শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরি দিতে হলে চা বাগান টিকবে না মালিকপক্ষের দাবি

ইসমাইল মাহমুদ॥ দেশের চা শিল্পাঞ্চলের ১৬৭টি চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বর্ধিত করে ৩০০ টাকা করার দাবিতে লাগাতার আন্দোলন করে চলেছেন। একাধিকবার শ্রম দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের উদ্যোগে শ্রমিকদের সাথে বৈঠক হলেও সকল বৈঠক কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবেসিত হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকদের দাবি তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নতুন মজুরি নির্ধারণ হলেই বাগানের কাজে ফিরবেন। চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বর্ধিত করে ১৪৫ টাকা করা হলেও তা মানেননি শ্রমিকরা। সরকার গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ড দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে থাকে। তাদের দেয়া তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে ৩১টি শিল্পখাত রয়েছে। এরমধ্যে সর্বনিন্ম মজুরি হলো চা শিল্পে।
এ শিল্পে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা দৈনিক মজুরি নির্ধারণ করা হলেও চা শ্রমিকরাই থাকবেন নিন্ম মজুরিপ্রাপ্ত। এতো কম মজুরিতে আর কোন শিল্পে কোন শ্রমিক কর্মরত নেই। তবে চা বাগানের মালিকপক্ষ দাবি করছেন বর্তমানে তারা শ্রমিকদের যে মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন তাতেই তাদেরকে টানতে হচ্ছে লোকসানের ঘানি। এ প্রেক্ষাপটে মজুরি যতো বাড়বে লোকসানও ততোই বাড়বে। ফলে এ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ছাড়া তাদের আর কোন গত্যন্তর থাকবে না। তাদের দাবি, শ্রমিকরা ১২০ টাকা নয়, বাগান কর্তৃপক্ষ তথা মালিকপক্ষের দেয়া রেশন, মেডিকেল, অবসর ভাতা, বাড়িসহ অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে তাদের দৈনিক আয় কমপক্ষে ৪০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে চা শ্রমিকদের নিন্মতম মজুরি বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি। সম্প্রতি ভারতের আসাম রাজ্যের ব্রহ্মপুত্র ভ্যালির চা বাগান শ্রমিকদের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ২৩২ রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৭৭ টাকা। আর আসাম রাজ্যের বরাক ভ্যালির চা বাগান শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ২১০ রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৫০ টাকা। এর আগে চলতি বছরের জুন মাসে পশ্চিমবঙ্গের চা বাগান শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে ২৩২ রুপি করা হয়েছে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৭৭ টাকা। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের বিভিন্ন রাজ্যের চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি যখন ২৫০ টাকা বা তার তদোর্দ্ধ তখন বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের মজুরি আজও ১৫০ টাকার ঘরও পেরোয়নি। দেশের চা শ্রমিকরা দাবি করছেন বর্তমানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অগ্নিমূল্য। সেখানে মাত্র ১২০ টাকা মজুরিতে ‘নুন আনতে পান্তা পুরোয়’ তাদের। ৩০০ টাকার কম মজুরিতে জীবন-জীবিকা চালানো একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
আমাদের দেশের চা শিল্পের নিয়মানুযায়ী প্রতি দুই বছর অন্তর-অন্তর চা বাগান মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশীয় চা সংসদ’ ও চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন’র মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিক মজুরি পুনঃনির্ধারণ করা হয়। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি উভয় পক্ষের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়।
