্তিত্ব সংকটে এ জেলার পাহাড়ী টিলা ও বনজ সম্পদ। হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ। জেলার কয়েকটি উপজেলার পাহাড়ী এলাকায় এখন হরদম চলছে এমন বে-আইনী কর্মযজ্ঞ। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে এলেই নির্বিচারে চলে পাহাড় কাটা। আর বর্ষা মৌসুমে ঘটে পাহাড় ধ্বসের ঘটনা। তখন পুরো বর্ষা মৌসুম জুড়ে থাকে প্রাণহানি ও সম্পদ হানির চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠা। এনিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হতাহতের ঘটনা এড়াতে তখন স্থানীয় প্রশাসন হন তটস্ত। কিন্তু এখন অবাধে পাহাড় কাটা বন্ধে কোন প্রতিকার না নিয়ে বরং তারা নীরব দর্শক। এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
পাহাড় খেকো ওই চক্রটির এমন লোভাতুর মনোভাব আর প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা পরিবেশের চরম বির্পযয় ডেকে আনছে। তবে কোন কোন উপজেলায় মাঝে মধ্যে প্রশাসন উদ্যোগী হন। চালান অভিযান। এতে কিছু দিনের জন্য পাহাড় কাটা বন্ধ হয়। অভিযান অব্যাহত না থাকায় কিছু দিন পর আবারো যেই সেই। স্থানীয়দের অভিযোগ কোথাও প্রশাসনকে লুকিয়ে। আবার অনেক স্থানে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলে এই বে-আইনী কর্মযজ্ঞ। এলাকাবাসী জানান ওই চক্র প্রথমে গাছ ও বনাঞ্চল উজাড় করে। তারপর সুযোগ বুঝে ওই ন্যাড়া পাহাড়ী টিলার মাটি কাটতে শুরু করে। সরজমিনে ওই সকল এলাকায় গেলে চোখে পড়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই অবাধে পাহাড় কেটে তা গাড়ি দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য। কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা,ভাটেরা ও বরমচালে কমবেশি পাহাড়ী টিলা কাটা হলেও দেদারছে দিন দুপুরে পাহাড় কাটা হচ্ছে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের পশ্চিম জালালাবাদ (সাতনম্বর) এলাকায়। এই উপজেলার অনান্য স্থানে পাহাড় কাটা কিছুটা বন্ধ হলেও সাতন্বর এলাকায় এখনো অবাধে পাহাড় কেড়ে মাটি বিক্রয় চলছে। ওই এলাকার পাশ্ববর্তী গ্রামের সড়ক দিয়ে এসকল পাহাড়ী মাটি পরিবহন করাতে অতিরিক্ত চাপে তা ভেঙ্গে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায় বড়লেখা উপজেলার পাহাড় ঘেষা কাঁঠালতলী, বিওসি কেছরিগুল, ডিমাই,উত্তর ডিমাই, দক্ষিণ ডিমাই, হাতি ডিমাই, উত্তর শাহবাজপুর, সায়পুর, কলাজুরা, হাকাইতি,কাশেম নগর, জামকান্দি, মোহাম্মদ নগর,পূর্ব মোহাম্মদ নগর,সাতরা কান্দি, গঙ্গারজল, জফরপুর, কাশেমনগর, গজভাগ, পূর্ব হাতলিয়া, বোবারথল, মোহাম্মদনগর, ছোট লেখা, ঘোলসা, চন্ডিনগর, মুড়াউল, আতুয়া, বড়াইল, কুমারশাইল, পূর্ব বানীকোনা, শ্রীধরপুর, মাধবকুন্ড, খলাগাও, মুড়াউলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে দিবালোকে কাটা হচ্ছে পাহাড়ী টিলা। এসকল এলাকার কোন কোন স্থানে এখন কিছুটা থামলেও বেশির ভাগ স্থানে গোপনে ও প্রকাশ্যে অবাধে চলছে পাহাড় কাটা। এমনটিই অভিযোগ স্থানীয় মানুষের।