লক্ষ্যমাত্রা’র চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন করেও হাঁসি নেই মৌলভীবাজারে কৃষকদের

আশরাফ আলী॥ এবারের বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান উৎপাদান করেও হাঁসি নেই মৌলভীবাজার জেলার ১ লক্ষ ২৫ হাজার কৃষকের মুখে। ধান উৎপাদন ব্যয় কিভাবে পুষিয়ে তুলবেন এনিয়ে দুশচিন্তায় তারা। কারণ গত বোরো মৌসুমে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে সরকারি উদ্যোগে বোরো ধান সংগ্রহ করা হলেও মৌলভীবাজার জেলা থেকে করা হয়নি। যার ফলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন এজেলার প্রান্তিক কৃষকরা। একারণে অনেকেই এবার বোরো চাষাবাদ করেননি। অথচ মৌলভীবাজারে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরসহ ছোট বড় অনেক হাওর রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, এবার মৌলভীবাজার জেলার ৭ উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৩ হাজার ১’শ ১৬ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদ অর্জিত হয়েছে ৫৩ হাজার ১’শ ৬২ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬ হেক্টর ধান বেশি উৎপাদন হয়েছে। কৃষি অফিসের তথ্য মতে সদর উপজেলায় ১০ হাজার ২’শ ৩০, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৯ হাজার ৩’শ ৩০, রাজনগর উপজেলায় ১২ হাজার ৬’শ ৯৩, কমলগঞ্জ উপজেলায় ৪ হাজার ১’শ ৩, কুলাউড়া উপজেলায় ৬ হাজার ৮’শ, বড়লেখা উপজেলায় ৪ হাজার ৪’শ ৪০ ও জুড়ী উপজেলায় ৫ হাজার ৪’শ ৯০ হেক্টর ধান উৎপাদান হয়েছে। এদিকে গত বোরো মৌসুমে জেলায় বোরো ধানের লক্ষমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৪শ’ ৭১ হেক্টর এবং অর্জিত হয়েছিল ৫৪ হাজার ১২ হেক্টর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত মৌসুমে নয় লাখ মেট্রিক টন চাল এবং দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২৬ টাকা দরে ধান এবং ৩৮ টাকা দরে চাল সংগ্রহ করা হয়। এ আলোকে ২০১৮ সালের ২ মে থেকে শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ধান সংগ্রহ অভিযান চলে। তখন প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে ২৪ টাকা ও চাল উৎপাদনে ৩৬ টাকা খরচ হয়েছিল। সরকারি ভাবে প্রতি মণ ধানের মূল্য ১০৪০ টাকা হলেও মৌলভীবাজারের কৃষকরা ৭’শ থেকে সাড়ে ৭’শ টাকার উপরে বোরো ধান বিক্রি করতে পারেননি। যার ফলে ওই টাকা দিয়ে গত মৌসুমে তাদের উৎপাদন খরচই উঠেনি। বড় অংকের লোকসান গুনতে হয়েছে কৃষকদের।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওর পারের কৃষক, ইদই, কালাম, জয়নাল, ফটিক, আকবর মিয়া, জলিল মিয়া, অকিল মিয়া, মইন, রাসেল সহ একাধিক কৃষকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, “গত মৌসুমের ঋণ এখনও পরিশোধ করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত কিছু ধান লোকসান দিয়ে বিক্রি করেছি আবার কিছু ধান এখনও গোলায় রয়েছে। সরকারি ভাবে ধান না কিনায় আমরা গত বছর লোকসানের স্বীকার হয়েছি। এবারও সরকারি ভাবে ধান না কিনা হলে ফের লোকসান গুনতে হবে।
তারা আরোও বলেন, গত বছর সরকার মিল থেকে চাল কিনায় মিলের মালিকরা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজেসে একটা সিন্ডিকেট তৈরি করে। যার কারণে নায্য মুল্যের চেয়ে অনেক কম দামে মিলের মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করতে হয়। উৎপাদন করতে যে টাকা খরচ হয়েছে তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করেছি।
এবিষয়ে হাওর বাঁচাও, কৃষক বাঁচাও ও কৃষি বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সিরাজ উদ্দিন আহমদ বাদশাহ বলেন, ধান উৎপাদন করতে যা খরচ হয়েছে তার চেয়ে বর্তমান বাজার মূল্য অনেক কম। এভাবে লোকসান দিয়ে কৃষকরা বেশি দিন টিকে থাকতে পারবেনা। কৃষি প্রধান এই দেশের কৃষিকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে দেশের কৃষিকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যতায় দেশকে আগানো সম্ভব নয়।
জেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অফিসার মনোজ কান্তি দাস চৌধুরী বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের বাহিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের আলোকে গত বছর মিল থেকে চাল কিনা হয়েছে। এতে কোনো সিন্ডিকেট করা হয়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস কর্তৃপক্ষ জানায়, সময় মতো সার, বীজ ও ঔষধ কৃষকদের কাছে সরবরাহ করায় এবার ভালো ফলাফল হয়েছে। আগামীতে আরোও ভালো ধান উৎপাদন করতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।



মন্তব্য করুন