সে চুক্তিতে চা শ্রমিকদের মজুরি ১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর নতুন করে বৈঠকে বসে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের কথা। কিন্তু প্রায় ১৯ মাস পেরিয়ে গেলেও চা শ্রমিকদের মজুরি পুনঃনির্ধারণ করা হয়নি। ফলে চলতি মাসের ৯ তারিখ থেকে আন্দোলন শুরু করেন চা শ্রমিকরা। ৯ থেকে ১২ আগস্ট ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে প্রতিদিন ২ ঘন্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন তারা। ১৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন দেশের ১৬৭টি চা বাগানের প্রায় দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক।
এদিকে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার লোয়াইউনি-হলিছড়া চা বাগানের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মাবুদ আলী বলেন, ‘একজন চা শ্রমিক ও তাদের পরিবার যে ধরণের সুযোগ সুবিধা পায় আমরা প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হলেও তা পাই না। একজন চা শ্রমিক দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি পায়। পাশাপাশি সারা জীবনের জন্য বাসস্থান, বিদ্যুৎ, পানি, চিকিৎসা বিনামূল্যে পেয়ে থাকে। প্রতি সপ্তাহে নিজে ২ টাকা মূল্যে ৩ কেজি ৭শ’ গ্রাম গম (রেশন), চা শ্রমিকের স্ত্রী/স্বামীর জন্য ২ কেজি ৪৫০ গ্রাম গম, প্রথম বাচ্চার জন্য ২ কেজি ৪৫০ গ্রাম গম এবং দ্বিতীয় বাচ্চার জন্য ১ কেজি ২২০ গ্রাম গম পেয়ে থাকে। এছাড়া একজন চা শ্রমিক তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললে বা স্বেচ্ছায় অবসরে গেলে সপ্তাহে ১শ’ টাকা এবং ২৫০ গ্রাম গম পেয়ে থাকে। শ্রমিকরা চা বাগানের জ্বালানি কাঠ, জমি চাষ করে ভোগ দখলের সুবিধাও পায়।’
এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলার মহসিন টি হোল্ডিং লিমিটেড’র শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগান’র সত্ত্বাধিকারী, শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র মো. মহসিন মিয়া বলেন, ‘আমরা চা শ্রমিক ভাইদের বাগান থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় সোয়া তিন কেজি এবং দুই বাচ্চা থাকলে সপ্তাহে সাড়ে পাঁচ কেজি রেশন দিচ্ছি। চা শ্রমিকদের অবসরপ্রাপ্ত পিতা-মাতা থাকলে তাকে আরও আড়াই কেজির মতো রেশন দেয়া হচ্ছে এটা খুব কম মূল্যে আমরা সাবসিডি দিচ্ছি। মেডিসিন তাদেরকে ফ্রি দেয়া হচ্ছে। বাড়ি দেয়া হচ্ছে। তারা গরু পালন করেন, সবজি চাষ করেন। একজন শ্রমিক যতোদিন বেঁচে থাকবেন অবসরে যাবার পরও অবসর ভাতা এবং রেশন দেওয়া হয়। এ সুযোগ-সুবিধা অন্য কোন শিল্পে দেয়া হয় না। এইসব বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যদি এড করা হয় তবে দৈনিক মজুরি প্রায় ৪শ’ টাকার উপরে পড়ে। আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরা ২২ কেজি পাতা তুললে হাজিরা পায়। আমার বাগানে তারা ৮ ঘন্টা নিয়মিত কাজ করলে এভারেজ ৫০ কেজি কাঁচা পাতা তুলতে পারে। ২২ কেজির উপরে যখন সে পাতা তুলে তখন প্রতি কেজির জন্য আলাদা টাকা তারা পেয়ে থাকেন। এসব হিসেব করলে অন্যান্য ইন্ডাষ্ট্রির তুলনায় চা বাগানে যেরকম ভর্তুতি দেওয়া হয়, অবসর ভাতা দেওয়া হয়, কাজ ছাড়া প্রতি রবিবারে মজুরি দেওয়া হয়, অসুস্থ্য হলে মজুরি দেওয়া হয় এসব বাস্তবভিত্তিক আলোচনা করলে বুঝা যাবে কতটুকু সুযোগ-সুবিধা তারা পেয়ে থাকেন। একজন চা শ্রমিক ৮ ঘন্টা কাজ করা সম্ভব হলেও সর্বোচ্চ তারা ৪ ঘন্টা কাজ করেন। এছাড়া ব্যাংক ইন্টারেস্ট, গ্যাস বিল, ভ্যাট, ইলেকট্রিক বিল, অন্যান্য জিনিসের দাম বৃদ্ধিতো আছেই। গত কয়েক বছরে আমরা শ্রমিক ভাইদের মজুরি বৃদ্ধি করেছি, সেই তুলনায় চায়ের দাম কিন্তু বৃদ্ধি পায়নি।
বাংলাদেশীয় চা সংসদ সিলেট জোনের সভাপতি জিএম শিবলী বলেন, ‘একজন শ্রমিক নগদ মজুরি, বার্ষিক ছুটি ভাতা,উৎসব ভাতা, অসুস্থতাজনিত ভাতা পান। এ ছাড়া ভর্তুকি মূল্যে রেশন, অবসরকালীন ভাতা, পোষ্যদের শিক্ষা ব্যয়, চাষের জন্য জমি, চিকিৎসা, আবাসনসহ বিভিন্ন সুবিধা মিলিয়ে দৈনিক তাদের আয় দাঁড়ায় ৪০২ টাকা। দেশের অন্যান্য খাতের শ্রমিকরাও এ রকম মজুরি পেয়ে থাকেন। এছাড়া চায়ের গুণগত মান কমে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস, ভারত থেকে অবৈধভাবে চা আমদানিসহ নানা কারণেই দেশের চা-শিল্প ঝুঁকিতে আছে। লোকসান গুনতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এই অবস্থায় শ্রমিকদের বর্তমান দাবি ৩০০ টাকা দিতে হলে আরও সংকটে পড়বে এই শিল্প।