জুড়ী উপজেলার উত্তর ভবানীপুর (মোকাম টিলা), ভজি টিলা,চম্বকলতা,বড় ধামাই,কচুরগুল,জামকান্দি,গোবিন্দপুর এলাকায় কাটা হচ্ছে পাহাড়ী টিলা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ওই উপজেলার জায়ফর নগর, গোয়াল বাড়ি, পশ্চিম জুড়ী ও পূর্ব জুড়ী ইনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কাটা হচ্ছে পাহাড়। অভিযোগ উঠেছে সদ্য নির্মিত জুড়ী থানা,পশুসম্পদ,পল্লীবিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্র ভবনের ভিটা ও সামন ভরাট করা হয়েছে স্থানীয় পাহাড়ী টিলার মাটি দিয়ে। প্রশাসনিক ভবন গুলোতে পাহাড়ি মাটি দিয়ে ভরাটের ঘটনায় স্থানীয়রা পাহাড় কাটায় আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাজনগরের উত্তরভাগ ইউনিয়নের যুদুরগুল এলাকার খাসের টিলা কেটে ভরাট হচ্ছে শাহজালাল সারকারখানার আবাসিক এলাকার জমি। বিশাল বিশাল টিলা কেটে মাটি নেয়া হচ্ছে কারখানার ‘কলাবাগান আবাসিক এলাকা’য়। নির্বিচারে পাহাড় কাটার বিষয়ে গণমাধ্যম সোচ্চার হলে প্রসাশনের তৎপরতায় মাস দিন তা বন্ধ থাকে। সম্প্রতি আবারো শুরু হয়েছে পাহাড় কাটা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান এখন নতুন করে কাটা হচ্ছে ‘রহমান মাষ্টারের টিলা’ ও ওই উপজেলার বিভিন্ন ছোট বড় পাহাড়ী টিলার মাটি। অভিযোগ উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকার দলীয় কয়েজন নেতা পাড়ী টিলার মাটি কাটাচ্ছেন। পাহাড় কাটার অভিযোগ কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার সদরেও। তবে কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় আগে পাহাড়ী টিলা কেটে বিভিন্ন কটেজ ও বাগান তৈরী হলেও সম্প্রতি কিছুটা কমেছে। এমনটিই জানালেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। জানা গেল শুষ্ক মৌসুমে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রয় করা হয়। আর বর্ষা মৌসুমে পাদদেশে তৈরী হয় বসতঘর। পাহাড় কাটা ও বসতঘর তৈরীর নেপথ্যে থাকে রাজনৈতিক ছত্রছায়া। তাই প্রসাশন দেখেও না দেখার ভান করেন। পরিবার পরিজন নিয়ে মাথা গুজাবার বিকল্প জায়গা নেই। তাই ভূমিহীন মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সরকারী খাস জায়গাতে ঠাঁই নেন। দীর্ঘ প্রায় ৩ যুগেরও বেশী সময় ধরে চলছে এমন বে-আইনী কাজ। কিন্তু কিছুতেই তা থামানো যাচ্ছেনা। জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এই ৩টি উপজেলার পাহাড়ী এলাকা ঘুরে দেখা গেল এমন দৃশ্য। এই ৩ উপজেলার স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যানুযায়ী পাহাড়ের চূড়া আর পাদদেশে এরকম ঝুঁকিপূর্ন স্থানে বসবাসকারীদের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। স্থানীয় সুত্রে জানা যায় বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলায় ইতিপুর্বে মাটি কাটতে গিয়ে অন্তত ১০-১২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আর ভারি বর্ষণে টিলার মাটি ধসে মা মেয়েসহ গত ৫ বছরে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া পাহাড়-টিলা ধসে শিশুসহ অসংখ্য ব্যাক্তি আহতও হয়েছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপার) মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক আ.স.ম ছালেহ সুহেল বলেন ওই চক্রের কাছে পরিবেশ আইন শুধুই ‘নীতিবাক্য’। অব্যাহত টিলা কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এ অঞ্চলের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আর এরই সাথে বদলে যাচ্ছে ভূ-মানচিত্রও।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো: তোফায়েল ইসলাম জানান পাহাড় কাটা আইন বিরোধী কাজ। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। পাহাড় কাটা বন্ধে আমরা ‘জিরো ট্রলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবো। তিনি বলেন টিলা কাটা বন্ধে ইতিমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। সরজমিনে আমি নিজেও কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেছি।



মন্তব্য করুন