বাংলাদেশীয় চা সংসদের চেয়ারম্যান মো. শাহ আলম গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘অনেক চা বাগান ক্ষতিগ্রস্থ অবস্থায় আছে। চায়ের বর্তমান বাজারও আশানুরূপ নয়। এছাড়া জ্বালানি তেলের দামও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। চা শ্রমিকদের রেশনের যে আটা দেয়া হয় তার দামও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি কেজি গমের দাম ছিল ১৪ টাকা। বাড়তে বাড়তে এখন তা দাঁড়িয়েছে ২৮ টাকায়। এসবও তো আমাদের ভাবতে হয়।
চা শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরির দাবি অনৈতিক ও অযৌক্তিক বলে জানিয়েছেন চা শিল্পের উদ্যোক্তা ও সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আফজাল রশীদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এত টাকা মজুরি যদি দিতে হয় তাহলে দেশের একটা বাগানও টিকবে না। নিলামে প্রতি কেজি চা বিক্রি হয় গড়ে ১৮০ টাকা করে। কিন্তু বর্তমানে প্রতি কেজি চায়ের উৎপাদন খরচ হয় ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা। ফলে গত তিন মৌসুম ধরে দেশের প্রায় সব বাগান মালিকগণ লোকসান গুনছেন। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে চায়ের বাজারে যে লোকসান হয়েছে তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাগানগুলো। এখন যে প্রস্তাব এসেছে, মজুরি আরও ২৫ টাকা বাড়ানোর, সেটি বাস্তবায়ন করতে গেলে উৎপাদন খরচ কেজিতে ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু উৎপাদনের দামেও চা বিক্রি করা যাবে না নিশ্চিত। এই অবস্থায় চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা করাতো একেবারেই অসম্ভব।’
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহিন চা বাগান মালিকদের বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘কয়েক বছর পূর্বে মাসাধিককাল সময় ধরে আমরা সিলেটের কালাগুল চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করেছিলাম। তখন ওই বাগানের মালিকপক্ষ শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি করলে বাগান লোকসানে মুখে পড়বে বলে দাবি করে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করতে অনিহা প্রকাশ করে। একমাস এ আন্দোলন চলার কারনে বাগানের সকল কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে তারা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিল, এক মাস বাগান বন্ধ করে আন্দোলনের কারণে ওই বাগানের কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এক মাস কাজ বন্ধ থাকলে যে বাগানে কোটি টাকার ক্ষতি হয়, সে বাগান লোকসানে থাকে এ বক্তব্য হাস্যকর ছাড়া আর কিছু নয়। এবার আন্দোলন শুরু হবার পর বাগান মালিকরা জানিয়েছেন, আন্দোলনের ফলে তাদের প্রতিদিন ২০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। যেখানে কাজ না করলে ক্ষতি হয় সেখানে কাজ করলে লোকসান হবে এটা কোন ধরণের যুক্তি?
মালিকপক্ষের দাবির প্রেক্ষিতে চা বাগান শিক্ষা অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ’র সংগঠক সঞ্জয় কান্ত দাস বলেন, ‘চা শ্রমিকেরা যখন দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন, ঠিক তখন মালিকেরা নিয়েছে ভিন্ন কৌশল। তাঁরা বলছেন, তাঁরা নাকি চা শ্রমিকদের ৪০২ মজুরি দেন। যা সম্পূর্ণ অসত্য এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার একটা কৌশল মাত্র। মালিকেরা বলছেন, তাঁরা বাড়ি দিচ্ছেন, চিকিৎসা দিচ্ছেন, রেশন দিচ্ছেন, অবসর ভাতা দিচ্ছেন, চা শ্রমিকেরা বাড়িতে ফলমূল চাষ করছে, গবাদিপশু পালন করছে ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। বাস্তবে তাদের এ বক্তব্য একটা ধোঁকাবাজি। শ্রম আইনের ২(৪৫) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, বাসস্থান, আলো, পানি, চিকিৎসাসুবিধা, অবসর ভাতা বা ভবিষ্য তহবিলে মালিক কর্তৃক দেওয়া টাকা মজুরির অন্তর্ভুক্ত হবে না। ওই আইনের ৯৬নং ধারায় উল্লেখ আছে চা শ্রমিকদের গৃহায়নের সুবিধা নিশ্চিত করবেন মালিকেরা। তবে এগুলো দৈনিক মজুরির হিসেবে আসবে কেন? আমি মনে করি মালিকেরা উপরিউক্ত খাতগুলোতে যে টাকা মজুরি বাবদ প্রদান করছেন বলে দেখাচ্ছেন, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’



মন্তব্য করুন